Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

গল্প

ডেজা ভ্যু

Advertisement

Icon

জেসমিন মুন্নী

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বৃষ্টির গন্ধ আমার সবসময়ই মনে হয় পুরোনো কোনো চিঠির গন্ধ। কেন জানি না। ভেজা মাটির গন্ধে এমন কিছু থাকে, যা আমাদের বর্তমান থেকে টেনে নিয়ে যায় এমন এক জায়গায়, যেখানে আমরা কখনো যাইনি। অথচ মনে হয়, এই তো, এই পথেই তো একদিন হেঁটেছিলাম।

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। ঢাকার বৃষ্টি। অর্থাৎ বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় পানি, রিকশার ঘণ্টি, গাড়ির হর্ন, ছাতার নিচে মানুষের তাড়াহুড়ো এবং ফুটপাতঘেঁষে ক্যাফেতে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যা।

আমি উত্তরার একটা ছোট ক্যাফেতে বসেছিলাম। সামনের টেবিলে একজন মানুষ বসে বই পড়ছিল। নীল শার্ট। হাতে রোলেক্স ঘড়ি। বাম হাতের অনামিকাতে প্ল্যাটিনামের ওয়েডিং ব্যান্ড।

আমি জানি না কেন, তাকে দেখেই আমার বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগল। মনে হলো, তাকে আমি চিনি। অথচ জীবনে কোনোদিন দেখিনি।

হঠাৎ সে বই থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। চোখাচোখি হলো। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর সে হেসে ফেলল।

মনে মনে অসভ্য বলে চোখ সরিয়ে নিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার হাসিটাও আমার চেনা মনে হলো। মনে হলো, এই হাসিটা আমি আগেও দেখেছি।

কোথায়? কবে?

মাথার ভেতর যেন কেউ পুরোনো আলমারি খুলে সব স্মৃতি মেঝেতে ছড়িয়ে দিল; কিন্তু কোনোটার সঙ্গেই তাকে মেলাতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর সে উঠে আমার টেবিলের কাছে এসে বলল, আপনি কি এই বইটা পড়েছেন?

আমি বইটির দিকে তাকালাম। জালাল উদ্দির রুমির কবিতার বই-মসনভি। বললাম, না।

সে বলল, আমিও পড়িনি।

আমি অবাক হয়ে তাকালাম। তাহলে হাতে নিয়ে বসে আছেন কেন?

সে একটু হেসে বলল, কখনো কখনো কিছু বই পড়ার জন্য নয়, পাশে রাখার জন্য।

কথাটা শুনে আমার হাসি পেল। বললাম, মানুষও কি কখনো কখনো পাশে রাখার জন্য আসে?

সে এবার চুপ করে গেল। তারপর বলল, হয়তো।

এই ‘হয়তো’ শব্দটার ভেতরেই বোধহয় অনেক প্রেম লুকিয়ে থাকে। কারণ ‘হ্যাঁ’ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ‘না’ দরজা বন্ধ করে দেয়; শুধু ‘হয়তো’ একটা জানালা খোলা রাখে। তাইতো যেচে কথা বলা লোকটির প্রতি রাগ জন্মাচ্ছিল না।

আমার নাম আদনান। স্থাপত্যবিদ। বৃষ্টির কারণে ক্লাইন্টের আসতে লেট হচ্ছে। সময় কিল করতে তাই আমেরিকানো সঙ্গে সিগারেট।

সরাসরি তাকিয়ে বলল, আপনি?

আমি ছোঁয়া রাহমান। ফ্রিল্যান্সিং করি। মাঝে-মধ্যে ক্রিয়েটিভ লেখাও। আজকে একজন প্রকাশকের আসবার কথা। সামনের বইমেলায় একটা গল্পের বই বের করার ইচ্ছে আছে। পরিচয় দেওয়ার পর সে বলল, তাহলে আপনি গল্প লেখেন। নিশ্চয়ই মানুষের চেয়ে তাদের গল্প বেশি মনে রাখেন?

বললাম, উলটোটা। মানুষের গল্প ভুলে যাই, কিন্তু মানুষকে ভুলতে পারি না।

সে হাসল।

সেদিন আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেছিলাম। অদ্ভুতভাবে কথাগুলো খুব পরিচিত ছিল। আমরা দুজনেই বৃষ্টিতে হাঁটতে পছন্দ করি। দুজনেই আমেরিকানো খেতে খেতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসি। দুজনেরই ভিড়ের মধ্যে আত্মনিমগ্ন থাকতে ভালো লাগে। এমনকি সে বলল, ছোটবেলায় তাদের পুরোনো বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত।

আমি বললাম, আমিও।

আপনার কী মনে হয়, কিছু জায়গা আমাদের দেখার আগেই আমাদের মনে জায়গা করে নেয়?

আমি তাকিয়ে রইলাম। এই কথাটাও আমার চেনা। কিন্তু কোথায় শুনেছি?

সেদিনের পর কিছুদিন পর আমাদের দেখা হতে লাগল। কখনো ক্যাফেতে, কখনো বইয়ের দোকানে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, কখনো কোনো রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটা। একদিন বলল, ভালোলাগার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার কোনো কারণ থাকে না।

মানুষ চাকরি বদলায় কারণ আছে। বাড়ি বদলায় কারণ আছে। শহর বদলায় কারণ আছে; কিন্তু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের ভেতরের দরজা খুলে দেয় এর কোনো যুক্তি নেই।

আদনানের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও তেমনই ছিল। আপনি থেকে তুমিতে নামা। কোনো ঘোষণা নেই। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তবু তার ফোন না এলে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগত।

একদিন সে বলল, তোমাকে প্রথম দেখেই আমার মনে হয়েছিল, তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি।

আমি হেসে বললাম, আমারও।

কোথায়?

জানি না।

সে বলল, আমার মনে হয়, কোনো এক জীবনে।

আমি বললাম, পুনর্জন্মে আমার বিশ্বাস নেই।

সে বলল, আমারও নেই।

তাহলে?

তবু কিছু মানুষকে দেখে মনে হয়, তারা আমাদের জীবনে প্রথমবার আসেনি।

আমি চুপ করে গেলাম।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারিনি। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল প্রথম দিন ক্যাফেতে বসে আদনান যে চেয়ারটায় বসেছিল, তার পাশে একটা বড় জানালা ছিল। জানালার বাইরে একটা আমগাছ। আমি সেই দৃশ্য আগে কোথায় দেখেছি? ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে? নাকি সত্যিই? নাকি নিছক কল্পনা।

পরদিন আমি আদনানকে বললাম, আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্যটা আমার মনে হচ্ছে আমি আগে দেখেছি।

সে হাসল না। বলল, আমারও। তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, এটাই ডেজা ভ্যু।

আমি বললাম, তুমি কি মনে করো, আমাদের মস্তিষ্ক কখনো ভবিষ্যৎ আগে দেখে ফেলে?

না। মস্তিষ্ক ভবিষ্যৎ দেখে না। হয়তো বর্তমানকে ভুল করে অতীতের মতো মনে করে।

আমি বললাম, তাহলে প্রেমও কি এমন?

কেমন?

কাউকে প্রথমবার দেখে মনে হয়, এই মানুষটাকে আমি বহুদিন ধরে চিনি।

আদনান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হয়তো প্রেম আসলে নতুন কিছু নয়। আমরা শুধু পুরোনো কোনো অনুভূতির মুখ খুঁজে পাই।

কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

তারপর জীবন স্বাভাবিক নিয়মে চলতে লাগল। অফিস। লেখা। বাজার। জ্যাম। বৃষ্টি। আমেরিকানো। আর আদনান।

একদিন সে আমাকে নিয়ে গেল গুলশানে একটা পুরোনো বাড়িতে। ওর দাদার আমলের বাড়ি। বাড়িটা শহরের ভেতর হলেও চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। পলেস্তরা পরা দেওয়াল। খিল দেওয়া দরজা। খোলা কাঠের জানালা। পেছনে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ।

আমি গেট দিয়ে ঢুকেই থেমে গেলাম। বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ দরজা খুলে দিল। এই বাড়ি। এই গাছ। এই জানালা। আমি আগে দেখেছি। ঠিক এইভাবেই। আমি দৌড়ে জানালার কাছে গেলাম।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদনানকে দেখে আমার শরীর কেঁপে উঠল। হঠাৎ মনে হলো এই দৃশ্যটা আমি বহুদিন আগে দেখেছি। তখনো আদনানের হাতে রোলেক্স ছিল। আজও আছে। তখন বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। আজও পড়ছে।

তখন সে বলেছিল, তুমি কি জানো, কিছু মানুষকে আমরা জীবনে একবার হারাই, তারপর সারাজীবন তাকে খুঁজি?

আমি হঠাৎ ঘুরে তার দিকে তাকালাম। আদনান কিছু বলেনি। আমি বললাম, তুমি এটা আগে বলেছ। সে অবাক হয়ে বলল, না। আজই প্রথম বললাম।

আমার চোখে পানি এসে গেল। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে আমি পুরোনো ডায়েরিগুলো খুলে বসেছিলাম। কেন জানি না। একটার পর একটা পৃষ্ঠা উলটাতে উলটাতে হঠাৎ একটা পুরোনো তারিখে চোখ আটকে গেল। দশ বছর আগে। ১৪ সেপ্টেম্বর।

একটি বাক্য লেখা-

আজ একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। বৃষ্টির মধ্যে একটা পুরোনো বাড়ি। জানালার পাশে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে। তার পরনে নীল শার্ট। হাতে ঘড়ি। সে আমাকে বলল, তুমি দেরি করে ফেলেছ।

আমার হাত কাঁপছিল। আমি ডায়েরির পাতা ছুঁয়ে বসে রইলাম। পরদিন পুনরায় বাড়িটিতে গেলাম। আদনান বাড়িটির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে রেনোভেট করছিল। আদনানকে কিছু বললাম না। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কখনো এমন স্বপ্ন দেখেছ, যেটা পরে সত্যি হয়েছে?

সে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হয়েছে।

কী স্বপ্ন?

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, একজন নারী ছিল। সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। আমি তাকে বলছিলাম, অনেক দেরি হয়ে গেছে। আগামী মাসে আমার বিয়ে। মেয়ে লন্ডনে ’ল নিয়ে পড়ছে।

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। আমরা দুজনেই চুপ। বাইরে বৃষ্টি। কৃষ্ণচূড়ার পাতায় টুপটাপ শব্দ। আমি তার হাত ধরলাম। কোনো অলৌকিকতা ঘটল না। আকাশ ফেটে আলো নামল না। কেউ আমাদের পূর্বজন্মের সার্টিফিকেট এনে দিল না। শুধু তার হাতের উষ্ণতা আমার হাতের মধ্যে রইল। তখন বুঝলাম, ডেজা ভ্যু হয়তো ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা নয়। হয়তো মানুষের মন কখনো কখনো এমন একটি অনুভূতিকে আগে থেকেই চিনে রাখে, যার মানুষটিকে সে এখনো চেনে না।

আমরা ভবিষ্যৎ জানি না। অতীতও সবসময় মনে থাকে না। শুধু কিছু মুহূর্ত আসে এত পরিচিত, এত আপন যে মনে হয়, জীবন আমাদের কোথাও নিয়ে গিয়ে আবার সেই একই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।

সেদিন আদনান বলল, তুমি কি ভয় পাচ্ছ?

আমি বললাম, না।

তাহলে?

আমি তার হাত আরও শক্ত করে ধরে বললাম, মনে হচ্ছে, এতদিন পরে আমি ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি।

বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছিল। কৃষ্ণচূড়ার গাছটা ভিজছিল। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে।

আর আমার মনে হচ্ছিল এই দৃশ্যটি আমি আগে একবার দেখেছি। শুধু তখন জানতাম না, জানালার এপাশে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকবে, তার নাম আদনান।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

গল্প ডেজা ভ্যু

ডেজা ভ্যু

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০ ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ফিরে আসা

ফিরে আসা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম