Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

Advertisement

Icon

মাওলা প্রিন্স

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

কবিতা ও গানে কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুচেতনা নিয়ে কখনো কেউ আলোকপাত করেছেন কিনা, জানি না। আমার স্মৃতিতে নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুচেতনা নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন। নজরুলের মৃত্যুচেতনা আলোকপাত না করে কেউ কেউ তার মৃত্যুচিন্তা নিয়ে নিবন্ধ রচনায় প্রয়াস চালিয়েছেন। মৃত্যুচেতনা এবং মৃত্যুচিন্তা মানুষের শরীরী মৃত্যুকেন্দ্রিক বটে; কিন্তু, চিন্তা যেখানে স্বল্পায়ু, তাৎক্ষণিক ও শৌখিন, চেতনা সেখানে সুদূরপ্রসারী, সম্প্রসারণশীল ও সীমাহীন।

নজরুলসাহিত্যে ‘মৃত্যু’ শব্দের প্রথম নান্দনিক প্রয়োগ দেখি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। যেখানে সহসা নিজেকে চেনা সর্ববন্ধনমুক্ত কবি দ্রোহ ও আমিত্বের সর্বপ্লাবী অহমিকায় উচ্চারণ করেছেন :

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,

করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,

আমি উন্মাদ আমি ঝন্ঝা!

মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ধরার দুঃসাহস কল্পনা করা কবি ‘ধূমকেতু’ কবিতায় যখন উচ্চারণ করেন, ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু/এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!’ তখন তার এই যাওয়া-আসা কবিকল্পনা কোনো মহামানব বা বীরপুরুষের জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত জীবনচেতনার সঙ্গে জড়িত ও সুগ্রথিত।

‘রণ-ভেরী’ কবিতায় নজরুলের জীবনবোধ ও মৃত্যুচেতনা প্রকাশ পেয়েছে অসাধারণ একটি পঙক্তিতে; তা হলো : ‘তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!’ জানের চেয়ে যে মান শ্রেষ্ঠ, তেজহীন বীরত্বহীন ব্যক্তিত্বশূন্য জীবনের চেয়ে যে মৃত্যু শ্রেয় এবং বৃহত্তর জীবনবোধে মৃত্যু যে কবির চেতনায় নিতান্তই সাধারণ ও তুচ্ছ, তা এখানে উপলব্ধি করা যায়। অর্থাৎ, ‘অগ্নি-বীণা’ পর্বে ভয় ও ভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কবি বৃহত্তর জীবনের যে ছবি এঁকেছেন মৃত্যু সেখানে নিতান্তই গৌণ। মুখ্য হলো জীবিত মানুষের মুক্তি ও বৈপ্লবিক জাগরণ।

‘দোলন-চাঁপা’ পর্বে নজরুলের মৃত্যুচেতনা প্রেমের উচ্ছ্বাসে পূর্ণ। এই প্রেম মর্ত্যলোকের নর-নারীর আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। এ গ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় বিরহাক্রান্ত প্রেমিক ও প্রেমিকার কণ্ঠে মৃত্যুভাবনা প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন ভাবে। ‘অভিশাপ’ কবিতায় উপেক্ষিত প্রেমিকের কণ্ঠে শুনি প্রেম ও মৃত্যু চেতনার সমন্বিত অভিব্যক্তি :

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে!

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-

বুঝবে সেদিন বুঝবে।

-এই মৃত্যুচেতনায় মিশে আছে রূপকথার বিশ্বাস ও বিজয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয় এবং মৃত্যু মানুষকে পুনর্মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়, এমন আদিম বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মহৎ প্রেমিকের আত্মপ্রত্যয় এখানে অভিব্যঞ্জিত হয়েছে।

প্রেমিক-কবি নজরুলের মৃত্যুচেতনার মূল অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে ‘পূজারিণী’ কবিতার শেষ স্তবকে :

মোরে মনে পড়ে/একদা নিশীথে যদি প্রিয়

ঘুমায়ে কাহারো বুকে অকারণে বুক ব্যথা করে,

মনে করো, মরিয়াছে, গিয়াছে আপদ;

আর কভু আসিবে না

উগ্র সুখে কেহ তব চুমিতে ও-পদ-কোকনদ!

মরিয়াছে-অশান্ত অতৃপ্ত চির-স্বার্থপর লোভী,-

অমর হইয়া আছে- রবে চিরদিন

তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী/ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ কবি!

এখানে উপেক্ষিত ও অবহেলিত প্রেমিক-কবির মৃত্যুবরণ অভীপ্সার চেয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার আত্মপ্রত্যয় উচ্চকিত হয়েছে। এখানে প্রেমের ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ প্রেমিক-কবি অমর হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। উপেক্ষিত হয়ে হারিয়ে যাওয়ার বদলে কিংবা প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিঃশেষ হওয়ার বিপরীতে কবি যে মৃত্যুচেতনার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করলেন, তা বস্তুত জীবনেরই জয়গানকে নির্দেশ করে। যে প্রেমিক মরেও অমর হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, যে প্রেমিকা আত্মপ্রত্যয়ী ও প্রেমের গর্বে গরবিনী, তার বা তাদের চির-বিচ্ছেদ হতে পারে; কিন্তু, তার বা তাদের কি চির-মৃত্যু সম্ভব?

বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় নজরুলের ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থের ‘ওগো ও চক্রবাকী’ শীর্ষক প্রথম কবিতায়। যেখানে প্রেয়সী চক্রবাকীকে খুঁজে খুঁজে অন্ধ হওয়া প্রেমিক চক্রবাক-রূপী কবি প্রকাশ করেছেন তার মৃত্যুর পাশাপাশি মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার রহস্য :

যখন প্রভাতে থাকিব না আমি এই সে নদীর ধারে,

ক্লান্ত পাখায় উড়ে যাব দূর বিস্মরণীর পারে,

খুঁজিতে আমায় এই কিনারায় আসিবে তখন তুমি-

খুঁজিবে সাগর-মরু-প্রান্তর গিরিদরী বনভূমি।

তাহারি আশায় রেখে যাই প্রিয়, ঝরা পালকের স্মৃতি-

এই বালুচরে ব্যথিতের স্বরে আমার বিরহ-গীতি!

এখানে ব্যথা-বিরহাক্রান্ত প্রেমিক সৃষ্টিশীলতায় ব্যাকুল। না পাওয়া কিংবা পেয়েও হারিয়ে ফেলা প্রেমিকার জন্য কবি বিরহ-গীতি রচনা করছেন। মৃত্যুর পূর্বে সাগর, মরু, বনভূমি, বালুচর তথা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ ঝরা পালকের মতো রেখে যাচ্ছেন তার সৃষ্টিকর্ম; যা তাকে অমর করবে বিশ্বলোকে।

কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুচেতনা উপলব্ধির জন্য তার ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থের ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ এবং ‘চিত্তনামা’ কাব্যগ্রন্থের ‘অকাল-সন্ধ্যা’ কবিতা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে ফুটে ওঠেছে আরাধ্য মৃত্যুর রূপকল্প। যে মৃত্যু অন্যদের মুহ্যমান ও আলোড়িত করে, যে মৃত্যুতে গণমানুষ আর্তনাদ ও আহাজারি করে, যে মৃত্যুকে মানুষ বহু-বহুকাল ধরে মনে রাখে, নজরুল সেই মৃত্যুকেই সম্মুখে এনেছেন বারংবার।

বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুশোকে সমগ্র পৃথিবী কাতর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার চিত্রকল্প অঙ্কিত হয়েছে ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ কবিতায় :

আজ অমরার আলো আরো ঝলমল, সেথা ফোটে আরো হাসি,

শুধু মাটির মায়ের দীপ নিভে গেল, নেমে এল অমা-রাশি!

অনুরূপ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুবার্তায় শোকবিহ্বল কবি রচনা করেছেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনের ছবি :

খোলো মা দুয়ার খোলো;/প্রভাতেই সন্ধ্যা হলো

দুপুরেই ডুবল দিবাকর গো।/সমরে শয়ান ওই,

সুত তোর বিশ্বজয়ী,/কাঁদনের উঠছে তুফান-ঝড় গো।।

কবিতার পাশাপাশি বহু গানে কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুচেতনা প্রকাশ পেয়েছে। কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনার সূত্রায়ন সন্নিবেশে তার বহুল প্রচারিত তিনটি গান বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথম গানটি হলো :

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমারে দেব না ভুলিতে

আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ বেণী যাবে যবে খুলিতে।।

তোমার সুরের নেশায় যখন/ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন

রোদন হইয়া আসিব তখন তোমার বক্ষে দুলিতে।।

এটি নিঃসন্দেহে বিরহাক্রান্ত প্রেমিক কবির মৃত্যুচেতনাকে মূর্ত করেছে। নজরুল কবিতায় যেমন তেমনি গানেও মৃত্যুকে রোমান্টিক চেতনায় দাঁড় করেছেন। একদিকে মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়ার নিরানন্দ বেদনা; আর একদিকে পুনর্জন্ম, বাতাস হয়ে কান্না হয়ে ফিরে আসার আত্মপ্রত্যয়ী ও আনন্দপ্লাবী আকাঙ্ক্ষা। প্রেমজাত মৃত্যুচেতনার এমন প্রাণস্পর্শী ও কালজয়ী উদাহরণ বাংলা সাহিত্য-সংগীতে দ্বিতীয়টি কি আছে?

নজরুলের মৃত্যুচেতনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জনপ্রিয় দ্বিতীয় গানটির কথা হলো :

মসজিদেরি পাশে আমার কবর দিও ভাই

যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।।

আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,

পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।

গোর আজাব থেকে এ গুনাহগার পাইবে রেহাই।।

এটি মূলত গজল। ইসলামি মূল্যবোধ ও ভাবধারায় সমুন্নত বিশেষ রীতির এই গানে মৃত্যুর পর কবরের আজাব থেকে মুক্তির আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। কবি এখানে নিজেকে গুনাহগার কল্পনা করে মানবিক অনুশোচনায় কাতর হয়েছেন। মৃত্যুভয় ও আল্লাভক্তি থাকা সত্ত্বেও এ গানের আবেদন রোমান্টিক। কবরে শুয়ে আজানের সুর ও আল্লাহ নামের জিকির শুনতে চাওয়া এবং সেই সুর ও জিকিরের মূর্ছনায় শরিক হয়ে শুদ্ধ হওয়ার অন্তিম বাসনা নজরুলের রোমান্টিকতাকে নির্দেশ করে।

নজরুলের মৃত্যুচেতনার সূত্রায়নে উজ্জ্বলতম উদাহরণ হিসাবে তৃতীয় ও শেষ গানটি হতে পারে :

আমায় নহে গো- ভালবাস শুধু ভালবাস মোর গান।

বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হ’লে অবসান।।

এ গানে জগৎ ও জীবনের নিগূঢ় তত্ত্বকথা রয়েছে; যা সকরুণ। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সৃষ্টি যে মহান, যতক্ষণ সুর আছে ততক্ষণই যে স্রষ্টার মূল্যায়ন এবং মহাকালের যাত্রায় জীবনাবসানে ব্যক্তি-মানুষের যে স্থান নেই, তা অভিব্যঞ্জিত হয়েছে। কিন্তু, তত্ত্বকথা পরিবেশনের জন্য যে এ গান রচিত হয়নি, তা উপিলব্ধি করা যায়। এই গানে গভীর দুঃখবোধের সঙ্গে চিরন্তন প্রেমের আর্তি ও আপন সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মৃত্যু-উত্তর মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সপ্রকাশিত হয়েছে।

মৃত্যু মানুষের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি-মৃত্যুকে অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বভাবতই কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতা ও গানে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেননি। কিন্তু, তিনি মৃত্যুচিন্তায় বিভোরও হননি। ভয় ও ভক্তির দ্বারা তাড়িত হয়ে তিনি ইহকাল ও পরকাল অনুসন্ধান করেননি। তার চেতনায় মৃত্যু হলো জীবনের নামান্তর। জীবিত মানুষের মুক্তি ও বৈপ্লবিক জাগরণ এবং সৃষ্টিশীল ব্যক্তিমানুষের আত্মপ্রত্যয় ও মৃত্যু-উত্তর মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার আনন্দপ্লাবী আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নজরুলের মৃত্যুচেতনা সমূলে প্রোথিত।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

গল্প ডেজা ভ্যু

ডেজা ভ্যু

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০ ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ফিরে আসা

ফিরে আসা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম