ফিরে আসা
Advertisement
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লিমন মিয়ার সঙ্গে হিরুর পরিচয় হয়েছে বস্তির আতাউল্ল্যার চায়ের দোকানে। লোকটা মধ্যবয়স্ক, একটু বেঁটে, গাঁট্টাগোট্টা শরীর। ঠোঁটের ওপর এক গোছা কাঁচাপাকা গোঁফে তার চেহারা সুরত একটু রাশভারি দেখালেও লোকটা আসলে রসিক আর আলাপি। ফকিরাপুলে একটা রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারি করে। সেখানে কোনো এক মেসে থাকে।
হিরুর সঙ্গে পরিচয়ের মাত্রাটা একটু গাঢ় হয়েছে; কারণ লিমন তাকে গাড়ি চালানো শেখাবে বলেছে। রিকশাওয়ালা হিরুর কাছে এটি একটি স্বপ্নের মতো। ড্রাইভারি শিখতে পারলে তার জীবনটাই পালটে যাবে। ড্রাইভারদের বেতন অনেক। তাছাড়া গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরির আনন্দও তো আছে।
এক অলস বিকালে লিমন আসে হিরুর বাড়িতে। তাকে দেখে খুব খুশি হয় লিমন। বন্ধুকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘরের সামনে ছোট আঙিনাতে টুল পেতে বসতে দেয়। ঘরে ঢুকে ফরিদাকে বলে, বউ, আমার বন্ধু আসছে চা খাওয়াও। তারপর গলাটা খাটো করে বলে, ভালো করি চা বানাও বউ। উনি ওস্তাদ ড্রাইভার। আমাকে গাড়ি চালান শেখাবে। ফরিদার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। উনুনের ভেতর লাকড়ি গুঁজে দিতে দিতে বলে, আচ্ছা, দিতেছি।
বিকালের রোদ ছাদ টপকে নেমে গেছে পাশের উঁচু বাড়িটার পেছনে। হিরুর ছাপড়া ঘরের উঠোনজুড়ে প্রশান্তির ছায়া টলমল করছে। সেই ছায়ায় বসে লিমনের সঙ্গে হিরু গল্প জুড়ে দেয়। লিমন প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা হিরুর দিকে এগিয়ে দেয়। খুশিতে হিরুর চোখের মনি নেচে উঠে। বিদেশি সিগারেট। একশলা কুড়ি টাকায় বিকোয়। হিরু আয়েশ করে সিগারেটে টান দেয়, আর মুখ উঁচু করে ভক্ভকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে।
একটু পরেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের গ্লাস নিয়ে ফরিদা আসে। মাথায় ঘোমটা। ফর্সা মুখের একাংশ বের হয়ে আছে। নাকে ছোট লাল পাথরটা চুনির মতো জ্বল জ্বল করে। হিরু মাথা উঁচু করে তাকায়। ফরিদা দাঁড়ায় না। লিমনের দিকে এক পলক তাকায়ও না। মৃদু পায়ে ঘরে ঢুকে যায়। চায়ের গ্লাসে শব্দ করে চুমুক দেয় লিমন মিয়া তারপর চোখে-মুখে একটা সন্তুষ্টির ভাব ফুটিয়ে বলে, ভাবি তো খুব ভালো চা বানায়!
লিমনের কথায় হিরুও সন্তুষ্ট হয়। বলে, হ ভাই। আমার বউয়ের রান্নার হাত খুব ভালো, যা-ই রান্দে তাই মজা। বউটা বড় ভালো। মাটির মানুষ। সংসার ছাড়া আর কিছু বুঝে না। শান্তশিষ্ট স্বভাব। মেরে কেটে ফেললেও মুখ দিয়া টু শব্দ করবে না।
ভাবিরে মারধর করেন নাকি? ভুরু কুঁচকে হিরুর মুখের দিকে তাকাল লিমন মিয়া। উত্তরে হে হে করে হাসে হিরু। হিরুর হাসি দেখে যতটুকু বোঝার বুঝে নেয় লিমন। নাকে লাল পাথরের ঝিলিক দেওয়া ফর্সা মুখটা আরও একবার দেখার আশায় আড় চোখে ঘরের ভেতর তাকায়। মুখটা দেখা যায় না। কেবল ঘরের ভেতর থেকে ভাজাভাজির ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ আর চুড়ির টুং টাং শব্দ ভেসে আসে।
এমন সময় মনা এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। বোধ হয় পাশের ঘরের মালতির সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল। হিরু মেয়েকে কোলে টেনে নিল। মনা বাবার কোলে বসে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে লিমনের দিকে।
এইটা তোমার লিমন চাচা। আমার বন্ধু। মনার দিকে তাকিয়ে হিরু বলল, চাচারে ছালাম বল। কোনো কথা বলল না মনা। লিমনের মুখ থেকে চোখ নামিয়ে, উঠে দাঁড়াল সে তারপর তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে ঘরের ভেতর অদৃশ্য হলো।
হিরুর বাড়িতে লিমনের যাওয়া-আসা নিয়মিত হয়েছে। মাঝে-মধ্যেই আসে। একদিন হিরু বাড়ি ফিরে দেখে দরজার কাছে টুল পেতে বসেছে লিমন মিয়া। হাতে চায়ের গ্লাস। তাকে দেখে হাসল লিমন। বলল, ভাই, চায়ের তেষ্টা পাইছিল। আপনারে রেখে চা খেয়ে নিলাম। উত্তরে কিছু বলে না হিরু। নিঃশব্দে হাসল। হাসিটা নিষ্প্রাণ। লিমন চলে গেলেও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে থাকল হিরু। ফরিদার ওপর একটা সন্দেহ আর রাগ তার বুকের ভেতর কুণ্ডলী পাকাচ্ছে। রাতের খাবার খেতে বসলে মনের ভেতর পুষে রাখা রাগটা হঠাৎ ফণা মেলে ফোঁস করে উঠল। মাছের সালনে ঝাল বেশি হয়েছে বলে ফরিদার পিঠে দুম দাম করে কিল বসিয়ে পাতে পানি ঢেলে খাওয়া ফেলে উঠে গেল হিরু। মনা ভীতু স্বভাবের। বাবার রাগ দেখে খুব ভয় পায়। ঘুমের সময় সে জড়সড় ভাবে বাবার পাশে এসে শুয়ে পড়লেও ফরিদা বিছানায় এলো না। চোখবুজে থাকলেও হিরু জানে ফরিদা অন্ধকার এখন রান্না ঘরে বসে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে।
পরদিন কাজ থেকে ফিরে হিরু দেখল মনা দরজার মুখে পা ছড়িয়ে বসে আছে। তাকে দেখে মলিন গলায় বলে উঠল, বাজান, মা কই গেল? মা তো ঘরে নেই।
এরকম সময়ে তো ফরিদা কখনো কোথাও যায় না! হিরু শঙ্কিত হয়। তার সংশয়াকুল চোখ ঘরের ভেতর ফরিদার অস্তিত্ব খোঁজে। একপাশে দড়িতে ফরিদার শাড়ি আর ছায়া ভাঁজ করে রাখা, চুলার পাশে রান্নাকরা বাসনগুলো প্লেট দিয়ে ঢাকা দেওয়া, বেড়ায় ঝোলানো আয়না, নারকেল তেলের বোতল, ব্যবহার্য সবকিছুই তো আছে কেবল ফরিদা নেই। ঝুল জড়ানো বাতির হলদে অলোয় ঘরের ভেতরটা হিরুর কাছে হঠাৎ অন্ধকার মনে হয়। কোথায় গেল ফরিদা! বোকা বোকা চোখে মেয়ের দিকে তাকাল হিরু। মনার দুই চোখে জল টলমল করছে।
ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বউয়ের শরীরে হাত তোলা হিরুর একটা বাতিক। বিয়ের এ সাত বছরে তার হাতে মার তো কম খায়নি বউটা। কিন্তু মার খেয়ে কোনোদিন অভিমানে দরজার বাইরে পা দেয়নি সে। পিঁড়িতে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছে, তারপর একসময় আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে ঘরের কাজে মনোযোগ দিয়েছে। এ শান্ত স্বল্পভাষী মেয়েলোকটা কাউকে কিছু না বলে, এভাবে কোথায় চলে গেল? হিরু মনে মনে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সে কী করবে, কোথায় বউকে খুঁজবে ভাবতে ভাবতে দিশাহারা হয়ে গেল। এ রকম দুঃসময়ে লিমনের কথা মনে এলো। লোকটাকে নিয়ে একটা অশুভ চিন্তা মাথায় ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। দ্বিধাজড়িত পায়ে লিমন মিয়ার অফিসে হাজির হলো সে। ম্যানেজার মতো লোকটা জানাল দুদিন আগে লিমন চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না।
আজকাল রাতে হিরুর ঘুম হয় না। রাতে কখনো ঘুম না এলে এপাশ ওপাশ করে হির্।ু ফরিদার ঘুম পাতলা। অল্প নড়াচড়াতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। হিরুর শরীরে নরোম আঙুল বুলোতে বুলোতে বলে, ঘুম ন আয়? হাত বুলাই দি ক্যান? ফরিদার নরোম আঙুল হিরুর শরীরে সুড় সুড় করে হাঁটে। হিরু বুঝতে পারে না কখন আবার সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
হিরুর চোখে ঘুম নেই। পাশে মনা বেঘোর ঘুমাচ্ছে। একটু আগে ওকে বোবায় ধরেছিল। ঘুমের মধ্যে হাউমাউ করে চিৎকার করছিল। হিরু ওর শরীরে নাড়া দিয়ে ঘোর ভাঙিয়েছে। বোবায় ধরা ওর পুরোনো রোগ। হিরু আশাসুনির পীর সাহেবের কাছ থেকে একটা তাবিজ এনে মনার হাতে বেঁধে দিয়েছে। কাজ হয়নি। ফরিদা চলে যাওয়ার পর অসুখটা যেন আরও বেড়েছে। ঘুমের ভেতর কান্নার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কী সব যেন বলে। মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হিরুর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। মায়ের অভাবে মেয়েটা একেবারে মুষড়ে পড়েছে। সেও কি কম কষ্টে আছে? বিশেষ করে রাতে বিছানায় গেলেই ঘর ভর্তি শূন্যতায় হাবুডুবু খেতে থাকে। ঘরের ভেতর জমে থাকা অন্ধকারে নির্ঘুম চোখ মেলে জেগে থাকে। পাশের শূন্য বালিশটার দিকে তাকিয়ে কেবল ফরিদার কথা ভাবে। অনুভব করে বউটার জন্য বুকের পাঁজর ভেঙেচুরে একটা কষ্টের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। মুখচোরা বউটি ঘরময় কী রকম মমতা আর ভালোবাসার মায়াজাল ছড়িয়ে রেখেছে এটা যেন ফরিদার অনুপস্থিতিতে হঠাৎ করেই অনুভব করতে পারছে হিরু। চোখের সব ঘুমও যেন ফরিদার সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
বোধহয় একটা ছুঁচো ঢুকেছে। ঘরের আনাচে-কানাচে সুড় সুড় করে হাঁটছে আর কিচ কিচ শব্দ করছে। ছুঁচো আর ইঁদুরকে খুব ভয় পায় ফরিদা। সে থাকলে এই শব্দ শুনে ছটফটিয়ে জেগে উঠে হিরুর শরীরের সঙ্গে সেধিয়ে যেত। হিরু খাট থেকে নেমে ছুঁচোটাকে পিটিয়ে বের করে দিলে তবেই শান্ত হতো সে। ছুঁচোটা মেঝের চারপাশে ছোটাছুটি করছে। এখন বিছানা ছেড়ে নামতে ইচ্ছা করছে না হিরুর। ফরিদা নেই। ছুঁচোটাকে তাড়ানোর আগ্রহও যেন নেই। বিরক্তিকর শব্দের ভেতর চোখ কান বুজে চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকল সে।
এক সময় কান খাঁড়া করল হিরু। ঘরের দরজায় খুট করে শব্দ হলো যেন। বিছানা থেকে আস্তে করে মেঝেয় নামল সে তারপর কপাট খুলে বাইরে উঁকি দিল। দরজার কাছেই আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে তার রিকশাটা। আর কোথাও কেউ নেই এমন শূন্যতায় ঘিরে আছে চারপাশ। ছায়া ছায়া অন্ধকারে রিকশাটার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকল সে। ফরিদা প্রতিদিন কত না যত্ন করে ধুয়ে-মুছে রিকশাটা পরিষ্কার করে রেখেছে। এখনো যেন রিকশটার শরীরের ফরিদার যত্নের ছোঁয়া লেগে আসছে। হিরু ঠিক করেছে রিকশাটা বেচে দেবে। এখন কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন টন টন করে উঠল। ব্যবহারের জিনিস পুরোনো হলে মায়া জন্মে যায়।
একটা নীরব বুক কাঁপানো নিশ্বাস ফেলে কপাট বন্ধ করতে যাচ্ছিল হিরু, মনে হলো রিকশাটা নড়ে উঠল। শরীরে আলো-আঁধারির কালিঝুলি মেখে কেউ ত্রস্তে নেমে এলো রিকশা থেকে তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল তার পায়ের ওপর। মাথা নিচু করে শক্ত হাতে তার পা জড়িয়ে ধরে থাকল। গলার কাছে কান্না চেপে রাখার ফোঁসফোসানি শব্দ হচ্ছে। হিরু ভেবেছিলো পা ছাড়িয়ে নেবে। লাথি দিয়ে সরিয়ে দেবে। ঘরে ঢুকে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবে। কিছুই পারল না সে। তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠেছে। চোখের পাতা ভিজে উঠেছে। সে উবু হয়ে দুই হাতে দাঁড়া করালো তাকে, বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল, ঘরে চল বউ।
