লেখকের জীবনদর্শন, উপন্যাসের শিল্পরূপ
Advertisement
সরকার মাসুদ
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গদ্য, রোমান্স, পিকারেস্কজাতীয় রচনা এবং রাখালিয়া পটভূমিতে রচিত রোমান্টিক গল্পের উত্তরাধিকারকে একত্র করে এগোতে এগোতে আজ উপন্যাস আধুনিক লেখকের হাতে গড়া অনন্য এক প্রতিমা। আঠারো শতকের আগে কথাসাহিত্যিকরা উপন্যাসের শিল্প নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করেননি। বিষয়টি আরও অনেক পরে লেখকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং উনিশ শতকে গল্প-উপন্যাস সৃজিত হওয়ার পাশাপাশি এসবের শৈল্পিক চেহারা নিয়ে অসংখ্য চিন্তাধর্মী গদ্য লেখা হয়। জন্ম হয় ওয়াল্টার পেটারের মতো সৃষ্টিশীল সমালোচকের-যিনি মনে করতেন, সৌন্দর্য সৃষ্টি করা ছাড়া সাহিত্যের আর কোনো উদ্দেশ্য থাকা সমীচীন নয়। শিল্প নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাবনা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীতে। হেনরি জেমস, জেমস জয়েস, ডি এইচ লরেন্স, ই এম ফরস্টার, মাগ্রারেট ড্র্যাবল প্রমুখ কথাশিল্পী গল্প-উপন্যাস লেখার সমান্তরালে সাহিত্যের শিল্পরূপ নিয়ে যথেষ্ট মাথা ঘামিয়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাভাষী সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে নেই। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ আছেন সবার আগে। শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীম রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়রা গল্প-উপন্যাসের ভালো-মন্দ, শিল্প-অশিল্প বিষয়ে মতামত রেখেছেন তাদের গদ্যে। প্রসঙ্গত Aspects of Novei ও ‘উপন্যাস নিয়ে’, গ্রন্থ দুটি উল্লেখ করব। যে ধরনের সাহিত্যজিজ্ঞাসা প্রণোদনা কাজ করেছে ফরস্টার সাহেবের মনে, Aspects of Novei লেখার বেলায়; সেই একই জাতীয় শিল্পজিজ্ঞাসা কি দেবেশ রায়কে তাড়িত করেনি তার ‘উপন্যাস নিয়ে’ গ্রন্থটি রচনাকালে?
যে দৃঢ়তার সঙ্গে আমরা নাটককে নাটক, ছোটগল্পকে ছোটগল্প কিংবা সনেটকে বলি সনেট; উপন্যাসকে উপন্যাস বলার সময় সেই একই দৃঢ়তা কি আমরা বজায় রাখতে পারি? এই একুশ শতকে তা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কোনো একক ও সুস্থির সংজ্ঞা বোধ হয় আধুনিক উপন্যাস সম্বন্ধে আর খাটবে না। কেননা সাহিত্যের অন্য মাধ্যমগুলোর চেয়ে উপন্যাস অনেক বেশি হজম করেছে কাব্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ভূগোল, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, এমনকি চিত্রশিল্পও। উপন্যাস মানুষ কেন পড়ে? কারণ সে একটা দীর্ঘ গল্প পড়তে চায়। আধুনিক পাঠক এ কালের লেখকদের জীবনদর্শনের বা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে চায়। যারা অগ্রসর পাঠক তারা গল্পটা কী ভঙ্গিতে রচিত হলো তাও বুঝতে চায়। সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে উপন্যাসে গল্পে বা কাহিনির স্থান সবার আগে। বহু শতাব্দী আগে প্রণীত মুরাসিকির ‘গেঞ্জির গল্প’ আজও স্মরণীয় তার গল্পগুণের জন্যই। এটা তো বিশ্বসাহিত্যে প্রথম উপন্যাস প্রচেষ্টা যেখানে উপন্যাসসুলভ অনেক দিকের উপস্থিতি লক্ষযোগ্য। আবার ‘আলালের ঘরের দুলাল’ সম্বন্ধেও মোটামুটি একই কথা প্রযোজ্য। ‘আলাল...’কেও আমরা মনে রেখেছি তার রসময় সমাজজ্ঞানের জন্য; তার উপন্যাস হয়ে উঠতে চাওয়ার সচেষ্ট আকাঙ্ক্ষার জন্য।
অষ্টাদশ শতক ইংল্যান্ডের নতুন শ্রেণির আত্মবিকাশের কাল। এ সময় নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণি দেখা দেয়। ধর্ম, গির্জা, ধর্মাচার ও রাষ্ট্রচেতনা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল মানুষ। ‘স্বাধীনতা’কে তারা জীবনের মূলমন্ত্র হিসাবে গ্রহণ করল। এভাবে সৃষ্টি হয়েছিল কর্মচঞ্চল নতুন মানব সমাজের উপযোগী এক জীবনদর্শন। আর শক্তিমন্ত art form হিসাবে উপন্যাসের প্রকৃত আবির্ভাবের সঠিক সময় ছিল এটাই। Art of Fiction প্রবন্ধে হেনরি জেমস বলেছেন, As People feel life, so they will feel the art that is most closely related to it. নতুন শতাব্দীর ওই নতুন মানব সম্প্রদায় জীবন নিয়ে এনতার ভেবেছে। উপন্যাসের কারবার জীবন নিয়ে। তাই উপন্যাস ভালোবাসার বস্তু হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে। সেই সূত্রে তারা ‘শিল্প’ বস্তুটিকেও যথাসাধ্য বুঝতে পেরেছে, যেহেতু Art most closely related to it (জীবন)। জীবনের প্রতি তীব্র কৌতূহলবশত অষ্টাদশ শতকের মানুষ গৃহকোণের বাইরে বিশ্বপ্রকৃতিকে চিনতে চেয়েছে। সে যুগের সাধারণ মানুষও সাহিত্যকর্মে নিজেদের জীবনের প্রতিবিম্ব দেখতে ভালোবাসত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা তারা দেখতে পেতও। ফলে তখন উপন্যাসের বহু পাঠক। ফিল্ডিং, ডিফো, রিচার্ডসনরা জীবনকে বাস্তবে যেরকম সেভাবেই উপন্যাসে তুলে এনেছেন। এরা সবাই কমবেশি শিক্ষিত লোক। সবারই ছিল জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। গল্পে প্রযুক্ত বর্ণনাকে বা বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। কাজেই এ লেখকরা শেষ পর্যন্ত truth teller-এর বেশি কিছু হতে পারেননি। Belief is completely gratified by Defoe কথাটি ভার্জিনিয়া উল্ফ ড্যানিয়েল ডিফো সম্বন্ধে বললেও তা সমকালীন অন্য কথাসাহিত্যিকদের বেলায়ও প্রযোজ্য।
অষ্টাদশ শতকের উপন্যাস পাঠকের বিশ্বাসবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করেছে। অন্যদিকে, উনিশ শতকের উপন্যাস পাঠকের কল্পনাকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া তার উপায় ছিল না, যেহেতু সে তার শুধু গল্পে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। তাকে কাব্যের শরণাপন্ন হতে হয়েছে; আশ্রয় নিতে হয়েছে প্রতীকের। জর্জ এলিয়ট, চার্লস ডিকেন্স প্রমুখ লেখকের গ্রন্থ তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ডিফেন্স ‘Poetie fantasy’র প্রয়োগ দেখিয়েছিলেন নির্মম হাস্যরস উপস্থাপনের মাধ্যমে। ডিফেন্সের কবিমন প্রসঙ্গে Bleak House উপন্যাসে উপস্থাপিত কুয়াশার বর্ণনারীতিটি স্মর্তব্য। বিশ শতকী উপন্যাস কবিতাসহ অপরাপর শিল্পকলাকে গ্রহণ করেছে অনেক বেশি। এ সময়ের প্রধান উপন্যাসগুলো প্রধানত অন্তর্মুখী। মার্শেল গ্রুপ্ত, হেনরি জেমস, জেমস জয়েস তাদের প্রখর আঙ্গিকচেতনার ও বক্তব্যগত বৈশিষ্ট্যের জন্য স্মরণীয়। আঙ্গিকজনিত ওই বিশিষ্টতা বিশ শতকের গল্প-উপন্যাসে বিচিত্র রূপ ধারণ করেছে। এ শতকের আধুনিক কথাকোবিদরা হেনরি জেমসের কাছে অনেকাংশে ঋণী। হেনরির The Prteait of a Lady মুক্তি ও সম্মানপ্রত্যাশী এক তরুণীর প্রথানুগত্যের জাঁতায় নিষ্পেষিত হওয়ার গল্প। এ গল্প একইসঙ্গে প্রাকরণিক তীক্ষ্ন দৃষ্টিশীলতাও তুলে ধরেছে।
একটু আগে আমি গল্পের অন্তর্মুখিতার কথা বলেছি। এ অন্তর্মুখিতার বা inwardness-এর সাহায্যে ফ্লবেয়র ও দস্তয়েভস্কি উপন্যাসের আঙ্গিক রীতিতে বিশিষ্টতা সৃজন করেছিলেন। একই কাজের জন্য হেনরি জেমস আধুনিকদের পথিকৃত হয়ে আছেন। শুধু তা-ই নয়, উচ্চবিত্ত জীবনের অন্তর্লীন ক্ষয়িষ্ণুতা চিত্রণের ক্ষেত্রে হেনরি জেমস অনর দ্য বালজাকের স্মৃতিবহ। এখানে যে কথা বলতেই হবে তা হচ্ছে, জীবনের বহুধাখণ্ডিত ব্যাখ্যার প্রয়োজনে বিশ শতকের প্রথমার্ধে উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই ভেতরমুখিতা। এক্ষেত্রে ফ্রয়েডের ও ইয়ুঙের প্রভাব অবশ্যই সক্রিয় ছিল। আরও লক্ষণীয়, জেমস জয়েস ও ডি এইচ লরেন্সের মতো লেখক বিরাট বৈপরীত্য সত্ত্বেও তাদের উপন্যাসে প্রতীকের গৃঢ়ার্থসহ কবিতার আবহাওয়াকে কাজে লাগাতে পেরেছেন।
উপন্যাস হচ্ছে জীবনের নিকটতম শিল্পকর্ম। এর কাজের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। সেজন্য কাব্য, চিত্রকলা, নাটক, সমাজবিদ্যা, ইতিহাস প্রভৃতি থেকে কিছু-না-কিছু সাহায্য সে নিয়ে আসছে রচনাকে যুগোপযোগী করার স্বার্থে। থমাস হার্ডির উপন্যাসে প্রতীক, চিত্রকল্প ও রূপকের প্রয়োগ এবং কাব্যক্রান্ত ভাষায় ওয়েসেক্সের আঞ্চলিক জীবনধারা উপস্থাপনের ব্যক্তিত্বচিহ্নিত প্রয়াস, সন্দেহ নেই, পরবর্তী লেখকদের কাছে স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে ইউরোপের সংস্কৃতির প্রকৃত চেহারা তুলে ধরার বেলায় টমাস মান পর্যাপ্ত ইঙ্গিতের ও প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন, The Megic Mountain যার সেরা উপদাহরণস্থল। হার্ডি ও মান একে অপরের থেকে খুবই আলাদা। কিন্তু কথাসাহিত্যের রূপকল্প নির্মাণের ও প্রকরণের অগ্রগামিতার প্রশ্নে উভয়েই পরকালের আধুনিকদের কাছে অনুসরণযোগ্য।
হার্ডির কবিত্বময় প্লট কিংবা ডিকেন্সের অনুপুঙ্খসংবলিত অনেকটাই সাদামাটা ধরনের বয়ানরীতি থেকে বহু দূরে চলে এসেছি আমরা। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে আজ দেখতে পাচ্ছি, উপন্যাসে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিশদ বর্ণনাকে ছাড়িয়ে গেছে মনোলোকের চিন্তাতরঙ্গের অনুপুঙ্খায়ন। লেখকের কৌতূহলের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে। রূপের চেহারাতেও এসেছে ভিন্নতা। আঠারো/উনিশ শতকী লেখকদের আমরা অভিজ্ঞতার শোভাযাত্রা প্রদর্শন করতে দেখেছি। অভিজ্ঞতা ফলপ্রসূ হয় তখনই, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় অনন্য জীবনচেতনা। বিশ শতকের লেখকদের হাত দিয়ে ওই যুক্ততা সম্পন্ন হয়েছে। অভিজ্ঞতা, প্লট, প্যাটার্ন ও জীবনবোধের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে সেই রসমূর্তি, যা একালের উপন্যাসিকদের কাম্য। তাহলে কি আঠারো শতকের বা তারও আগের কথাকারদের অভীষ্ট এমন ছিল না? সুলিখিত রচনার অভিপ্রায়ী তারাও ছিলেন। তবে আমার ধারণা, অখণ্ড রসমূর্তি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সাহিত্যের শিল্প বা ভাষারীতি সম্বন্ধে তাদের মাথাব্যথা ছিল না। পৃথকভাবে এগুলো নিয়ে তারা ভাবেননি। কথাশিল্পীদের এ সংক্রান্ত চিন্তা-ভাবনার শুরু অষ্টাদশ শতকে। উনিশ শতকের তার বিকাশ এবং বিশ শতকে তার পরিণতি অর্জন। সেই সাহিত্য পরিণতি একুশ শতকে এসে বিচিত্র, সংক্রামী ও সংশয়ী চেহারা নিয়েছে।
ইতিহাসচেতন ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংস্পর্শজনিত প্রতিক্রিয়া থেকে জীবনদর্শনের জন্ম। সেই ব্যক্তি যদি উপন্যাসকার হন, সেক্ষেত্রে তিনি একটি সৃষ্টিশীল সচেতন মনের ধারক। লেখক, বিশেষত এ যুগের লেখক, উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মনের সৃজনশীলতায় বিশ্বাসী। এ সম্বন্ধেই হেনরি জেমস বহু আগে ‘quality of the mind’ কথাটি বলেছেন। বাস্তবতা যেমন বহুরূপী, তেমনি মানুষও অভিজ্ঞতার অন্তত বৈচিত্র্যের অধিকারী। লেখকের কাছে অভিজ্ঞতার আলাদা কোনো মূল্য নেই যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে তিনি ব্যবহার করছেন লিখিত রচনায় কিংবা বক্তৃতায়। এখানেই অনিবার্যভাবে এসে যাচ্ছে সুরুচির প্রসঙ্গ। কেননা মনের quality’র রকমভেদের সঙ্গে পার্থক্য ঘটে রুচির এবং সুরুচির সঙ্গে সন্ধিৎসু সৃষ্টিশীলতার মনিকাঞ্চন যোগ ঘটেছে বলেই সম্ভব হয়েছে The Ambassados Madam bovery, The Ediot, The outsider, Light in August ‘যোগাযোগ, ‘জাগরী’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘চাঁদের আমাবস্যা’ কিংবা ‘খোয়াবনামা’র মতো বড় মাপের উপন্যাস সৃষ্টি। রচনা অনুপুঙ্খে বিশ্বাসী এমলি জোলা বাস্তবতার সার্বিক চেহারা তুলে আনার গরজে ‘পরিবেশকে আত্মসাৎ’ (To absorb the atmosphere) করার কথা বলেছিলেন। প্রকৃত বাস্তবের সঙ্গে লেখকবর্ণিত বাস্তবের সাদৃশ্য একটা গুণ হতে পারে। এক্ষেত্রে লেখকের অবলোকনের সঙ্গে হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যান্য সব কিছুর সঙ্গে চাই বড় ধরনের অনুভবশক্তি যা ব্যতিরেকে উপন্যাস নামের শিল্পপতি মাটি গড়া একেবারেই অসম্ভব। উঁচু মানের অনুভব সামর্থ্য ধারণের ও প্রদর্শনের জন্য ‘quality of mind’-এর বিকল্প আছে কি?
উন্নত ভাবুক মনের অনবদ্য প্রকাশ আমরা যেন জয়েস, বোরহেস, কামু, হেমিংওয়ে, ফিটজিরাল্ডদের রচনাকর্মে; তেমনি কেনাজাবুরো ওয়ে, কূট ভনেগাট, জেন হার্শফিল্ড, রেমনড কার্ভার, হান কাঙদের উপন্যাসেও দেখেছি। কার্ভার, হানকাড, হার্শফিল্ডের মতো নতুন কথাসাহিত্যিকরা ব্যতিক্রমী বিষয়বস্তুকে চমৎকারভাবে মেলাতে পেরেছেন তাদের স্বপ্রতিভানির্ণীত রচনাভঙ্গির সঙ্গে। এদের প্রত্যেকের রচনা অসাধারণ ভাবনা-কল্পনার দ্বারা বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
রোমান্টিক কবিদের কাছে সৃজনী কল্পনাই সবেচেয়ে বড় কথা। আধুনিক ঔপন্যাসিকের কাছে প্রধান হচ্ছে বুদ্ধিদীপ্ত কল্পনা, যা ভাবনার মননশীলতাকে ছুঁয়ে যায়। স্বাভাবিকতার ও স্বতঃস্ফূর্ততার পক্ষে আমরা যত কথাই বলি-না কেন, উপন্যাস শেষ পর্যন্ত একটা তৈরি করা জিনিস। সেজন্য শিল্পকর্মমাত্রই কমবেশি নিপুণ ও অভিনিবিষ্ট নির্বাচন। তা সত্ত্বেও আমরা সেই রচনাকে বেশি পছন্দ করি, যার শরীরে নির্মাণের চিহ্ন নেই বা সামান্যই আছে। মননমুখী কল্পনার বিশিষ্ট ধরন লেখকের অন্তর্দৃষ্টিকে সজাগ রাখতে সাহায্য করে। উপন্যাসকরা তার গ্রহণ-বর্জন কর্মকাণ্ডে এভাবে সাহায্যপ্রাপ্ত হন। উৎকৃষ্ট মনের উন্নত ভাবনা-কল্পনা রূপান্তরিত হতে পারে উৎকৃষ্ট শিল্পকর্মে। রূপান্তরের এ প্রক্রিয়ায় প্রতীকের ও রূপকের প্রয়োগ হয়ে ওঠে অসামান্য। অভিজ্ঞতাঋদ্ধ অনুভূতি ওই রূপকের বা প্রতীকের বড় সহযোগী তাতে সন্দেহ কী?
অনেক সার্থক মহাকাব্যের মতো অনেক আধুনিক উপন্যাসও শান্তরস পরিণামী। এ জাতীয় রচনা অস্থির ও উচ্চাশী নয়। এসব উপন্যাসে আশ্রিত জীবনের গভীর মর্মবোধ পাঠকের মনে নিয়ে আসে শান্ত-সমাহিত ভাব। ‘আরণ্যক’ কিংবা টনি মরিসনের The Bluest Eye পড়ার পরে কি আমরা সমজাতীয় সংবেদে আক্রান্ত হই না? একুশ শতকের ঔপন্যাসিক চান বাস্তবতার বিশদ বর্ণনার পাশাপাশি মনোলোকের জটিল চিত্রমালা; সেইসঙ্গে কবিতা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্রের মতো বিষয়ের প্রয়োগ। আধুনিক পাঠক উপন্যাসে কাব্যের বা সিনেমার উপস্থিতি মেনে নিলেও গল্পটা অবশ্যই চান। তারা অবশ্য সেই গল্পের সাবেকী ধাঁচের উপস্থাপনা পছন্দ করেন না। এখন ভাব-কল্পনার ও আঙ্গিকের নতুন ধরনের প্রকাশের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক যা করতে চাইছেন তাতে যদি জীবনের তাপ না থাকে, গল্পের মজা ব্যাহত হয়, তাহলে পাঠক মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য। ১৫-২০ বছর ধরে দেশে-বিদেশে যেসব উপন্যাস বেরোচ্ছে তার ৯৫ ভাগই ওই জাতীয় যেখানে ভাষাটিই গোলমেলে।
