Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি

বাংলা উপন্যাসে পালাবদলের দ্যোতক

Icon

সেলিম আকন্দ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা উপন্যাসে পালাবদলের দ্যোতক

বাংলা সাহিত্যে চিরাচরিত কাহিনি-নির্ভরতার বদলে চরিত্রনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার ‘চোখের বালি’ উপন্যাসটি এ নবধারার স্মারক উপন্যাস হিসাবে বিবেচিত। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নববাবুবিলাস’, ‘নববিবিবিলাস’; কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’ ইত্যাদি নানা নকশাধর্মী রচনা এবং প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত বাংলা উপন্যাস মূলত কাহিনিনির্ভরতার ওপর সর্বৈব নির্ভরশীল ছিল। ‘চোখের বালি’ উপন্যাস রচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা উপন্যাসকে কাহিনিনির্ভরতার একরৈখিক পৌনঃপুনিকতার বারংবারতা থেকে ভারমুক্ত করেন। তিনিই আখ্যান বয়ানের বহুল চর্চিত পন্থা ও পদ্ধতিকে পরিহার করে এবং ঘটনাবহুল কাহিনি বর্ণনার সরলরৈখিক অবলম্বনকে পেছনে ফেলে চরিত্রনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী আধুনিক উপন্যাস রচনার সূচনা করেন। অথচ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা (১৮৬৫) উপন্যাস রচনার মাত্র ১২ বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সনাতনধারার ‘করুণা’ (১৮৭৭) উপন্যাস রচনার মাধ্যমে ঔপন্যাসিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার আদলে এরপর ১৮৮৩ সালে বউ ঠাকুরানীর হাট এবং ১৮৮৭ সালে ‘রাজর্ষি’ উপন্যাস রচনা করেন। এরপর তিনি ১৫ বছর বিরতি নেন। তিনি শুধু ‘নবপর্যায়ে বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক শ্রীশচন্দ্র ও সহসম্পাদক শৈলেশের অনুরোধ ও বারংবার উপরোধেই এ উপন্যাসটি রচনা করেননি, ভেতরে ভেতরে দীর্ঘ সময় নতুন কিছু সৃজনের লক্ষ্যে বিপুল প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। বাংলা উপন্যাসধারার সাবেকি পন্থিতার বিপ্রতীপে তিনি পাশ্চাত্য আধুনিক ধারায় নিজের মননের অবস্থান সুস্থির করে ‘চোখের বালি’ উপন্যাস রচনা করেন। নবধারার এ উপন্যাস রচনা করে বাংলা কবিতার মতো উপন্যাস সাহিত্যেও একজন পথিকৃৎ শিল্পী ও স্রষ্টা হিসাবে তিনি নিজের পারাঙ্গমতার পরিচয় দেন। এভাবে কাহিনির পরিবর্তে চরিত্রকে উপন্যাসের ভিত্তিমূলে স্থাপন করে মানবীয় চিরন্তন প্রেমসম্পর্কিত অন্তর্দ্বন্দ্বমূলক জটিলতার বুননে নির্মিত হয়েছে তার ‘চোখের বালি’ উপন্যাসটি। তিনি তার এ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর আধ্যাত্মিক, আবেগিক ও মানসিক জীবন অন্বেষণ করার জন্য চরিত্রায়ণ ও প্রেরণার ওপর গভীরভাবে আলো ফেলেছেন। তার বিশ্লেষণ ও বর্ণনার ধরন এ উপন্যাসের চরিত্রের আবেগ-অনুভূতির এবং ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার কারণগুলো পরীক্ষা করে, আখ্যানকে চালিত করে এবং গল্পটিকেও ব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিণতিমুখী করে তোলে। এছাড়া মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ চরিত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ সত্তার আবেগিক, মানসিক ও দ্বান্দ্বিক অবস্থাকে ভীষণভাবে দ্যোতিত করে।

মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদের অনুশীলনের প্রধান অবদানকারী হিসাবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ফিউদর দস্তোভয়স্কি, হেনরি জেমস, প্যাট্রিক ম্যাকগ্রা, এডিথ হোয়াইটন প্রমুখ ঔপন্যাসিককে গণ্য করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা উপন্যাসে এ নতুন ধারার নবপথিক হিসাবে নতুন পথের দিশা দেন। এ গ্রন্থের সূচনায় তিনি তার এ পালাবদলের ইঙ্গিত দেন, ‘মানব বিধাতার এ নির্মম সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিবরণ তার পূর্বে গল্প অবলম্বন করে বাংলা ভাষায় আর প্রকাশ পায়নি’।

বস্তুত ‘চোখের বালি’ চিরাচরিত ঘটনার ঘনঘটায় আকীর্ণ আখ্যানধর্মী উপন্যাস নয়। চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের আঁতের কথা বের করে আনাই ছিল পাশ্চাত্য আধুনিক উপন্যাসের ভাবধারায় ভাবিত ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথের মৌল উদ্দিষ্ট। মূলত উনিশ শতকের শেষ দশকের যুগান্তকারী নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সমসাময়িক কালের জাতিক ও আন্তর্জাতিক সময়, সমাজ ও সাংস্কৃতির অন্তরস্থিত মানব অস্তিত্বের সর্বগ্রাহী সমস্যা বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে প্রথমবার ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের মাধ্যমে শিল্পরূপ লাভ করে। মহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশা লতা ও বিহারীর চতুর্ভুজ প্রেমের জটিল আবর্তে আধুনিক মানুষের যন্ত্রণায় জর্জরিত যাপিতজীবনের অনুসন্ধান করা হয়েছে এ উপন্যাসে। মোট ৫৫টি অধ্যায়ে ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের কাহিনি বিন্যস্ত হয়েছে। সুখের সংসার মহেন্দ্র ও আশার। হঠাৎ সে সংসারে বাল্যবিধবা বিনোদিনীর আগমন ঘটে। মায়ের আগ্রহকে অগ্রাহ্য ও অবজ্ঞা করে মহেন্দ্র একদা এ বিনোদিনীকেই বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আবার সে বন্ধু বিহারীর মনে কষ্ট দিয়ে তার জন্য নির্বাচিত ও নির্ধারিত করা পাত্রী আশালতাকে হঠাৎ করেই বিয়ে করে বসে। মায়ের আঁচলগাঁথা ভালোবাসায় কমতি হওয়ার আশঙ্কায় যে কিনা একসময় বিয়ে পর্যন্ত করতে চায়নি, সেই মহেন্দ্র মা রাজলক্ষ্মী, বন্ধু বিহারী এবং তাবৎ দুনিয়াকে বেমালুম ভুলে বউকে নিয়ে সর্বক্ষণ আহালাদের আতিশয্যে মত্ত হয়ে পড়ে। তার এ আত্মমগ্ন অবস্থা মা রাজলক্ষ্মীর মনেও বেদনার সঞ্চার করে। মহেন্দ্রর এমন যখন আত্মহারা বেসামাল অবস্থা, সেই সময় রাজ্যের ক্ষোভ, দুঃখ এবং মহেন্দ্রকে না পাওয়ার যন্ত্রণাকে সঙ্গে নিয়ে এ বাড়িতে বিনোদনীর আগমন ঘটে। অত্যল্পকাল পরেই রূপ, গুণ, রুচিবোধ, প্রজ্ঞা ও আপন কৌশলে সে রাজলক্ষ্মীর পাশাপাশি এ বাড়িতে প্রায় গৃহকর্ত্রী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সে এমন উচ্চতায় নিজেকে উন্নীত করে যে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য আশা লতা বিভোর ও ব্যাকুল হয়ে ওঠে, এমনকি যে বিনোদিনীকে পায়ে ঠেলে দিয়েছিল, সেই মহেন্দ্রও তার গুণগ্রাহী ও প্রেমপ্রার্থী হয়ে ওঠে। প্রিয় সাথির ছদ্মবেশে অল্পায়াসেই বিনোদিনী আশা ও মহেন্দ্রের হৃদয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুর অধিক বন্ধুর মতো জায়গা করে নেয়। এমনকি সে আশালতার নতুন নাম ঠিক করে দেয় ‘চোখের বালি’ বলে। নতুন এ নামকরণের মধ্য দিয়ে আসলে সে তার না পাওয়ার যন্ত্রণা, বিদ্বেষ, ঈর্ষার অনলকে প্রতীকায়িত করার প্রয়াস পেয়েছে। স্থির ও অবিচলিত অথচ ধীর পদক্ষেপে সে আশ ও মহেন্দ্রের মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত করেছে। অন্যদিকে মহেন্দ্র ও বিহারির সঙ্গে তার প্রেমময়-মায়াবী ভাববিনিময়ের ধরন একেবারেই শৈল্পিক এবং বুদ্ধিদীপ্ত। দুই পুরুষকেই সে নিজের রূপ, লাবণ্য, গুণ প্রেম ও মোহে মোহগ্রস্ত করে তোলে। দুই বন্ধুকেই সে আত্মহারা প্রেমের ঘোরে হাবুডুবু খাওয়াতে থাকে। এ সময়ে তার সব অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা ও অশান্তির মূল কারণ হিসাবে সে বারংবার মনে মনে, এমনকি কুশলী আচরণেও মহেন্দ্রকেই দায়ী করেছে। আবার বিহারীকে গোপনে আবেগের দুর্বলতার খাদমুক্ত করে খাঁটি সোনায় পরিণত করার দায়িত্ব বিনোদিনীই পালন করেছে। তার সংস্পর্শে বিহারীর অন্তরে শুধু প্রেম নয়, তার পৌরুষেরও জাগরণ ঘটেছে। গার্হস্থ্যকর্ম, সেবা ও সাহচর্যে সে রাজলক্ষ্মীকেও একদা তাকে বউ করে ঘরে না আনতে পারার অপূর্ণতা ও অপ্রাপ্তির যন্ত্রণায় জর্জরিত করেছে। মূলত ঔপন্যাসিক এভাবে কাহিনির বিস্তৃত বয়ানবাহুল্যের পরিবর্তে সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসাবে প্রদীপ্ত করার জন্য কার্যকারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর ভর করেছেন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আকরাম হোসেন তার ‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস: চেতনালোক ও শিল্পরূপ’ গ্রন্থে লিখেছেন, বিহারী-বিনোদিনী-মহেদ্রের গুহায়িত বিচিত্র স্তরসংকুল প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি উন্মোচনের জন্য রবীন্দ্রনাথ কার্যকারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পথে অগ্রসর হয়েছেন, ফলে ঘটনা স্রোত অনিবার্যভাবে হয়ে উঠেছে মন্থর। ‘আসলে ঘটনা স্রোতের সম্মোহনে সান্নিপাত না করে চরিত্রস্রোতের প্রেক্ষণবিন্দু দিয়ে তিনি তার উপন্যাসের অবয়ব নির্মাণ করেছেন।’

মূলত গুরুতর ঘটনাগুলোর বিন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে একেবারেই স্বল্পভাষী ও স্কেচধর্মী শিল্পীর পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করেছেন। এখানে সংঘটিত ঘটনাপরবর্তী মানসক্রিয়ার বিস্তৃত বিশ্লেষণে, সর্বনামের বিস্ময়কর ব্যবহারে, প্রাসঙ্গিক যথাশব্দ ও বাক্য প্রয়োগে, টানটান সংলাপ সৃষ্টিতে, জুতসই উপমা, উৎপেক্ষা ও চিত্রকল্প নির্মাণে, রূপক এবং প্রতীক উদ্ভাবনে এবং পরিবেশের বিশ্বস্ত আবহ তৈরিতে যেন তিনি সদা কুশলী এক শিল্প-ভাষ্যকার।

বস্তুত কলকাতায় মহেন্দ্রের বাড়িতে বিনোদিনীর আগমন উপন্যাসটির আখ্যানে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টির অবতারণা করলেও এ ঘটনার বিবরণ তিনি দিয়েছেন খুবই সংক্ষেপে এবং একান্তই নির্মোহভাবে। বিধবা আমদানি করে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসের রীতিকে অনুসরণ করেছেন বলে আপাত মনে হলেও গভীরভাবে দেখলে তার রচনাভঙ্গি ও প্লট বিন্যাসের ধরনকে একেবারেই নতুনত্বের স্বাক্ষরবাহী বলে মনে হবে। ফলত ঔপন্যাসিকের নজর এ উপন্যাসে আখ্যান বর্ণনায় ছিল না, ছিল ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে চরিত্রগুলোর মানসে সৃষ্ট ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, রাগ-অনুরাগ-বিরাগ তথা চরিত্রগুলোর মানস বিশ্লেষণ প্রবণতার পারদকে প্রজ্বলিত করার দিকে। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেছেন, ‘কার্যত বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে নীতিবোধে উদ্বোধিত, রবীন্দ্রনাথ সেখানে ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যে শ্রদ্ধাশীল’। এছাড়া তিনি ১৩টি পত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কাহিনির জটিলতা সৃষ্টিতে আখ্যান বর্ণনায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছেন। এছাড়া উপন্যাসের শুরুতে রাজলক্ষ্মী ও অন্নপূর্ণার মধ্যে অহেতুক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও টানাপোড়েন সৃষ্টির পশ্চাতেও চরিত্রগুলো যে চরম দ্বন্দ্ব সংক্ষুব্ধতার মধ্য দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে তার ইঙ্গিত বহন করেছে। এভাবে শুরু থেকে শেষ অবধি এক চরিত্রের সঙ্গে অন্য চরিত্রের টানাপোড়েনের মাধ্যমে উপন্যাসটি আখ্যানকেন্দ্রিক না হয়ে চরিত্রকেন্দ্রিক উপন্যাসে পরিণত হয়েছে।

আসলে এ উপন্যাসের গঠন-কৌশল বিশ্লেষণেও জগদবিখ্যাত উপন্যাস-বিশ্লেষক ইএম ফ্রস্টারের ‘আসপেক্টস অব দ্য নোবেল’ গ্রন্থে বর্ণিত আলংকারিক শিল্প-সৌন্দর্যে বিভূষিত হয়েছে।

বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে উপন্যাসের নামকরণেও তিনি প্রথমবার শ্লেষের অনন্য ব্যবহার করেছেন। আশা এবং বিনোদিনী যখন সখী পাতায়, তখন আশা তার নাম দেয় বকুল ফুল, গঙ্গাজল। কিন্তু বিনোদিনী সুকৌশলে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই আশার নাম দেয় চোখের বালি। আসলে আশা বা বিনোদিনী নয়, এ উপন্যাসের মহেন্দ্র, বিহারী, রাজলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা তথা সব চরিত্রকেই সবার চোখের বালি বা চক্ষুশূল হিসাবে বিম্বিত করা হয়েছে। এ কারণে রবীন্দ্র সমালোচক অশোক কুমার মিত্র ‘চোখের বালি’ নামকরণ ‘যথার্থ হয়েছে’ বলেই মনে করেছেন। এছাড়া এ উপন্যাসের সব চরিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তারী চরিত্র হিসাবে বিনোদিনী নামটির মধ্যেও যেমন মোহ, মায়া, প্রবল প্রেম-ঈর্ষা, খেদ অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার তাৎপর্য যেমন রয়েছে; তেমনই রয়েছে চমক ও ঝিলিক। তাই ১৮৮০ সালে ‘বিনোদিনী’ গল্প রচনা করে রবীন্দ্রনাথের মন ভরেনি। তিনি এ নামে ২০ বছর পরে এ উপন্যাস লেখেন। পরে অবশ্য ‘চোখের বালি’ নামকরণ করলেও বিনোদিনীকেই এ উপন্যাসের কেন্দ্রমূলে স্থান দিয়েছেন। তাকে কেন্দ্র করেই এ উপন্যাসের পটভূমি, প্রেক্ষাপট, আখ্যান, চরিত্র এবং বর্ণনা ও বিশ্লেষণে বিভিন্ন রীতির প্রয়োগ সাধন করেছেন। আসলে বিনোদনীর নানারৈখিক মনোভাবনা ও মনোভঙ্গির অন্তঃস্রোতের নির্যাসে আবর্তিত ও বিবর্তিত হয়েছে এ উপন্যাসের সব ঘটনা স্রোত। এ কারণে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘চোখের বালি’ উপন্যাসকে কাহিনির ভার পরিহারমূলক উপন্যাস বলা হয়। সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘কালান্তর’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাহিনীর ভার পরিহার করে ব্যক্তিত্বের ফলস্বরূপ সংকটকে উপন্যাসের বিষয় হিসাবে ব্যবহার করলেন।’ অর্চনা মজুমদার তার রবীন্দ্র-উপন্যাস পরিক্রমায় গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এ উপন্যাসের ঘটনা গৌণ, চরিত্র সংঘর্ষই মুখ্য।’ আসলে চরিত্রপ্রধান উপন্যাস হিসাবে ‘চোখের বালি’ বাংলা উপন্যাস সাহিতের সরু পথরেখাকে রাজপথরূপে প্রবল ও প্রচণ্ডভাবে প্রশস্ত করেছে।

বস্তুত মানবমানবীর নিগূঢ় অন্তর্জগতের প্রেম সম্পর্কের এবং মানবচরিত্রের জটিল রহস্য উন্মোচন, উদ্ভাসন, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সৌকার্যে ও সৌন্দর্যে বাংলা কথাসাহিত্যে ‘চোখের বালি’ উপন্যাসটি একটি পালাবদলের দ্যোতক হিসাবে দেদীপ্যমান যেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .