Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

আবুল কাসেম ফজলুল হক

তিমিরে আলোর নক্ষত্র

Advertisement

Icon

মনি হায়দার

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তিমিরে আলোর নক্ষত্র

Advertisement

আবুল কাসেম ফজলুল হক সেদিনই আইকনে পরিণত হয়েছেন, একমাত্র পুত্র ফয়সাল আরেফীন দীপনের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিক্রিয়ায় যখন বলেন, আমি পুত্র হত্যার বিচার চাই না এই রাষ্ট্রের কাছে। সেদিনই বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামো পুরো নগ্ন হয়ে গেছে। আবুল কাসেম সারা জীবন ভোগের ক্ষমতা চর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন। যদিও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসাবে জীবন পরিচালনা করেছেন, কিন্তু সারাটা জীবন বাংলাদেশের ক্ষুদার্থ দারিদ্য পীড়িত জনতার করুণ ও বিষণ্ন জীবনের মুক্তির পথ রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা নিশ্চিত জীবন ভোগের নয়, তিনি দেখেছেন সাধনার গৃহ হিসাবে। শিক্ষকতাকে তিনি নিয়েছিলেন নিজ জীবনের মহান ব্রত হিসাবে। যখনই, যার সঙ্গে দেখা হয়েছে-হোক ছাত্র কিংবা সুভানুধ্যায়ী, স্যার কেমন আছ জিজ্ঞাসার পরই প্রশ্ন করতেন-কী বই পড়ছ? কার বই পড়ছ?

দুটি প্রশ্নের মধ্যেই আবুল কাসেম ফজলুল হক নিজের পথ মতো ও আদর্শ প্রকাশ করতেন অনন্য মমতায় ও প্রজ্ঞায়। ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন কিশোরগঞ্জে। একইসঙ্গে আবুল কাসেম ফজলুল হক-চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক, সমাজবিশ্লেষক, ইতিহাসবিদ, নিবিড় ও কঠোর সাহিত্য সমালোচক, নিষ্ঠাবান গবেষক এবং সত্যানুসন্ধানী ইতিহাসবিদ।

আমরা যদি আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রকাশিত বইয়ের নামগুলোর দিকে তাকাই, বইগুলো না পাঠ করলেও তার অন্তর্গত মর্মরধ্বনি শুনতে পাই। প্রথম বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয় পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই-১৯৭২ সালে। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বইয়ের নাম-কালের যাত্রার ধ্বনি, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, উনিশ শতকের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও বাংলাসাহিত্য, নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি, যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা, মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব, মানুষও তার পরিবেশ, রাজনীতি ও দর্শন, বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য, আশা আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে, সাহিত্য চিন্তা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, অবক্ষয় ও উত্তরণ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগন্ত, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে, সংস্কৃতির সহজ কথা, আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা, মানুষের স্বরূপ, রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ, প্রাচুর্যে রিক্ততা এবং শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। বইগুলোর নামের মধ্যেই অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক নিজের জীবনের অভীস্পা, লক্ষ, সাধনার প্রকাশ আমরা অনুভব করতে পারি। অধিকাংশ বইয়ের নামের সঙ্গে সংস্কৃতি শব্দটি যুক্ত। তিনি জানতেন সব বাধা ও বিপত্তির উত্তরণ ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে সামনে এগিয়ে যেতে হলে, ধান ও পানের সঙ্গে সংস্কৃতির ইতিবাচক উন্নয়নও জরুরি। যদি জাতির সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্যে অগ্রসর না হতে পারে, মুখ থুবড়ে পড়বে।

সংস্কৃতির জাগরণে পিছিয়ে পড়লে বাংলাদেশে পিছিয়ে যাবে। যদি বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি সভ্যতা ভাষা সংগীত নৃত্যকলা ও নাট্য অনুসঙ্গে সংস্কৃতির বিপুল বিকাশ ঘটাতে পারতাম তাহলে অন্ধ ধর্মীয় জিগির থেকে মুক্ত হয়ে নব নব উদ্যমে জাতি এগিয়ে যেতে সক্ষম হতো, যার স্বপ্নই দেখেছেন আমৃতু আবুল কাসেম ফজলুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি সান্নিধ্যে পেয়েছেন সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের, যেমন-শহীদ মুনীর চৌধুরী, জ্ঞানবৃক্ষ ড. আহমদ শরীফ, ড নীলিমা ইব্রাহিম প্রমুখের। আরও পেয়েছিলেন সংগ্রাম মুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহ-চলছিল বায়ান্নোর মহান ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি আবুল কাসেম ফজলুল হকের মানসসংসার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে, দিনে দিনে তিনি বাংলার বিপন্ন সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন সব শুভ চিন্তা ও সাধনা একত্র করে। প্রায় প্রতিটি লেখায়, নানা অনুষ্ঠানে বক্তৃতায়, টিভি আলোচনায়-বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে নিজের চিন্তা ও ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার সযত্ন প্রয়াস নিয়েছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের বড় শক্তি-অনড় সত্যবাদিতা। তিনি যা সত্য মনে করতেন, প্রকাশে দ্বিধা করতেন না। আওয়ামী শাসনের সময়ে কোনো সভা-সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মান্যবর তাজউদ্দীন আহমদ এক ধরনের নিষিদ্ধ ছিলেন। হালুয়া রুটি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে কেউ-সে আওয়ামী নেতা বা বুদ্ধিজীবী হোন, কেউ উচ্চারণ করতেন না। কিন্তু ব্যতিক্রম আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি পরিপ্রেক্ষিত আসলেই তাজউদ্দীন আহমেদের জীবন ও কর্মসাধনা সম্পর্কে অবলিলায় বক্তব্য রেখেছেন। বাংলাদেশের অসহিষ্ণু সমাজ বাস্তবতায় সত্য বলার বিপদ অনেক। তিনি সেই বিপদ সম্পর্কে কী জানতেন না? নিশ্চিত জানতেন, কিন্তু পরোয়া করতেন না। নিজের অভিপ্রায়কে নির্ভিক চিত্তে বলার মানুষের সংখ্যা খুব কম। অন্যতম ব্যতিক্রম ছিলেন ১৯১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গিদের হাতে নিহত লেখক ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

ঘৃণাক্রান্ত সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে পরিবর্তন করে নতুন সংস্কতির আলোয় সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম বাহন-পত্রিকা। পত্রিকার লেখা প্রকাশ ও পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর মধ্যদিয়ে রুচি গঠনের একটা বিশাল দায় আছে। আবুল কাসেম সেই দায় পালন শুরু করেছিলেন বলা যায় জীবনের শুরু থেকে। ১৯৬২-১৯৬৩ সাল, এক বছর সম্পাদনা করেছেন ‘সুন্দরম’। মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৮২ সাল থেকে সম্পাদনা করেছেন ‘লোকায়ত’ সাহিত্য সংস্কৃতির পত্রিকা। ‘লোকায়ত’ পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নবীন লেখকের লেখাও তিনি পরম যত্নে প্রকাশ করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল-অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসুক তরুণরা। নবীনের হাত ধরে সমাজ শিক্ষা ও সংস্কৃতি সামনের দিকে এগিয়ে চলুক সব ধরনের কূপমণ্ডূকতা পরিহার করে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ‘লোকায়ত’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

আমরা আবুল কাসেম ফজলুল হকের অন্যদিকে তাকালে, দেখতে পাব তিনি রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক কতটা দূরে অবস্থান করতেন। নির্ণায়ক হতে পারে, পুরস্কারপ্রাপ্তি। তিনি সারা জীবনে চারটি পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭৪ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার-১৯৮১, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯৭ এবং অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার ২০০৬ সালে। আবুল কাসেম ফজলুল হক একুশে পদক বা স্বাধীনতা পুরস্কারও পাননি। কেন পাননি? তিনি নিম্ন শ্রেণির দালালি করতেন না, বরং ঘৃণা করতেন। এ সময়কালের মধ্যে যারা সরকার চালিয়েছে-তারা পুরস্কার কাদের বিতরণ করেছেন? তাদের দল ও রাজনীতির কাছে যারা সারমেয় ছিল, তাদের বিলিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত শিরদাঁড়া উঁচু করে যারা দেশ সমাজ ও জনগণের সংস্কৃতির গণজাগরণের জন্য নিবেদিত ছিলেন সরকারের বা ক্ষমতার পদলেহন না করে, তারা উপেক্ষিত থেকেছেন। যেমন আবুল কাসেম ফজলুল হক, ইতিহাসবিদ-বাংলা এনসাইক্লোপিডিয়ার প্রবক্তা-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামসহ আরও অনেকে। কিন্তু আখেরে কি ফল ভালো হয়েছে? পুরস্কারের দিকে তাকালে মর্মে মরে যেতে ইচ্ছা করে-ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আবুল কাসেম ফজলুল হক অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু তিনি একুশে পদকই পাননি। এ কেমন অরাজক পরিস্থিতি? কেমন করে দেশে বুদ্ধিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, যদি রাষ্ট্র বা সরকার যথাযথ ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন না করে? প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি কী পুরস্কারের প্রতি লালায়িত ছিলেন? প্রশ্নই আসে না, তিনি আবুল কাসেম ফজলুল হক নিজেই পুরস্কারের প্রতীক। যখন কোনো অনুষ্ঠানে, সভা-সমাবেশে গেছেন, সেই অনুষ্ঠান পূর্ণ হয়ে উঠেছে জ্ঞানের প্রবহধারায়। কিন্তু সমাজের বা রাষ্ট্রের দায় থাকে, কে উপযুক্ত, কে পরিতাজ্য-নির্ণয়ের। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের-আমরা দালাল ও রুচিহীন চাটুকার পরিবেষ্টিত একটি সমাজ পেয়েছি। উপযুক্ত দিক ও দর্শনের কোনো নিদর্শন উপস্থাপন করতে পারিনি। ফলে, প্রকৃত সারসরা উপেক্ষিত থাকেন। যা, কল্যাণকর বা শুভবোধের পরিচায়ক নয়।

সরকারের বাইরেও বেসরকারিভাবে নানা প্রতিষ্ঠান কত পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদান করছে। বিস্ময়কর ঘটনা-এ পুরস্কার বা সম্মাননা থেকেও আবুল কাসেম ফজলুল হক অনেক দূরে। সরকার না হয় দালালি পছন্দ করে কিন্তু বেসরকারি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানও আবুল কাসেম ফজলুল হককে এড়িয়ে থেকেছেন। কিন্তু কেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো ধীমান প্রকৃত সাধকেরা নিমগ্ন থেকে নিঃশব্দে কাজ করে যান, কোনো কিছু পাওয়ার পরোয়া না করে। হয়তো বিশাল কোনো কোলাহলও তৈরি হয় না এসব প্রজ্ঞাবানদের কেন্দ্র করে। কিন্তু তাদের কাজ ও সাধনার ধারা প্রবহমান থাকে সমাজের গভীরে, প্রান্তিকে, সাধারণ জনতার পূর্ণকুটিরে অন্ধকার টানেলের শেষ প্রান্তে আশার একবিন্দু আরাধ্য আলোর মুক্তিতে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সেই প্রান্তিক আলোর সর্বশেষ স্টেশন আমাদের।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক

সৃজনের মাসিক পাঠচক্র ‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক

প্রেমের অধ্যায়

প্রেমের অধ্যায়

রমজানের গল্প নিয়ে শিশুদের জন্য বই লিখলেন মারিয়া জামান

রমজানের গল্প নিয়ে শিশুদের জন্য বই লিখলেন মারিয়া জামান

অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী, স্মরণানুষ্ঠান ও স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী, স্মরণানুষ্ঠান ও স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

আরও পড়ুন

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

কবিতা ও গানে নজরুলের মৃত্যুচেতনা

গল্প ডেজা ভ্যু

ডেজা ভ্যু

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০ ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার

ফিরে আসা

ফিরে আসা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম