Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

বুকার ২০২৬ দীর্ঘ তালিকা

Icon

মেজবাহ উদ্দিন

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বুকার ২০২৬ দীর্ঘ তালিকা

এ বছর যে ১৩টি উপন্যাস এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, সেগুলোকে বিচারকমণ্ডলীর প্রধান মেরি বিয়ার্ড এক বাক্যে ব্যাখ্যা করেছেন ‘ডাইনামাইট’ বলে। এগুলো শুধু সাধারণ গল্প নয়, বরং এক একটি আত্মিক বিস্ফোরণ-যা পাঠকের চিন্তার জগৎকে আলোড়িত করতে, মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তে নিয়ে যেতে এবং মানুষকে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করে।

চলতি বছরের এ দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছেন এলিজাবেথ স্ট্রাউট, ডগলাস স্টুয়ার্ট, মার্লন জেমস এবং রেবেকা পেরি-র মতো খ্যাতিমান সব কথাসাহিত্যিক। এ ১৩টি বইয়ের ভৌগোলিক ও মানসিক ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। মেক্সিকো সিটির কোলাহলপূর্ণ হাসপাতাল থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ডের প্রত্যন্ত দ্বীপের নির্জনতা; জুরিখের করুণ অ্যাসিস্তদে সুসাইড ক্লিনিক থেকে ১৯৮০-এর দশকের জ্যামাইকার উত্তপ্ত রাজপথ; কিংবা ধ্বংসোত্তর কেন্টের প্রান্তর থেকে মার্কিন নির্বাচনের প্রাক্কালে ম্যাসাচুসেটসের উপকূলীয় বিষাদ-সবই উঠে এসেছে এ উপন্যাসগুলোতে।

এবারের বুকার পুরস্কারের জন্য জমা পড়েছিল ১৬৩টি গ্রন্থ। সেখান থেকে বিচারকমণ্ডলীর পাঁচজন সদস্য পরমমমতায় এবং কঠোর বিচার-বিবেচনায় বেছে নিয়েছেন এ চূড়ান্ত ১৩টি উপন্যাস-যাকে বলা হচ্ছে ‘বুকার ডজন’। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর এ তালিকাটি আরও ছেঁটে সংক্ষিপ্ত করা হবে এবং আগামী ৯ নভেম্বর বিজয়ী নাম ঘোষিত হবে।

বিচারকমণ্ডলীর প্রধান, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও লেখক মেরি বিয়ার্ড এ নির্বাচন প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বেশ রসিকতার সঙ্গেই বলেন, ‘যখনই ৩০টির মতো নতুন ঝকঝকে বইয়ের বাক্স আমার দরজায় এসে পৌঁছাত, আমি কিছুটা চমকে উঠতাম। কিন্তু সেই ক্লান্তিকে ছাপিয়ে যে জিনিসটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে, তা হলো পঠনের সেই চোখ খুলে দেওয়া আনন্দ। সহবিচারকদের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আমি কথাসাহিত্যের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে নতুন করে উপলব্ধি করেছি।’

মেরি বিয়ার্ডের মতে, ভালো সাহিত্য কখনো মানুষকে আরামদায়ক তোষামোদ করে না। তিনি বলেছেন, ‘বই কেবল আমাদের প্রতিচ্ছবি দেখানোর আয়না নয়। সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তা আমাদের শেখায় কীভাবে অন্য একজনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জগৎকে দেখতে হয়, কীভাবে নিজের সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতা ভুলে অন্যের বেদনাকোণে আলো ফেলতে হয়। আমাদের নির্বাচিত বইগুলো কোনোভাবেই ‘কোজি’ বা আরামদায়ক নয়; এগুলো জীবনকে দেখার চশমাটাই বদলে দেয়।’

সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ছয়জন লেখক প্রত্যেকেই পাবেন ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড এবং তাদের বইয়ের বিশেষ বাঁধাই করা সংস্করণ। আর যিনি চূড়ান্ত বিজয়ী হবেন, তার হাতে উঠবে ট্রফি এবং ৫০ হাজার পাউন্ডের অর্থ পুরস্কার।

এ ১৩টি উপন্যাসের পাতায় পাতায় লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা রূপ :

১. নিঃসঙ্গতার আঁধার ও এলিজাবেথ স্ট্রাউট : পূর্বে বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া এলিজাবেথ স্ট্রাউট এবার এসেছেন দ্য থিংস উই নেভার সে (The Things We Never Say) নিয়ে। ম্যাসাচুসেটসের এক উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষকের গল্প এটি, যিনি অতিমারি-পরবর্তী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিষাদ এবং ২০২৪ সালের আসন্ন মার্কিন নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। মানুষের ভেতরের না বলা কথাগুলো কীভাবে পাহাড় প্রমাণ ভার হয়ে দাঁড়ায়, স্ট্রাউট তা পরম সূক্ষ্মতায় এঁকেছেন।

২. বিশ্বাসের টানাপোড়েনে ডগলাস স্টুয়ার্ট : পূর্বে Shuggie Bain উপন্যাসের জন্য বুকার বিজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্ট এবার ফিরেছেন জন অব জন (John of John) নিয়ে। স্কটল্যান্ডের এক দুর্গম ও নির্জন দ্বীপে বেড়ে ওঠা এক তরুণ সমকামীর গল্প এটি, যে তার কঠোর ধর্মীয় গোঁড়া পরিবারের কাছে ফিরে আসে। নিজের পরিচয়, ভালোবাসা আর পারিবারিক ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে যে নির্মম দ্বন্দ্ব, তা এতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

৩. ইতিহাস ও সহিংসতার গল্পে মার্লন জেমস : অন্যতম সাবেক বুকার বিজয়ী মার্লন জেমসের ৬০০ পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাস দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারার্স (The Disappearers) এবারের দীর্ঘ তালিকার সবচেয়ে বড় বই। জ্যামাইকার কিংসটনে ১৯৮০-এর দশকে একটি নাটক মহড়াকালে একদল সহিংস উগ্রপন্থির আক্রমণের শিকার হওয়া আটজন সমকামী পুরুষের বেঁচে থাকার আকুতি ও সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে এতে।

৪. ক্ষুদ্রতম ক্যানভাসে ম্যাকেনা গুডম্যান : জেমসের দীর্ঘ উপন্যাসের ঠিক বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে মাত্র ১৪০ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ততম উপন্যাস হেলেন অব নাওহোয়ার (Helen of Nowhere)। ম্যাকেনা গুডম্যানের এ লেখাটিতে দেখা যায় এক কলঙ্কিত অধ্যাপককে, যিনি গ্রামের শান্ত-স্নিগ্ধ বাড়ি ঘুরে দেখতে গিয়ে তার পূর্বতন মালিকের অজানা ও রহস্যময় জীবনের মুখোমুখি হন।

৫. অতীতের খোঁজে রেবেকা পেরি : কয়েকদিন আগেই ওয়াটারস্টোনস ডেবিউ ফিকশন প্রাইজ জেতা রেবেকা পেরির মে উই ফিড দ্য কিং (May We Feed the King) উপন্যাসটি একজন ঐতিহাসিক ভবনের কিউরেটরকে নিয়ে, যিনি এক প্রায় বিস্মৃত মধ্যযুগীয় রাজার জীবনের গোপন রহস্য উন্মোচনে ব্রতী হন।

৬. স্মৃতির ভাঙাগড়া ও কেনান ওরহান : প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করেছেন কেনান ওরহান। তার দ্য রেনোভেশন (The Renovation) উপন্যাসে ইতালির পটভূমিতে দেখা যায় এক মনোবিদকে, যিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বাবার সেবা করছেন; কিন্তু বাড়ির সংস্কার কাজ শুরু হতেই তাদের জীবন কীভাবে ওলটপালট হয়ে যায়, তার এক করুণ ও আবেগঘন চিত্র এটি।

৭. অপরাধ অনুশোচনায় জামেল হোয়াইট : মাত্র ২৮ বছর বয়সে এবারের দীর্ঘ তালিকার সর্বকনিষ্ঠ লেখক জামেল হোয়াইট। তার অভিষেক উপন্যাস অল দেম ডগস (All Them Dogs) পশ্চিম ডাবলিনের এক যুবকের গল্প বলে, যে গ্যাং ফাইটে একজনকে খুন করে পাঁচ বছর ফেরারি থাকার পর নিজের জন্মস্থানে ফিরে আসে। অনুশোচনা ও তাড়া করে ফেরা অতীতের এক তীব্র দলিল এটি।

৮. জীবনের সায়াহ্নে এম জন হ্যারিসন : ৮১ বছর বয়সে এবারের দীর্ঘ তালিকার প্রবীণতম লেখক এম জন হ্যারিসন এনেছেন দ্য অ্যান্ড অব এভরিথিং (The End of Everything)। কেন্ট উপকূলের এক ধসে পড়া, বিপর্যয়-পরবর্তী শহরের পটভূমিতে লেখা এ উপন্যাসটি জীবনের নশ্বরতা ও মানবসভ্যতার করুণ পরিণতি তুলে ধরে।

৯. জীবনের শেষ স্টেশনে এমা ক্লাইন : সেপ্টেম্বরে প্রকাশিতব্য এমা ক্লাইনের সুইটজি (Switzy) এক ধনী ও সফল মানুষের গল্প, যিনি সুইজারল্যান্ডের একটি অ্যাসিস্টেড সুসাইড বা স্বেচ্ছামৃত্যু ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি আর বেঁচে থাকার অর্থ নিয়ে এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সফর।

১০. বন্ধুত্বের আলোয় ক্লোই অরিজিস : মেক্সিকো সিটির এক হাসপাতালের একঘেয়ে পরিবেশে দুটি অপরিচিত মানুষের হঠাৎ সাক্ষাৎ কীভাবে তাদের জীবন বদলে দেওয়া বন্ধুত্বে রূপ নেয়, তা নিয়ে লেখা ক্লোই অরিজিসের উপন্যাস দ্য শ্যাডো অব দ্য অবজেক্ট (The Shadow of The Object)।

১১. সম্পর্কের জটিলতায় গোয়েনডোলিন রাইলি : গোয়েনডোলিন রাইলির দ্য পাম হাউস (The Palm House) লন্ডনের এক ফ্রিল্যান্সার ও একজন জ্যেষ্ঠ পত্রিকা সম্পাদকের বহু বছরের জটিল বন্ধুত্বের গল্প।

১২. অদ্ভুত এক পরীক্ষার মুখোমুখি লুক কেনার্ড : লুক কেনার্ডের ব্ল্যাক ব্যাগ (Black Bag) উপন্যাসটি অদ্ভুত ও চমকপ্রদ। এক বেকার অভিনেতা অর্থের বিনিময়ে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার অংশ হিসাবে নিজেকে একটি বড় চামড়ার ব্যাগে বন্দি করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় লেকচার হলের পেছনে চুপচাপ বসে থাকে। মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও আধুনিক জীবনের বিদঘুটে বাস্তবতার এক অনন্য প্রতীক এ গল্প।

১৩. মিসৌরি উইলিয়ামস : মিসৌরি উইলিয়ামসের দ্য ভিভিসেকটরস (The Vivisectors) আমাদের নিয়ে যায় এক ক্ষয়িষ্ণু বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরে, যা বুনো উদ্ভিদের দখলে চলে গেছে-সেখানে এক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর আত্মসন্ধানের গল্প বুনেছেন লেখক। সাহিত্যের সৌন্দর্য এখানেই-তা আমাদের এক জীবন থেকে অন্য জীবনে হেঁটে আসার অনুমতি দেয়। বুকার ২০২৬-এর এ দীর্ঘ তালিকাটি যেন মানব অভিজ্ঞতার এক বিশাল মহাসমুদ্র। এখানে যেমন আছে প্রবীণ লেখকের প্রজ্ঞা, তেমনি আছে নবীন লেখকের কাঁচা ও সতেজ আবেগ। এ ১৩টি ‘ডাইনামাইট’ উপন্যাস শুধু ২০২৬ সালের সেরা লেখার প্রতিনিধিত্ব করছে না, বরং এগুলো প্রমাণ করে, পৃথিবী যতই যান্ত্রিক হয়ে উঠুক না কেন, মানুষের গল্প শোনার এবং অনুভূতির গভীরে ডুব দেওয়ার ব্যাকুলতা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। আগামী সেপ্টেম্বরে এ তালিকা যখন আরও ছোট হয়ে আসবে, তখন হয়তো অনেকের প্রিয় বই বাদ পড়বে, কিন্তু কথাসাহিত্যের এ উদ্ভাসিত আলো পাঠকের হৃদয়ে জ্বলতেই থাকবে।

সূত্র : বিবিসি অনলাইন

ভাবানুবাদ : মেজবাহ উদ্দিন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .