জ্ঞানের নিজস্ব আনন্দ অনুসন্ধিৎসা এবং বৌদ্ধিক কৌতূহলের চর্চা কম: মজিদ মাহমুদ
ফরিদুল ইসলাম নির্জন
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মজিদ মাহমুদের জন্ম : ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়ই তিনি সক্রিয়। করেছেন সাংবাদিকতাও। লেখাপড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আশির দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসাবে মজিদ মাহমুদ বাংলা কবিতায় নিজস্ব স্বর, ভাষা ও নন্দনচেতনার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মাহফুজামঙ্গল, গোষ্ঠের দিকে, বল উপাখ্যান, আপেল কাহিনী, ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম, সিংহ ও গর্দভের কবিতা এবং গ্রামকুট। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তার গবেষণাকর্ম বিশেষভাবে সমাদৃত। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮০-এর অধিক। সাহিত্যের নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন
বাংলাদেশের পাঠকের বই-মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের আগ্রহ দিনদিন কমেই যাচ্ছে। এর কারণ কী হতে পারে? এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায়-ই কী?
: প্রথমেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, আগে মানুষ কেন বই পড়ত এবং ‘বই’ বলতে তখন আমরা কী ধরনের জ্ঞান, তথ্য বা সাহিত্যিক উপাদান বুঝতাম। ধরা যাক, গত শতাব্দীর আশির দশকের আগে লিখিত মাধ্যম ছাড়া জ্ঞানার্জনের সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। অথচ সে সময় দেশে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের হার ছিল ৩০ শতাংশেরও কম। ফলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার সুযোগ সীমিত ছিল। তারা অনেকেই প্রবীণদের মুখে গল্প শুনে কিংবা সমবেত পুঁথিপাঠের মাধ্যমে সমাজের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার অংশীদার হতো। অন্যদিকে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও, যাত্রাপালা, গ্রামীণ খেলাধুলা ইত্যাদি।
আশির দশকে বইয়ের বাইরে বিনোদন ও তথ্যের প্রধান উৎস ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন। নগর জীবনের বিকাশ, আধুনিক মানুষের একাকিত্ব এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা বইকে মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগীতে পরিণত করেছিল। পাঠ্যবইয়ের বাইরে ছাত্রছাত্রী, কিশোর-কিশোরী এবং শিক্ষিত গৃহবধূরা উপন্যাস ও গল্প পড়ে বিনোদন লাভ করতেন; পাশাপাশি নিজেদের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতাকে গল্পের চরিত্রগুলোর জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।
কিন্তু গত তিন দশকে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। বইয়ের মাধ্যমে যে বিনোদন, তথ্য ও জ্ঞান আগে অর্জন করা হতো, তার বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল মাধ্যমের দখলে। ফলে এ মাধ্যমকেও জ্ঞানার্জনের বিকল্প উৎস হিসাবে বিবেচনা করতে হয়। ই-বুক ও ডিজিটাল সংস্করণের কারণে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আগের চেয়ে বেশি সহজলভ্য হয়েছে। ফলে গভীর জ্ঞানান্বেষী পাঠক একদিকে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে ছাপা বইয়ের প্রতিও আগ্রহী থাকছেন। মানুষ বই কম পড়ছে-এ কথা সরলভাবে বলা যায় না; বরং মনোযোগের জন্য বইকে এখন অসংখ্য মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
গল্প-উপন্যাসের পাঠকের তুলনায় কবিতার পাঠক কম হওয়ার কারণ কবিতার দুর্বোধ্যতা, না পাঠকের প্রস্তুতির ঘাটতি?
: আধুনিক কবিতার পাঠক মূলত নিজের মনোজগতের ভেতর দিয়ে কবিতাকে উপলব্ধি করেন; তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষাপটের আলোকে তাকে পাঠ করেন। এ কারণেই আধুনিক কবিরা প্রায়ই বলে থাকেন যে কবিতা পাঠের জন্য পাঠককে প্রস্তুত হতে হয়। এ দাবির সঙ্গে পুরোপুরি দ্বিমত করার সুযোগ কম। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে পাঠকের প্রস্তুতির বিষয়টিকে অনেক সময় অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। আদর্শ অবস্থায় কবিতার মধ্যেই এমন আকর্ষণ থাকা উচিত, যা পাঠককে তার দিকে টেনে নেবে এবং ধীরে ধীরে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
পাঠক কখন কবিতা বেশি পড়ে? কখন কথাসাহিত্য বেশি পড়ে? দেশ এবং সমাজের পরিস্থিতি এতে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে?
: যে সমাজ আন্দোলন, সংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় জাগরণ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের মতো সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করে, সেখানে সাধারণত কবিতার পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, সমাজ যখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও শান্ত থাকে, তখন মানুষ ব্যক্তি-জীবন, সম্পর্ক, সমাজ ও মনস্তত্ত্বের জটিল বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বোঝার প্রতি আগ্রহী হয়। সে সময় গল্প-উপন্যাস বা কথাসাহিত্যের পাঠ বৃদ্ধি পায়। কথাসাহিত্য চরিত্র, ঘটনা ও অভিজ্ঞতার বিস্তৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে বহুমাত্রিকভাবে অন্বেষণ করে এবং পাঠককে দীর্ঘসময় ধরে ভাবনার ভেতর রাখে।
কবিতা আপনার কাছে কেমন? কবিতা একজন প্রকৃত বা উৎকৃষ্ট পাঠকের কী কাজে আসে?
: কবিতা আমার কাছে যাপনের অংশ। কবিতা পাঠকমাত্রেরই কাজে আসে। কেউ কবিতা পড়লে তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা বেদনা, আনন্দ বা অনুভূতি জাগ্রত হয়। কবিতা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মতো-একটি ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে যেমন বিশাল মহাবিশ্বের আভাস পাওয়া যায়, তেমনি কয়েকটি পঙ্ক্তি বা অল্প কিছু শব্দ মানুষের জীবনের বহু গল্প ও অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
প্রিয় কবি এবং কবিতার বই সম্পর্কে বলুন
: বাংলা ভাষায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশসহ অসংখ্য কবি আমার জন্য কবিতার বহুমুখী দুয়ার উন্মোচন করেছেন। আল মাহমুদ বাংলা ভাষার ভূগোল, লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে নতুন ব্যঞ্জনায় আবিষ্কার করেছেন। পাশাপাশি শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিনয় মজুমদারসহ আরও বহু কবির কবিতা আমাকে বারবার টেনেছে এবং নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
বিশ্বসাহিত্যে হোমার, রুমি, হাফিজ, দান্তে, গ্যেটে, টি. এস. এলিয়ট, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, পাবলো নেরুদা, রবার্ট ফ্রস্ট, নাজিম হিকমত, খলিল জিবরান ও মাহমুদ দারবিশের কাছে আমি বারবার ফিরে গেছি। তারা শুধু কবি নন, একেকজন সভ্যতার ভাষ্যকার। একটি মাত্র কবিতার বইয়ের নাম বলা কঠিন।
পাঠক কমা-বাড়া কতটা পাঠকের ওপরে নির্ভর করে, কতটা লেখকের ওপর আর কতটা রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির কাঠামোর নির্ভর করে?
: পাঠক কখনো একা তৈরি হয় না; লেখক, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র-সবাই মিলে একটি পাঠকসমাজ গড়ে তোলে। লেখকের কাজ এমন সাহিত্য সৃষ্টি করা, যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে, তার কৌতূহল জাগাবে এবং চিন্তার পরিসর প্রসারিত করবে। পাঠকের কাজ নিজেকে প্রস্তুত করা, নতুন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রতি উন্মুক্ত থাকা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো।
দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে এদেশের মানুষের জ্ঞানার্জনের ধরনটা সম্পর্কে বলুন
: আমাদের জ্ঞানচর্চার একটি ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জ্ঞানার্জন পবিত্র মনে করলেও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা অধিকাংশ সময় জ্ঞানকে তার উপযোগিতার দৃষ্টিতে বিচার করি। জ্ঞানের নিজস্ব আনন্দ, অনুসন্ধিৎসা এবং বৌদ্ধিক কৌতূহলের চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আমরা অনেক সময় তথ্য সংগ্রহ করি, কিন্তু সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ ও আত্মস্থ করে জ্ঞানে রূপান্তরিত করতে পারি না।
দীর্ঘ সময় লেখালেখির সঙ্গে আছেন। এই জার্নিতে নিজেকে কী দিতে পেরেছেন? কী দিতে পারেননি?
: লেখালেখি আমাকে কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি; বরং আরও জটিল ও গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু সম্ভবত এটাই সাহিত্যচর্চার কাছে আমার বড় প্রাপ্তি। সাহিত্য মানুষের জিজ্ঞাসাকে শেষ করে না, বরং তাকে আরও বিস্তৃত করে। এ দীর্ঘ যাত্রায় আমি পৃথিবীকে পড়ার একটি পদ্ধতি অর্জন করেছি। একইসঙ্গে লেখালেখি আমাকে আমার সীমাবদ্ধতার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
