Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্যভুবন

Icon

আরণ্যক শামছ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্যভুবন

বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাদের পরিচয় একটি মাত্র বিশেষণে বাঁধা যায় না। সিকান্দার আবু জাফর তেমনই একজন। কবি, গীতিকার, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক-এ সাতটি পরিচয় একই মানুষের মধ্যে সহাবস্থান করেছিল অস্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে। কিন্তু এ বহুমুখিতার আড়ালে যে সত্যটি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, তা হলো তার ভেতরে একটি মাত্র সুর অবিচ্ছিন্নভাবে বেজে গেছে আজীবন-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর সুর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাষী প্রতিবাদের সুর। কবিতা লিখতে গিয়েও তিনি এ সুর থেকে সরেননি, সম্পাদনা করতে গিয়েও না, নাটক রচনা করতে গিয়েও না। ফলে তাকে বোঝার চেষ্টা মানে আসলে পূর্ব বাংলার এক আলোড়িত সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা-দেশভাগ-উত্তর অনিশ্চয়তা, পাকিস্তান আমলের স্বৈরাচার, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণ এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা-এ সমগ্র পরিক্রমার এক জীবন্ত সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী হিসাবে তাকে চেনা।

সিকান্দার আবু জাফর ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত কলকাতার দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকায় যোগ দেন। এ সান্নিধ্য নিছক পেশাগত ছিল না; এটি তার কাব্যভাষা ও চিন্তাচেতনার ভিত্তি নির্মাণে প্রভাব রেখেছিল। সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার স্পষ্টভাষিতা, বলিষ্ঠ মেজাজ এবং বক্তব্যকে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করার প্রবণতা মূলত নজরুলের কাব্যাদর্শ থেকেই উৎসারিত। চল্লিশের দশকে যাদের কাব্যজীবনের সূত্রপাত, তারা নজরুলের প্রভাববলয় সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারেননি-সিকান্দার আবু জাফরও এর বাইরে ছিলেন না। তবে এ প্রভাবের মধ্যেও তিনি নিজস্ব একটি স্বর তৈরি করতে পেরেছিলেন।

পঞ্চাশের দশকে কিছুকাল রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসাবে কাজ করেন, এরপর ১৯৫৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগী সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাতের সম্পাদক নিযুক্ত হন।

সিকান্দার আবু জাফরের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে ‘সমকাল’ পত্রিকা। ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) ভাদ্র মাসে প্রকাশিত হয় এ মাসিক সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যা, আর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত-তিনি এর প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রথম সংখ্যাতেই লিখেছিলেন সেই সময়ের একঝাঁক নক্ষত্রপ্রতিম লেখক-কবিতায় শামসুর রাহমান ও আবুল হোসেন, গল্পে শওকত ওসমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ, প্রবন্ধে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, একে নাজমুল করিম, কাজী দীন মুহম্মদ, আনিসুজ্জামান, কামরুল হাসান, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীন ও কাজী মোতাহার হোসেন, আর পুস্তক সমালোচনায় আবদুল গনি হাজারী ও চাকলাদার মাহবুব আলম। প্রচ্ছদশিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, রশীদ চৌধুরী প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পী।

সামরিক শাসনামলে সমকালের দুটি সংখ্যা বাজেয়াপ্তও হয়েছিল-যা প্রমাণ করে পত্রিকাটি নিছক সাহিত্যচর্চার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা রাষ্ট্রক্ষমতার চোখেও একটি হুমকি হয়ে উঠেছিল। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাদেশিক সংস্কৃতিচর্চার ধারা গড়ে ওঠে, সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও রূপকার।

সিকান্দার আবু জাফরের কবিতাচর্চার সূত্রপাত চল্লিশের দশকে, আর তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রসন্ন প্রহর, তিমিরান্তিক, বৈরী বৃষ্টিতে, বৃশ্চিক লগ্ন এবং সবচেয়ে আলোচিত বাংলা ছাড়ো। তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য সমাজ ও সংসারের প্রত্যক্ষ সংঘাতকে আবেগময় শব্দচয়নের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করা। সমাজসচেতন ও সংগ্রামী এ কবি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজে পেয়েছেন সামাজিক সংঘাতের দুঃখ-বেদনার মধ্যেই।

‘বৈরী বৃষ্টিতে’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন-‘ধ্বংসের রাহু পেয়েছে রাজ্যতার।/বিশ্ব মানবতার-/দিক্ দিগন্তে একি ক্ষমাহীন ব্যভিচার?/স্তব্ধ কৌতূহলে-/অতীত যুগের পাতা ছিঁড়ে একে একে/ভাসাই তিক্ত বিস্মরণের জলে!’ এই পঙ্ক্তিগুলোয় লক্ষণীয় এক আত্মগত ক্ষোভ, যা নিছক মৌখিক আস্ফালন নয়-বরং কবির সমগ্র চেতনার স্পন্দিত বিক্ষোভ, যা শেষ পর্যন্ত অতীতকে বিস্মরণের জলে ভাসিয়ে দিয়ে এক ধরনের আত্মিক স্বস্তি খোঁজে। এই আত্মগত সুর ও বলিষ্ঠ বক্তব্যের সমন্বয়ই তাকে নজরুল সান্নিধ্য থেকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে উত্তীর্ণ করেছে।

প্রেমের কবিতাতেও তার স্বভাবসিদ্ধ স্পষ্টভাষিতা ও তীব্রতা লক্ষণীয়। এক জায়গায় তিনি লেখেন-‘তাকাতেই দেখি নাগালের গণ্ডিতে/ইঙ্গিত আঁকা অমৃত কুম্ভ/তুমিই প্রথমে মেলেছো আমন্ত্রণ-/মুহূর্তে তুমি প্রিয়া,/এবং তোমাকে আত্মদানের তখুনি উদ্দামতা।’ এখানেও প্রেমের কোমলতার চেয়ে এক ধরনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও তাৎক্ষণিকতাই বেশি প্রকট, যা তার সামগ্রিক কাব্যব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে যে দুটি রচনা চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে, তা হলো ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতা এবং ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ প্রকাশিত হয় ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটি, যেখানে বাংলাকে দখল করতে চাওয়া পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক গণহুঙ্কারের প্রতিধ্বনি তোলা হয়েছিল। কবিতার পঙ্ক্তিগুলো আজও গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো তীব্র-‘রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো/আজকে যখন হাতের মুঠোয়/কণ্ঠনালীর খুনপিয়াসী ছুরি,/কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে/কেউটে সাপের ঝাঁপি!/আমার হাতেই নিলাম আমার/নির্ভরতার চাবি,/তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া/তুমি বাংলা ছাড়ো।’

গানের পঙ্ক্তিগুলো আজও শুনলে গায়ে শিহরণ জাগে-‘জনতার সংগ্রাম চলবেই,/আমাদের সংগ্রাম চলবেই।/হতমানে অপমানে নয়, সুখ সম্মানে/বাঁচবার অধিকার কাড়তে/দাস্যের নির্মোক ছাড়তে/অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ/চলবেই চলবেই,/আমাদের সংগ্রাম চলবেই।’ একজন বিপ্লবকামী কবি হিসাবে সিকান্দার আবু জাফর অসংখ্য গণসংগীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতোই সংগীত রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সিকান্দার আবু জাফরের নাট্যকর্মে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’ (১৯৬৫)। নাটকটির সংলাপ ঐতিহাসিক আবহ সৃষ্টিতে যথেষ্ট সক্ষম বলে বিবেচিত হয়। ‘মহাকবি আলাওল’ (১৯৬৬) তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য জীবনীভিত্তিক নাটক, যেখানে তিনি ঐতিহাসিক নির্ভুলতার চেয়ে কল্পনার ওপর অধিক নির্ভর করেছেন। এ দুই নাটকের জন্যই তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

আজকের অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে সিকান্দার আবু জাফরকে পুনঃপাঠ করা মানে শুধু অতীতের এক কবিকে স্মরণ করা নয়-তা আসলে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার নৈতিক দায়বদ্ধতাকে নতুন করে চিনে নেওয়ারও একটি প্রয়াস।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .