Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

রুশ সাহিত্য রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নয়

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রুশ সাহিত্য রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নয়

বর্তমান রাশিয়ায় কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামের পাশে ‘বিদেশি এজেন্ট’ সেঁটে দেওয়া কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি এক নীরব নিয়ম, নির্মম এবং পরিকল্পিত সামাজিক মৃত্যুদণ্ড। পুতিন প্রশাসন এ অস্ত্রটি ব্যবহার করে তাদেরই ঘায়েল করতে, যারা বিদেশি অনুদান পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে কিংবা যাদের ওপর কথিত ‘বিদেশি প্রভাব’ রয়েছে বলে রাষ্ট্রের সন্দেহ হয়। এ তকমার ফাঁদে যারা পড়েন, তাদের ওপর নেমে আসে নজরদারি, নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক গ্লানি। সাংবাদিকতা, এবং শিল্পী-সাহিত্যিকদের কণ্ঠরোধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ এই কুৎসিত হাতিয়ারটিকে অন্ধের মতো ব্যবহার করছে।

অথচ কী গভীর মানবিক পরিহাস! এই স্বৈরশাসনের জমানায় রাষ্ট্রের দেওয়া এই ‘অপবাদ’ই আজ মুক্তচিন্তার মানুষের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মাননার স্মারক হয়ে উঠেছে। এ গৌরবের অংশীদার হয়েছে ‘দার প্রাইজ’ (Dar Prize-রুশ ভাষায় যার অর্থ ‘উপহার’)। সদ্য দ্বিতীয় বর্ষ পূর্ণ করে তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করা এই সাহিত্য পুরস্কারটি দাঁড়িয়েছে স্বাধীন চেতনার এক অটল বাতিঘর হিসাবে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট ও মানবিক-লেখকের নাগরিকত্ব, জাতীয়তা বা ভৌগোলিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, রুশ ভাষায় রচিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া। এ পুরস্কার বিজয়ী গ্রন্থগুলোকে ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে পৌঁছে দেওয়া হয় বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর দরবারে। পুরস্কারটির ঘোষণাপত্রেই বলা হয়েছে : এর লক্ষ্য এমন এক পৃথিবী গড়ে তোলা, ‘যেখানে রুশ সাহিত্য স্বৈরশাসকদের পদলেহন না করে, সমগ্র মানবতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে বিশ্বমঞ্চে তার ন্যায্য আসন গ্রহণ করবে।’

সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্ব পরিবর্তনের এমন উচ্চাভিলাষী ঘোষণায় আমি সাধারণত কিছুটা সংশয়ী থাকি। শিল্প বা ইতিহাসের পাতায় সান্ত্বনা খোঁজা আমাদের মতো আবেগপ্রবণ মানুষের এক ধরনের নিষ্পাপ দুর্বলতা বলেই মনে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক যখন আমি এ বছরের ‘দার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা এবং বিজয়ী বইগুলোর পাতা উলটেছি, তখন আমার সেই সংশয় কেটে গেছে। আমি বিস্মিত হয়ে উপলব্ধি করেছি-এ পুরস্কারের লক্ষ্য হয়তো সুদূরপ্রসারী ও দুঃসাহসিক, কিন্তু তা কোনোমতেই অসম্ভব নয়।

এ পুরস্কারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি মিখাইল শিশকিন সমকালীন রুশ ভাষার জীবন্ত মহিরুহ। নিজের নামের পাশে ‘বিদেশি এজেন্ট’ তকমা থাকা এই সাহিত্যিক রাশিয়ার তিনটি প্রধান সাহিত্য পুরস্কার-‘রাশিয়ান বুকার’, ‘ন্যাশনাল বেস্টসেলার’ এবং ‘বিগ বুক প্রাইজ’ জয়ী একমাত্র কিংবদন্তি। সমকালীন রুশ সাহিত্য নিয়ে তার মূল্যায়ন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বেদনার্ত। এক ই-মেইল বার্তায় তিনি আমাকে লিখেছেন : ‘রাশিয়ায় আজ জীবন্ত সাহিত্যকে কার্যত বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। বিগত পাঁচ বছর ধরে সেখানকার লেখকরা এমন এক ভান করে আছেন, যেন সব স্বাভাবিক, যেন কোনো যুদ্ধই কোথাও ঘটছে না!’

এই চরম অনৈতিক নীরবতা ও সম্মিলিত মিথ্যাচারকে চূর্ণ করাই দার প্রাইজের অঙ্গীকার। এ বছর বিচারকমণ্ডলী তিনজন লেখককে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। এই তিনটি অনন্য সৃষ্টির মূল সুর আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধ, মানবতা এবং তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতের গভীর মনস্তত্ত্বকে ঘিরে।

তালিকার প্রথম বইটি আলেকজান্দ্রা ক্রাশেভস্কায়ার ‘আ লালাবাই ফর মারিউপোল’ (A Lullaby for Mariupol)। এটি সম্ভবত বর্তমান যুদ্ধবাস্তবতার সবচেয়ে নির্মোহ ও প্রত্যক্ষ দলিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসনের শুরুতে ক্রাশেভস্কায়ার নিজের শহর মারিউপোলে যে তিন মাসব্যাপী নারকীয় অবরুদ্ধ দশা চলেছিল, লেখক তারই এক পরাবাস্তব আখ্যান তুলে ধরেছেন। দিনলিপির মতো অথচ সময়ের সরলরৈখিক নিয়ম না-মানা এ বইটি কোনো গৎবাঁধা উপন্যাসের কাঠামো মানে না, আবার এটিকে নিছক সাংবাদিকতাও বলা যায় না। এর ভাষা কাঁচা, রক্তাক্ত এবং এক গভীর ট্রমার আঘাতে স্তব্ধ। বইটির বড় শক্তি-এটি শুধু যুদ্ধের ধ্বংসলীলা দেখায় না, বরং সেই ধ্বংসের অতন্দ্র ‘সাক্ষী’ হয়ে থাকে।

যখন কোনো পৈশাচিক শক্তি আমাদের মানবতাকে হরণ করতে উদ্যত হয়, তখন সেই ধ্বংসলীলার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সত্যকে ধরে রাখাই মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। কিন্তু এই সাক্ষ্য দেওয়ার পেছনে এক গভীর নৈতিক সংকটও লুকিয়ে থাকে। যখন একটি রাষ্ট্র বা জাতি কোনো ঐতিহাসিক অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন সেই সমষ্টিগত অপরাধের দায় একজন ব্যক্তিমানুষ বা পরিবারের ওপর কতটা বর্তায়? আজ প্রতিটি বিবেকবান রুশ নাগরিক এ আত্মদংশনে পুড়ছেন; আর আত্মশুদ্ধির এ লড়াইটি বহু পশ্চিমাদেরও নতুন করে শুরু করা উচিত।

যৌথ অপরাধবোধ এবং ব্যক্তিগত দায়ের এ চিরন্তন দ্বন্দ্বটিই মূর্ত হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় বিজয়ী গ্রন্থ, ওলেগ রাদজিনস্কির ‘ডেইজ অব রিপেন্টেন্স’ (Days of Repentance) উপন্যাসে। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মস্কোর ‘নাইদেনভ’ পরিবার। পরিবারটি চেয়েছিল নিজের দেশের নোংরা রাজনীতি আর সমাজ থেকে দূরে সরে সম্পূর্ণ সমান্তরাল এক নির্লিপ্ত জীবন কাটাতে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হতেই তাদের সেই সুরক্ষিত দুর্গে চিড় ধরে। পরিবারের প্রধানের এক অবৈধ কন্যা-দলেতস্কায়া নামের এক খর্বাকৃতির নারী এসে উপস্থিত হয় তাদের সংসারে। এ অনাহূত নারীর ধীরে ধীরে পরিবারের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠা চমকপ্রদ রূপক। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রক্ষমতা অজান্তে সাধারণ মানুষের গৃহকোণে প্রবেশ করে নির্ভরতা তৈরি করে, পরিশেষে তাদের বাধ্য করে নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশে। ‘ইতিহাসের সমস্ত অন্যায় হয়তো একা একজন মানুষ সংশোধন করতে পারে না, কিন্তু সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নিজে কী আচরণ করবে-সেই ব্যক্তিগত পছন্দেও স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষেরই থাকে।’ এ নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ ব্যক্তিস্বার্থের কাছে আমাদের এ নৈতিক পছন্দের চরম বিসর্জন। যুদ্ধের এই ঘোর অন্ধকার কেটে একদিন হয়তো ভোর হবে, কিন্তু সেই সংঘাতপরবর্তী পৃথিবীতে আমরা নিজেদের কতটা শুদ্ধ চিত্তে দাঁড় করাতে পারব, তা নির্ভর করছে আজ আমরা কতটা আত্মদায় স্বীকার করছি তার ওপর।

তৃতীয় বিজয়ী ক্সেনিয়া বুকশার ‘লিটল প্যারাডাইস’ (Little Paradise) উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট এক কাল্পনিক যুদ্ধের সমাপ্তির পনেরো বছর পর, ‘রায়োক’ নামের এক পাহাড়ি জনপদে গড়ে উঠেছে এর পটভূমি-অর্থাৎ এক দূরবর্তী ‘যুদ্ধোত্তর কাল’। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জন্ম নেওয়া এক চৌদ্দ বছরের কিশোরের রহস্যজনক অন্তর্ধান। সেই কিশোর যেন এক মরমি সাধক বা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, যে পুরোনো সন্ত্রাসীদের পরিত্যক্ত গোপন পাহাড়ের গুহায় গেছে পরম সত্যের সন্ধানে।

বুকশার সঙ্গে আলাপে আমি বুঝতে পারি, এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক আখ্যান নয়, বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক উপন্যাস। লেখক আমাকে লিখেছিলেন, ‘একজন বিশ্বাসী হিসাবে আমি মনে করি, ভালোবাসার মূল সত্তাই হলো ঐশ্বরিক।’ তার এই কথাটি আমাকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। আমি উপলব্ধি করি, রুশ সাহিত্যের যে মহান ঐতিহ্য যুগে যুগে অন্তরাত্মার মুক্তির কথা বলেছে, সেই আধ্যাত্মিক কল্পনা আজও মরে যায়নি; বরং তা আজ সীমানার বাইরে, নির্বাসিত মুক্ত ভূখণ্ডে নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে।

বিজয়ী এ তিনটি বইয়ের পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ইলিয়া দানিশেভস্কির ভাষাগতভাবে অত্যন্ত জটিল ও তীব্র উপন্যাস ‘ড্যামোক্লিস টেকনো’ কিংবা ইগর বেলোদেদের পরাবাস্তব ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য মর্নিং ওয়াজ দ্য আই’ প্রমাণ করে যে, বিশ্বসাহিত্যের এক নতুন ও শক্তিশালী ক্যানন নিঃশব্দে রূপ নিচ্ছে।

রাশিয়ার শাসকগোষ্ঠী বরাবরই চেয়েছে তার দেশের সবচেয়ে সাহসী ও উদ্ভাবনী লেখকদের স্তব্ধ করে দিতে। ফলে মুক্তমনা লেখকদের প্রায় সবাই আজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে নির্বাসনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। একইসঙ্গে সরকার ‘রুস্কি মির’ (রুশ বিশ্ব) মতবাদের মাধ্যমে রুশ ভাষাকে নিজের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের হাতিয়ার বানাতে চাইছে। তাদের এ বিষাক্ত প্রচারণার ফলে সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলো নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে রুশ ভাষাকে বর্জন করতে শুরু করেছে। কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদ আমাদের যে মিথ্যা বিশ্বাস করাতে চায়, তা হলো-ভাষা এবং তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য নাকি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা একচ্ছত্র শাসকের সম্পত্তি! এটি এক চরম ঐতিহাসিক মিথ্যাচার। প্যারিসের কোনো অভিজাত ফরাসির যতটা অধিকার ফরাসি ভাষার ওপর রয়েছে, কঙ্গোর কিনশাসার এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীরও ঠিক ততখানি অধিকার রয়েছে। কেউ কখনো দাবি করবে না, আফ্রিকান সাহিত্যের জন্য আয়েই ক্বেই আরমাহ যেন ইংরেজি ত্যাগ করেন, কিংবা লাতিন আমেরিকার কবি আইভন কোনোয়েকার যেন স্প্যানিশ ভাষায় লেখা বন্ধ করে দেন। তবে রুশ ভাষার ক্ষেত্রে কেন সেই সংকীর্ণতা আরোপ করা হবে?

রুশ ভাষা এবং তার সমৃদ্ধ সাহিত্য কোনোভাবেই রুশ রাষ্ট্র কিংবা পুতিন রেজিমের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ‘দার প্রাইজ’ শুধু এ চিরন্তন সত্যকে প্রচারই করছে না, বরং অনুবাদের মাধ্যমে তা বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করছে। তারা এমন সব লেখকের সৃষ্টিকে কাঁটাতারের ওপারে নিয়ে যাচ্ছে, যারা রাষ্ট্রের অন্যায় ফরমানকে অকুতোভয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এ পুরস্কারে ভূষিত লেখকরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ শৈলীতে এক মহাবিপর্যয় ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করছেন। কিন্তু ধ্বংসের সেই ছাই থেকেই তারা নির্মাণ করছেন জীবনের এক নতুন অবিনাশী ইমারত। মিখাইল শিশকিনের কথাই যদি সত্য হয় যে, স্বদেশের মাটিতে আজ জীবন্ত সাহিত্যকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে, তবে এ কথাও নিশ্চিত-রুশ সাহিত্যের গৌরবময় ভবিষ্যৎ আজ রচিত হচ্ছে অন্য কোথাও, উন্মুক্ত প্রান্তরে। ‘দার প্রাইজ’ আসলে সাহিত্যের সেই চিরন্তন ও মুক্ত আত্মাকেই এক গভীর শ্রদ্ধায় অভিবাদন জানাচ্ছে।

মূল রচনা : কেটি কেইলাইদিস। ভাবানুবাদ : মেজবাহ উদ্দিন। সূত্র : লিটারারি হাব

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .