পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ৪
উদার বাতাবরণের স্নিগ্ধ ধারায়
সালেহ মাহমুদ রিয়াদ
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আনন্দের বিষয় হইল-অচিরেই যুযুধান পক্ষদ্বয় পলায়ন করিল। তাহারা একসময় বাঙলা ভাষার সহজাত শক্তি এবং বিকাশের সাবলীল গতির কাছে নতিস্বীকার করিল। বিংশ শতকের বাংলাসাহিত্য পাঠ করিলে যে-কেহ আমাদের কথার সত্যতা খুঁজিয়া পাইবেন। বিংশ শতকের সমগ্র সময় ধরিয়া আমাদের প্রবল প্রজ্ঞাময় সাহিত্যসেবিগণ তথাকথিত পরস্পর-বিরোধী সকল ভাষার শব্দ আপন করিয়া লইলেন; নিজভাষায় ধারণ করিলেন এবং বাঙলা সাহিত্যের মর্যাদা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে সম্মাননীয় করিয়া তুলিলেন। তাঁহারা দেবতার উপস্থিতি স্বীকার করিলেও নিরঙ্কুশ অধীনতা মানিলেন না, মোল্লাদের গল্প থাকিল বটে তবে তাহাদের হল্লা বড়বেশি কমিয়া গেল। জাত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র তুলিয়া কোলাহল করিবার ‘শিল্পসুখ’ আগের মত আর রহিল না। আমাদের দেওয়া সংবাদের পক্ষে অসংখ্য উদাহরণ রহিয়াছে। আমরা এই স্থলে শুধু দুইজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কবির রচনা উদ্ধৃত করিব।
মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ নামক প্রসিদ্ধ উপন্যাস একদা খুব জনপ্রিয় হয়। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর পাঠক উহা বিশেষ অনুরাগের সহিত পাঠ করিতেন। এমনকী, আমি বহু পাঠককে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রতি একপ্রকার ধর্মীয় আবেগ পর্যন্ত লক্ষ করিয়াছি। আমরা সকলেই জানি উহা নিতান্তই একটি উপন্যাস ব্যতীত অন্যকিছু নহে অথচ উহার কাহিনী বহুসংখ্যক পাঠকের হৃদয়ে রীতিমত ধর্মানুভূতির সঞ্চার করে। ইহার কাহিনী এজিদের ক্ষমতালাভ হইতে শুরু করিয়া কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের মৃত্যু এবং ইমাম হত্যার প্রতিশোধগ্রহণের মধ্য দিয়া শেষ হইয়াছে। কেহ ইহাকে খাঁটি ‘ইসলামি সাহিত্য’ বলিয়া দাগা মারিয়া দিলেও বলিবার কিছু নাই। প্রকৃতপ্রস্তাবে, ইসলামের ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া ইহা রচিত। এই নাতি-বৃহৎ উপন্যাসখানির ভাষায় তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বিস্ময়করভাবে বিপুল পরিমাণ এবং ইহার ভাষারীতি বলিতে গেলে প্রায়-সম্পূর্ণরূপে তথাকথিত ইসলাম ধর্মবিরোধী। মীর মোশাররফ আল্লাহ, রসুল, দোজখ, বেহেশত-জাতীয় কথিত ধর্মীয় পরিভাষা পর্যন্ত পরিহার করিয়া ঈশ্বর, স্বর্গ, নরক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। ইসলামের ইতিহাসের একটি করুণ ঘটনা তিনি পুরাপুরি ‘হিন্দু’ ভাষায় লিখিয়া প্রমাণ করিলেন ভাষা কোন ধর্মচেতনা বা ধর্মতন্ত্রের শৃঙ্খল পরিয়া মন্দির মসজিদে তপস্যা বা ইবাদত করে না। ভাষা দিয়া আল্লাহ বা ভগবানের নিকট প্রিয় কিংবা অপ্রিয় হওয়া যায় না। আমরা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ হইতে দুই-একটি উদাহরণ তুলিয়া ধরিব।
‘জগতে শত শত ভালবাসার জন্ম হইয়াছে, অনেকেই ভালবাসিয়াছে, তাহাদের কীর্তিকলাপ-আজ পর্যন্ত কেন, জগৎ বিলয় না হওয়া পর্যন্ত মানবহৃদয়ে সমভাবে অঙ্কিত থাকিবে।... ভালবাসার সমুদ্র যখন হৃদয়াকাশে মানসচন্দ্রের আকর্ষণে স্ফীত হইয়া উঠে, তখন আর পাত্রাপাত্র জ্ঞান থাকে না। পিতা-মাতা, সংসার-ধর্ম, এমনকী, ঈশ্বরকেও মনে থাকে কি না সন্দেহ।’
“হোসেন সকরুণ স্বরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিয়া সঙ্গিগণকে বলিতে লাগিলেন, ‘ভাই সকল! হাস্য পরিহাস দূর কর; সর্ব্বশক্তিমান জগৎ নিদান করুণাময় ঈশ্বরের নাম কর। আমরা বড় ভয়ানক স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি’।”
আশা করি, আমাদের প্রজ্ঞাশীল পাঠক/পাঠিকাবৃন্দ বুঝিতে পারিলেন যে, ফতোয়া দিয়া কিংবা বেদ-বেদান্তের টীকা-ভাষ্য নিক্ষেপ করিয়া সাহিত্যের ভাষাস্রোত বাঁধিয়া দেওয়া যায় না। মীর মোশাররফ হোসেন এইরূপ ‘কাফির’ গদ্য লিখিয়া বাঙলাসাহিত্যে স্মরণীয় হইয়া রহিলেন।
দ্বিতীয় উদাহরণটি আরও অধিক বিস্ময়কর; বলিতে গেলে প্রায় হত-বিহ্বল হইবার মত। কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোহররম’ কবিতাটি অনেকেই পড়িয়া থাকিবেন। কবিতা শুরু হইয়াছে : ‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া
আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া!’
এর পরের চরণ শুরু হইয়াছে, ‘কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী’-এইভাবে। পাঠক, আমাদের আর অধিকসংখ্যক নমুনা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না।
পাঠকের নিকট বিনত জিজ্ঞাসা : তুমি কি বাঙলাকবিতা পড়িলে? সংশয় রহিল। আহা, যদি বাঙলা হয় তো বাঙলা শব্দ কই! অথচ দেখ, একটি বিখ্যাত বাঙলাকবিতা শুরু হইয়াছে অ-বাঙলা ভাষায়। কী আশ্চর্য্য, আমরা কখনও বলি নাই, ভাবি নাই যে, ইহা বাঙলাকবিতা নহে। নজরুল কী এক বিস্ময়কর মহিমা দিয়া এইরূপ লিখিলেন! আমরা এইস্থলে একটিমাত্র নমুনা দিয়াছি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার শব্দের ঠিকানা উল্লেখ করিলাম না; তিনি আরবি ফারসি মিশাইয়া মস্তবড় জাদুর খেলা করিয়াছেন। নজরুল আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি মিলাইয়া মিশাইয়া অসংখ্য গান ও কবিতা লিখিয়াছেন। তাঁহাকেও ‘কাফির’ বলিয়া মোল্লা সম্প্রদায় মহা কোলাহল তুলিয়াছিল; মোটেও সুবিধা করিতে পারে নাই। এখন তাঁহাকে আবার বাংলাদেশের জাতীয় কবিরূপে ‘অলঙ্কৃত’ করা হইয়াছে। যতদূর সংবাদ পাইলাম, নজরুলের ‘কাফের’ উপাধি বাতিল করা হইয়াছে এবং তাঁহাকে অন্য ‘তরিকায়’ স্থাপন করিবার আয়োজন চলিতেছে।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ ও ‘মোহররম’ একই কাহিনী ঘিরিয়া রচিত। ঔপন্যাসিক এবং কবি-দুইজনই মুসলমান। কেহ কি বলিতে পারিবেন তাঁহারা ‘অ-ধর্মভাষা’ ব্যবহার করিয়া নিজেরা ধর্মচ্যুত হইয়াছেন বা বাঙলাভাষার জাত মারিয়া দিয়াছেন? তাঁহাদের জাত মারিবার জন্য সেইকালে একদল মোল্লা প্রবলবেগে কোলাহল তোলে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নাই। মোল্লা পলায়ন করিয়াছে, বাঙলাভাষা মোল্লাকে পরিত্যাগ করিয়াছে।
এইরূপ দৃষ্টান্তের অভাব নাই। আমরা নিবন্ধের কলেবরের কথা ভাবিয়া বহুপ্রকার উদাহরণ দেওয়ার বাসনা হইতে সরিয়া গেলাম।
