Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

মননের উত্তরাধিকার চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ

Icon

মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

মননশীলতা একটি জাতির গভীর প্রাণশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরিচায়ক। কোনো বিষয়কে শুধু জানা বা তথ্য হিসাবে গ্রহণ করাই মননশীলতা নয়; বরং তার কারণ, তাৎপর্য, ভালো-মন্দ, অন্তর্নিহিত সত্য এবং সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির মাধ্যমে একটি সুসংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই মননশীলতার মূল কথা।

মননের উত্তরাধিকার বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা জাতির মেধা, চিন্তাধারা, সাংস্কৃতিক চেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার। মননের উত্তরাধিকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো যুক্তিবাদ ও প্রজ্ঞার চর্চা। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার যে ধারা সমাজ সংস্কারক ও মনীষীরা যুগে যুগে প্রতিষ্ঠা করেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই চিন্তাধারাকে ধারণ, অনুশীলন ও বিকশিত করা। এভাবেই একটি সমাজ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা উত্তরাধিকার হিসাবে পৌঁছে দেয়। এ অর্থে, মননের উত্তরাধিকার শুধু অতীতের চিন্তার সংরক্ষণ নয়; বরং সেই চিন্তার সৃজনশীল অনুশীলন ও যুক্তিনির্ভর প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও একটি প্রক্রিয়া।

এ প্রেক্ষাপটে রাজীব সরকারের ‘মননের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধগ্রন্থ একটি চমৎকার সংকলন। গ্রন্থে মোট বারোটি প্রবন্ধ। এসব প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন অসামান্য মননশীল প্রতিভা ও তাদের উত্তরাধিকারদের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ‘রবীন্দ্রনাথের মাইকেল বিবেচনা’ প্রবন্ধে রাজীব সরকার বলেছেন, ‘বাংলা কবিতায় আধুনিকতার প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের উত্তরাধিকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মাইকেলের কাব্যের ভাঙন রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল। মাইকেলের ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’, ‘বীরাঙ্গনা’, তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যের প্রতি অনুরাগ দেখিছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ এ মাইকেলপ্রীতির পরিচয় দিয়েছেন।’ এ ছাড়া ১৯৩৫ সালে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাইকেল সম্পর্কে বলেছিলেন-‘মাইকেল সাহিত্যে যে যুগান্তর আনলেন তার অনতিকাল পরই আমার জন্ম। আমার বয়স যখন অল্প তখন দেখেছি, কত যুবক ইংরাজি সাহিত্যের সৌন্দর্যে ভাববিহ্বল।...অথচ তাদের সমকালেই বাংলা সাহিত্যে যে নতুন প্রাণের উদ্যম সদ্য জেগে উঠেছে সে তারা লক্ষ্যই করেননি। তা যে অবধানের যোগ্য তাও তারা মনে করতেন না। সাহিত্যে তখন যেন ভোরের বেলা-কারো ঘুম ভেঙেছে, অনেকেরই ঘুম ভাঙ্গেনি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মননের যোগ্য উত্তরসূরি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টি পরিষ্কার করের রাজীব সরকার বলেন, ‘-আধুনিক বাংলা কবিতার যে জয়রথের সূচনা ঘটিয়েছিলেন মাইকেল, সেই জয়রথকে আরও বিপুল বেগে ছুটিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একজন ছিলেন বাংলার রেনেসাঁসের প্রথম কবি, অন্যজন ছিলেন বাংলার ব্রনেসাঁসের শেষ কবি ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। মাইকেলের সবচেয়ে যোগ্য উত্তরসাধক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।’

দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘বুদ্ধদেব বসুর রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী বুদ্ধদেব বসু ‘রবীন্দ্রবিরোধী’ অভিধায় অভিহিত হলেও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সম্ভার সম্পর্কে বস্তনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা গল্প, উপন্যাস, নাটকের অনুরাগী পাঠক এবং নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচক বুদ্ধদেব বসু তার ‘সব পেয়েছির দেশে’ গ্রন্থে বলেছেন ‘কবি বলে তাকে ভালোবেসেছি চিরকাল, গুরু বলে তাকে মেনেছি, তার মধ্যে পেয়েছি জীবনের ভিত্তি; কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তার যে-স্নেহস্পর্শ এবার পেলাম তার স্মৃতি মন থেকে মিলোবে না যতদিন বেঁচে আছি।’

এ আলোচনা ছিল লেখকের প্রতি লেখকের উত্তরাধিকারের দায়। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘রাশিয়ার চিঠি’ নামক পত্রগ্রন্থে যে মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে শুধু কবি সাহিত্যিক নয় সাধারণ মানুষের জীবন দর্শনের জন্যও অনুসরণ জরুরি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র। ধর্ম হলো আগুন আর ধর্মতন্ত্র ছাই। ধর্মতন্ত্র আঁকড়ে ধরে জীর্ণ আচারকে, কুসংস্কারকে। নতুন রাশিয়া যে ধর্মের নামে তৈরি হওয়া সাম্প্র্রদায়িকতা ও সংঘাত সৃষ্টিকারী ধর্মতন্ত্রকে উচ্ছেদ করেছে তা দেখে রবীন্দ্রনাথ আনন্দিত হয়েছেন। একটি বিজ্ঞান মনস্ক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের।

এ ছাড়া ‘উগ্র জাতীয়তা, ফ্যাসিবাদ ও রবীন্দ্রনাথ’ ও ‘বুদ্ধদেব বসুর ফ্যাসিবাদ ভাবনা’ প্রবন্ধ দুটিতে উদ্ধৃতি সহকারে পূর্ববর্তী মনীষীদের ভাবনাকে একত্রিত করে পাঠক সমীপে উপন্থাপন করেছেন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে লেখকের অভিমত ‘দেশে-বিদেশে ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উন্নয়নের বয়ান তৈরি করা। নানা ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মোড়কে তারা ফ্যাসিবাদের ভয়ংকর রূপটি আড়াল করতে চান। ফলে যারা ফ্যাসিবাদের বিরোধী, তাদের উন্নয়নবিরোধী হিসাবে চিত্রিত করা হয়। এ বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। কোনটি উন্নতি আর কোনটি অবনতি তা তিনি খুব ভালো করে জানতেন। ‘সভ্যতা ও ফ্যাসিজম’ প্রবন্ধের উপসংহারে বুদ্ধদেব বসুর ফ্যাসিবাদবিরোধী ভাবনার অসামান্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে-ফ্যাসিবাদে তথাকথিত উন্নয়ন ব্যতিত শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির কোনো স্থান নেই। এরা হিটলারের মতো একনায়ককে পছন্দ করলেও আইনস্টাইনের মতো জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিককে দেশ ছাড়া করতে পারে।

এ ছাড়া যতীন সরকার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কর্ম ও কীর্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরা সবাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় পাথেয় রেখে গেছেন। এ ছাড়া ‘শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা’ ও ‘প্রাথমিক শিক্ষা : চাই আনন্দময় পাঠ’ দুটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছেন যা এ প্রবন্ধ গ্রন্থটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। প্রাবন্ধিক রাজীব সরকারের লেখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তিনি প্রবন্ধের মধ্যে এমনভাবে রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র উল্লেখ করেন যাতে পাঠকের উদ্ধৃত বইটি পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। লেখক হিসাবে এটি তার বিরল প্রতিভা।

মননের উত্তরাধিকার : রাজীব সরকার। প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মূল্য : ৩০০ টাকা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যে মানবিকতা

শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যে মানবিকতা

গল্প অনুভূতি মৃত্যু

অনুভূতি মৃত্যু

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ৯ চলিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

চলিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

মননের উত্তরাধিকার চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ

মননের উত্তরাধিকার চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম