Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ৯

চলিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

Icon

সালেহ মাহমুদ রিয়াদ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে এইখানে আলাদা করিয়া আলোচনা করিবার দরকার নাই। বাঙলা সাহিত্যে তাহার অবদান চির অমর হইয়াছে; চির অমর হইয়া থাকিবে। বাঙালিজীবনের, বলিতে গেলে এমন কোনো স্থান নাই, যেখানে তিনি নিজের অত্যন্ত সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করেন নাই। তাঁহার চিন্তা, কর্ম ও অবদানের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার শেষ নাই, কোনোকালে শেষ হইবেও না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষারীতি কী হইবে, কী হইলে তাহা উত্তম হয়, কী রীতি গ্রহণ করিলে সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে-এইসব বিষয় নিয়া তাহার ভাবনা ব্যক্ত করিয়াছেন। এখানে না বলিলেও চলে যে, রবীন্দ্রনাথের যে-কোনো অভিমতের একটি ভিন্নতর গুরুত্ব আমরা সবসময় মানিয়া চলি।

বাঙলা সাহিত্যের ভাষারীতি নিয়া আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনার একপর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি নিয়া একটি অস্বস্তিকর দোলাচলে পড়িয়া যান। ঠিক কোন পথ বা পদ্ধতি মানিয়া নিলে ভাষার পথ সুগম হয়, লোকের পক্ষে সাহিত্য রচনা, পাঠ ও উপলব্ধি স্বচ্ছ ও সহজ হয় ইত্যাদি বিবেচনা করিতে গিয়া তিনি বেশ ‘বেকায়দায়’ পড়েন; কেননা, তিনি হুট করিয়া কথা একটা কিছু বলিয়া দিতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ সম্যক অবগত ও সচেতন ছিলেন যে, তাহার যে-কোনো ধারণা বাঙালির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শেষ পর্যন্ত তিনি অবশ্য প্রমথ চৌধুরীর নিকট ‘পরাভূত’ হন। রবীন্দ্রনাথ নিজ অভিমত নিয়া ‘বিজয়লাভ’ করিলে কী হইত-তাহা অন্য আলোচনার বিষয় তবে রবীন্দ্রনাথ যে প্রমথ চৌধুরীর ভাষারীতি-যুক্তি মানিয়া নিলেন-ইহা একটি বিস্ময়কর ঘটনা। তিনি চৌধুরীর ভাবনাকে প্রায়-নির্বিচারে, প্রায়-বিনাতর্কে গ্রহণ করিলেন। রবীন্দ্রনাথ চলিতভাষাকে সরাসরি ঠিক কলিকাতার তথাকথিত ভদ্রলোকদের ঘরের ভাষা বলিলেন না বটেন; তবে এ বিষয়ে এমন একটি প্রস্তাব করিলেন, যাহা চৌধুরীর মতো সোজা হইল না; কিছুটা বাঁকা পথে গা বাঁচাইবার মতো হইল। রবীন্দ্রনাথ তাহার সুবিখ্যাত ‘ভাষার কথা’ প্রবন্ধে ভাষারীতি সম্বন্ধে বলিলেন, ‘স্বাভাবিক কারণেই কলিকাতা অঞ্চলে একটা ভাষা জমিয়া উঠিয়াছে তাহা বাংলার সকল দেশের ভাষা।’

আমরা তাহার এইরূপ সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে পারিলাম না। সকল দেশের (এখানে ‘দেশ’ বলিতে তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল বুঝাইয়াছেন) ভাষা কলিকাতায় কীভাবে জমিয়া উঠিল- তাহা বুঝিতে পারা সহজ নহে। তাহার এই অভিমতও নূতন নহে। তিনি যেন পূর্বসূরি বিবেকানন্দেরই কথার প্রতিধ্বনি করিলেন মাত্র। কলিকাতা কি তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষা ‘সৃষ্টি’ করিল, নাকি কলিকাতার কতিপয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান তাহাদের নিজেদের মুখের কথাকে কলিকাতায় ছড়াইয়া দিলেন! অতঃপর রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট দ্বিধাপূর্ণ মনোভাব লইয়া একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করিলেন। পাঠক, আমরা তাহার নিজের কথা তুলিয়া দিলাম ‘ভাষার কথা’ হইতে।

‘আমাদের পাকযন্ত্রে নানা খাদ্য আসিয়া রক্ত তৈরি হয়, তাহাকে বিশেষ করিয়া পাকযন্ত্রের রক্ত বলিয়া নিন্দা করা চলে না, তাহা সমস্ত দেহের রক্ত। রাজধানী জিনিসটা স্বভাবতই দেশের পাকযন্ত্র। এইখানে নানা ভাব, নানা বাণী ও নানা শক্তির পরিপাক ঘটিতে থাকে এবং এই উপায়ে সমস্ত দেশ প্রাণ পায় ও ঐক্য পায়। রাগ এবং ঈর্ষা করিয়া যদি বলি প্রত্যেক প্রদেশ আপন স্বতন্ত্র পাকযন্ত্র বহন করুক তবে আমাদের হাত-পা বুক-পিঠ বিধাতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া বলিতে পারে আমাদের নিজের নিজের একটা করিয়া পাকযন্ত্র চাই। কিন্তু যতই রাগ করি আর তর্ক করি, সত্যের কাছে হার মানিতেই হয় এবং সেইজন্যই সংস্কৃত বাংলা আপন খোলস ভাঙিয়া যে-ছাঁদে প্রাকৃত বাংলার রূপ ধরিয়া উঠিতেছে সে-ছাঁদ ঢাকা বা বীরভূমের নয়। তার কারণ নানা প্রদেশের বাঙালি শিখিতে, আয় করিতে, ব্যয় করিতে, আমোদ করিতে, কাজ করিতে অনেক কাল হইতে কলিকাতায় আসিয়া জমা হইতেছে। তাহাদের সকলের সম্মিলনে যে একভাষা গড়িয়া উঠিল তাহা ধীরে ধীরে বাংলার সমস্ত প্রদেশে ছড়াইয়া পড়িতেছে। এই উপায়ে অন্য দেশে যেমন ঘটিয়াছে তেমনই এখানেও একটি বিশেষ ভাষা বাংলাদেশের সমস্ত ভদ্রঘরের ভাষা হইয়া উঠিতেছে। ইহা কল্যাণের লক্ষণ। অবশ্য স্বভাবতই এই ভাষার ভূমিকা দক্ষিণ বাংলার ভাষায়। এইটুকু নম্রভাবে স্বীকার করিয়া না লওয়া সদ্বিবেচনার কাজ নহে। ঢাকাতেই যদি সমস্ত বাংলার রাজধানী হইত তবে এতদিনে নিশ্চয়ই ঢাকার লোকভাষার উপর আমাদের সাধারণ ভাষার পত্তন হইত এবং তা লইয়া দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা যদি মুখ বাঁকা করিত তবে সে বক্রতা আপনিই সিধা হইয়া যাইত, মানভঞ্জনের জন্য অধিক সাধাসাধি করিতে হইত না।’

পাঠক, উল্লিখিত অভিমত স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। আমরা যেন অবিকল বিবেকানন্দ ও প্রমথ চৌধুরীর কণ্ঠ শুনিতে পাই-সেই ভদ্রঘর, সেই প্রমোদ রচনা, সেই মিলিয়া মিশিয়া একাকার হওয়া। কে যে কাহার সহিত একাকার হইবে-তাহা বুঝিয়া ওঠা বিষম ক্লেশ। ঢাকার ভাষা, কলিকাতার ভাষা বলিয়া আদৌ কোনো ভাষা আছে কি না, তাহা আমরা ঠাহর করিতে পারি নাই। তিনি আরও একটি অতিশয় অদ্ভুত দৃশ্য অবলোকন করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় : ‘তাহাদের সকলের সম্মিলনে যে একভাষা গড়িয়া উঠিল তাহা ধীরে ধীরে বাংলার সমস্ত প্রদেশে ছড়াইয়া পড়িতেছে।’ সকলের সম্মিলন-এই ‘সকল’ কাহারা, যাহাদের মিলন হইতে একভাষা গড়িয়া উঠিল? কবে, কোথায়, কীভাবে একভাষা আসিয়া হাজির হইল? মজার বিষয় হইল-রবীন্দ্রনাথ চলিত ভাষার পক্ষে তাহার অভিমত বলিতে গিয়া সেই ‘বাতিলযোগ্য’ সাধু ভাষাই ব্যবহার করিলেন। আমরা মনে করি ইহা তাহার ঔদার্য; তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি যে এক ধরনের উভসংকটে পড়িয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় বেশ দ্বিধা-সংকোচের অনাকাঙ্ক্ষিত জালে আটকাইয়া গিয়াছেন-ইহা বুঝিতে কোন অসুবিধা হয় না। যেমন, রবীন্দ্রনাথ চলিত রীতির প্রতি সমর্থন জানাইয়াও আবার এই একই প্রবন্ধে অন্যকথা বলিলেন। তিনি বলিলেন,

‘এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে সাহিত্যে আমরা যে-ভাষা ব্যবহার করি ক্রমে ক্রমে তার একটা বিশিষ্টতা দাঁড়াইয়া যায়। তার প্রধান কারণ সাহিত্যে আমাদিগকে সম্পূর্ণ করিয়া চিন্তা করিতে এবং তাহা সম্পূর্ণ করিয়া ব্যক্ত করিতে হয়, আমাদিগকে গভীর করিয়া অনুভব করিতে এবং তাহা সরস করিয়া প্রকাশ করিতে হয়। অর্থাৎ সাহিত্যের ক্ষেত্র প্রধানত নিত্যতার ক্ষেত্র। অতএব, এই উদ্দেশ্যে ভাষাকে বাছিতে সাজাইতে এবং বাজাইতে হয়। এজন্যই স্বভাবতই সাহিত্যের ভাষা মুখের ভাষার চেয়ে বিস্তীর্ণ এবং বিশিষ্ট হইয়া থাকে’।

অতঃপর রবীন্দ্রনাথ কি তথাকথিত মুখের ভাষা ধারণাটি পুরাপুরি সমর্থন করিলেন না? না করিলে কতটুকু করিলেন না? এইখানে আমরা তাহার অভিমত নিয়া পুনরায় একটি অনতিক্রান্ত দ্বিধায় পড়িয়া যাই। অথচ তিনি বাংলা ভাষার অমূল্য সম্পদ অসংখ্য রচনা সাধু ভাষায় লিখিয়াছেন। এমনকি, তাহার অগুনিত কবিতায় তিনি অবলীলায় সাধুরূপ গ্রহণ করিয়াছেন। আমরা এইখানে কয়েকটি নমুনা তুলিয়া দেওয়ার লোভ আটকাইতে পারিলাম না :

* ‘ভরা নদী ক্ষুর-ধারা খর-পরশা-

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা’।

* ‘ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম, উঠিল কলস্বর।

গাছের শাখে জাগিল পাখি, কুসুমে মধুকর’।

* “আমি কহিলাম, ‘সব দেখিলাম, তোমারে দেখি নি শুধু’!

* ‘নিদ্রা টুটিয়া সহসা চকিতে চমকিয়া বসিলাম’।

এইরূপ অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। একবার ভাবিয়া দেখুন তো, উদ্ধৃত চরণগুলোর কোনো একটি চলিত রীতিতে সাজাইলে ইহাদের কাব্য-ব্যঞ্জনা কতখানি টিকিয়া থাকিবে পাঠকের নিকট! এইস্থলে রুচি-অরুচির প্রশ্ন আসিবে; আমরা এইরূপ তর্ক করিতে প্রস্তুত নহি। কেবল এতটুকু না বলিলে কথা কিছু বাকি থাকিয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রসিদ্ধ রচনাসমূহের প্রায় সবকটি সাধুভাষায় রচিত। যেইদিন তিনি সাধু ছাড়িয়া ‘অন্য’ পথ ধরিলেন, সেইদিন তাহার রচনা এমন একটি বাঁক লইল-যাহা আমাদের সাহিত্যের জন্য বড় একটা গৌরবের অধ্যায় হয় নাই। কেবল তাহাই নহে; সাধু ছাড়িয়া চলিত রীতিতে আসিবার পর তাহার গদ্য এক অস্বস্তিকর আড়ষ্টতায় এমনভাবে আটকাইয়া গিয়াছে যে, তিনি নিজেই বুঝি নিজের সাবলীল সৌন্দর্যের আলোকিত পথ হইতে সরিয়া গিয়াছেন। ইহা আমাদের অভিমত। আপনাদের মতের বিরুদ্ধে আমরা যুক্তি সাজাইব না; তবে রবীন্দ্রনাথের দুই রীতির রচনা মিলাইয়া পড়িলে আপনারা নিজেরাই আশা করি ধরিতে পারিবেন, অনুসৃত ভাষারীতি কীভাবে চিন্তাপ্রণালিকে বাক্সময় করিয়া তোলে আবার অস্পষ্টতা ও দ্ব্যর্থ ধারণার জন্ম দেয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ইহার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ইহা তাহার বেলায় বারবার আমরা উপলব্ধি করি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যে মানবিকতা

শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যে মানবিকতা

গল্প অনুভূতি মৃত্যু

অনুভূতি মৃত্যু

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ৯ চলিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

চলিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

মননের উত্তরাধিকার চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ

মননের উত্তরাধিকার চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম