গল্প
অনুভূতি মৃত্যু
সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় ত্রিশ বছর আগে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনে রিতার এক রাতের ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিল শুভ্র। ত্রিশ বছর পর তাদের আবার দেখা একই স্টেশনে। যাত্রীদের অপেক্ষমাণ কক্ষে বিরক্তি নিয়ে শুভ্র যখন বসা ছিল, ঠিক তখন রিতার আগমন। বজ্রপাতের মতো চমকে উঠল শুভ্র। ভুল কিছু দেখছে না তো! শুভ্রর পাশের ফাঁকা চেয়ারে বসল রিতা। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য শুভ্র জিজ্ঞেস করল, আপনি রিতা?
পরিচিত কণ্ঠ শুনে চমকে গেল রিতা। শুভ্রর দিকে এক পলক তাকিয়ে সে যেন আকাশ থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। রিতা উচ্চৈঃস্বরে বলল, আপনি শুভ্র?
শুভ্র চেয়ার থেকে উঠে মুখোমুখো দাঁড়াল রিতার। দুজনের চোখে অশ্রু। কেউ কথা বলতে পারছে না। শুভ্রের হাত-পা কাঁপছে। রিতা বলল, শান্ত হয়ে বস। শুভ্র টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বসল। কিছু সময় নীরবতার পর শুভ্র প্রশ্ন করল, কোথায় ছিলে এত বছর?
একই প্রশ্ন আমারও। একটা মানুষ এভাবে নাই হয়ে যায় কেমনে?
স্টেশনের মাইকে তখন ঘোষণা হচ্ছিল, সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেন উপবন এক্সপ্রেস অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে এক নম্বর লাইনে এসে দাঁড়াবে।
তোমার সিট কোন বগিতে? প্রশ্ন করল শুভ্র।
ট বগিতে। তোমার?
দেখতে হবে। এই বলে মোবাইল ফোনে থাকা টিকিটের ছবি দেখে রিতা খুশি হয়ে বলল, আমারও তাই। সিট নম্বর ১৮। শুভ্র তার টিকিট দেখে বলল, আমার ৩৬। পাশাপাশি হলে ভালো হতো। তোমার বা আমার পাশের সিটের যাত্রীকে অনুরোধ করে দেখা যেতে পারে। ট্রেন ছাড়ার পর রিতা তার পাশের যাত্রীকে অনুরোধ করে শুভ্রের সিটে পাঠিয়ে দিল। শুভ্র বলল, তোমার মনে আছে? এখান থেকেই আমরা ট্রেনে সিলেট গিয়েছিলাম।
হ্যাঁ। প্রায় ত্রিশ বছর আগে।
তুমি সময়ক্ষণও মনে রেখেছো দেখি।
সেটা কী ভুলার মতো! রিতা বলল।
সেই ভ্রমণের পর বাসায় ফিরে উধাও হয়ে গেলে। পরে শুনলাম আমেরিকা চলে গেছ।
পরিস্থিতির শিকার ছিলাম।
তাই বলে এভাবে না জানিয়ে চলে যায় মানুষ। একটিবার যোগাযোগ তো করতে পারতে।
রিতা বলল, পুরোনো ইতিহাস টানলে আরও ক্ষত বাড়বে।
আমি এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করছি না।
দুই. প্রায় ত্রিশ বছর আগের ঘটনা। শুভ্র ও রিতা মতিঝিলে পাশাপাশি অফিসে চাকরি করত। নিয়মিত চায়ের দোকানে তাদের দেখা হয়। পরিচয়ের শুরুটা সেখান থেকেই। সময়ের ব্যবধানে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। প্রেম না হলেও একটা অদ্ভুত অনুভূতি একে অপরের প্রতি। শুভ্র রিতাকে পছন্দ করে সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যেত। রিতা ছিল বুদ্ধিমতী। নিজের অনুভূতি বুঝতে দিত না। শুভ্র ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে রিতা কৌশলে এড়িয়ে যেত। আবার শুভ্র কিছুদিন চুপচাপ থাকলে রিতা বলত, ভুলেই গেলে। নতুন বান্ধবী পেয়েছো মনে হয়। এমন কথায় শুভ্র নিজেকে যতটুকু নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল, তার বাঁধ পুরোটাই আবার ভেঙে যেত। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, মজা করা ভালোই পার। অফিসের পর চল কোথাও বসি। তারপর বিকালে কফিশপে জমতো আড্ডা। রিতা কাছাকাছি থাকলে শুভ্রর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হত। প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা রিতাকে স্পর্শ করার। শুভ্র অনেক সময় রিতার কাছাকাছি বসলেও তাদের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকত। শুভ্র যখন অতি আবেগে ছটফট করত, তখন রিতা পুরো সময়টাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করত। সে খুব সহজেই নিজেকে সামলে নিয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য বলত, চল উঠি। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। শুভ্রর মুখ দিয়ে কথা বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকত না তখন। বের হয়ে যেত শুভ্র। রিতা যাওয়ার সময় পেছনের দিকে ফিরে তাকাত না। তার কারণ কখনো জানা হয়নি শুভ্রের। কিছুদিন দেখা না হলে শুভ্রর মন ছটফট করত। মোবাইল ছিল না তখন। বেশি মনে পড়লে শুভ্র ল্যান্ডফোনে কথা বলত রিতার সঙ্গে। শুভ্রর ফোন রিসিভ করে রিতা জিজ্ঞাসা করত, জরুরি কিছু বলার মতো না থাকলে আগামীকাল অফিসের পর কথা হবে। বাসায় ফোনে কথা বলা সমস্যা।
শুভ্র তখন বাকরুদ্ধ হয়ে যেত। কী বলবে বুঝতে পারত না। চুপচাপ টেলিফোন রেখে মন খারাপ করে বসে থাকত। এভাবে চলার কিছুদিন পর হঠাৎ খবর এলো শুভ্রকে সিলেটে বদলি করা হয়েছে। ঢাকায় শেষ অফিস করে রিতার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে শুভ্র আবেগপ্রবণ হয়ে গেল। রিতাও সেদিন নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেনি। চোখের টলমল পানি মুছে বলল, আমি তোমাকে প্রচণ্ড মিস করব।
আমি কতটা করব, সেটা যদি বোঝাতে পারতাম। বলল শুভ্র।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর রিতা বলল, ঢাকায় ছুটিতে এলে দেখা হবে।
সেটা করা যাবে।
তোমাকে বলা হয়নি। আমার বড় ভাই রাজশাহীতে পরিবারসহ থাকেন। বলল রিতা।
একদিনও বলনি তুমি।
গত মাসেই বদলি হলো।
শুভ্র বলল, তুমিও চলে আস।
সম্ভব হলে তাই করতাম।
তাহলে একদিনের সফরসঙ্গী হতে পার। যাত্রার সময় তোমাকে কাছে পেলাম। বলল শুভ্র।
ইস, একেবারে প্রেমিকের মতো ডায়লগ দিচ্ছ।
আমি কিন্তু সিরিয়াস। তুমি বললে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখব।
সময় বলে দেবে। আপাতত কল্পনা কম করাই ভালো।
কবে পাচ্ছি তোমাকে? বলনা প্লিজ।
রিতা হাসি দিয়ে বলল, যখন ডাকবে?
সিলেটের সুন্দর সুন্দর জাগয়াগুলো ঘুরে দেখাবে তুমি।
সেটা পারব না হয়তো। যখনই যাই না কেন, স্টেশনে আমাকে রিসিভ করতে আসবে ভাইয়া। বাসায় কোনো ঝামেলা তৈরি করা যাবে না।
তিন. শুভ্র সিলেট যাওয়ার মাস তিনেক পর তাদের সুযোগ হলো একসঙ্গে ভ্রমণের।
রাত ১২টার দিকে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সিলেটের উদ্দেশে তাদের যাত্রা শুরু।
ট্রেনে দুজন পাশাপাশি সিটে এমন গল্প শুরু করেছেন, যেন কতজনম পর তাদের দেখা।
রিতা মৃদু হেসে বলল, মানুষ ঘুমানোর চেষ্টা করছে। আমরা কথা বলেই যাচ্ছি।
আমার পাশে সুন্দরী। ঘুম আসবে না।
ঢং করো না। পাবলিক মাইর দেবে।
তাহলে আমি ঘুমালাম। এ বলে শুভ্র সিটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করল। চেয়ারের হাতলে হাত রাখতে গিয়ে রিতার হাতের ছোঁয়া লাগল তার হাতে। শুভ্রর কাছে মনে হল যেন বিদ্যুতের শক লেগেছে। রিতাও চমকে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে হাত সরিয়ে নিল। তারপর রিতা জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে দিকে তাকিয়ে রইল।
শুভ্র খেয়াল করল, তার বিপরীত দিকের একটা কাপল এক চাদরে নিজেদের ডেকে জড়াজড়ি করে ঘুমাচ্ছে। শুভ্রর মধ্যে রিতাকে কাছে পাওয়ার আকুতি আরও বেড়ে গেল।
রিতার কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার আচরণে হুট করে ক্ষুব্ধ হয়ে গেল শুভ্র। সে বিরক্তি নিয়ে রিতাকে বলল, এত রাতে বাইরে দেখার কী আছে?
আমার ভালো লাগছে। রাতের প্রকৃতি অন্যরকম। হ
রিতার আচরণ শুভ্রের কাছে অপরিচিত যাত্রীর মতো মনে হচ্ছে। শুভ্র চুপচাপ চোখ বন্ধ করে রইল। কিছুক্ষণ পর রিতা সিটে গা এলিয়ে শুভ্রকে বলল, জোর করে চোখ বন্ধ করে রাখতে হবে না। চোখ খুলেন।
বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না। পাশের যাত্রীর সঙ্গে গা লাগা বারণ।
তাই?
জি।
পুরুষ মানুষকে ঢংএ মানায় না।
শুভ্র নড়েচড়ে সিট থেকে মাথা তুলে বলল, এবার তোমার সঙ্গে আসা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করিনি। আগে যতবার করেছি, উলটো ঘটেছে।
হুটহাটই ভালো। আমিও অনেকবার চেষ্টা করে পারিনি।
কখনো গল্প করে আবার কখনো চুপচাপ। এভাবে রাত প্রায় ৪টা। রিতা বলল, একটু চোখ বন্ধ করা প্রয়োজন। তুমিও ঘুমানোর চেষ্টা করো। শুভ্র এপাশ ওপাশ হয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখে। আবার কখনো অর্ধচোখ খুলে রিতাকে দেখে। সরু নাকে নোজ রিং, কপালে ছোট টিপ, ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিকে তাকে অপরূপ লাগছে। পারফিউম আর রিতার শরীরের ঘ্রাণ দুটো একসঙ্গে মিশে যে সুগন্ধি ছড়াচ্ছে, তাতে শুভ্র বিমোহিত হয়ে পড়েছে। তার হৃদস্পন্দন এমনভাবে বেড়ে গেল, যেন দূর থেকে শোনা যাবে। এসির বগির মধ্যেই শুভ্রর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা শুরু হলো। একটা ঘোরের মধ্যে সে বাম হাতটা রিতার হাতের পাশাপাশি রাখল। দুই হাতের মধ্যে স্পর্শের দূরত্ব। শুভ্রের খুব ইচ্ছে রিতার হাতে হাত রাখতে; কিন্তু অনুমতি ছাড়া শুভ্র কখনো তা পারবে না। নিজের ইচ্ছে আর মনের দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রায় মিনিট বিশেক চলে গেল।
রিতা হুট করে মাথা তুলে বলল, ঘুমালে নাকি?
না।
আমারও ঘুম হচ্ছে না। ক্লান্তিতে শরীরে এক ফোটা শক্তি নেই। কিন্তু ঘুম আসছে না।
চল আবার চেষ্টা করি। বলল রিতা।
চোখ বন্ধ করল শুভ্র। রিতা নড়েচড়ে বসার সময় শুভ্রের পায়ের সঙ্গে তার পা স্পর্শ হলো। এভাবে কেটে গেল পুরো রাত। ট্রেন ভোরে সিলেট পৌঁছাল। রিতা বলল, ভাইয়া হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে এখান থেকেই বিদায় নিতে হবে। তারপর অপরিচিত যাত্রীর মতো নিজেরা ট্রেন থেকে নেমে গেল।
চার. তোমাকে একটা প্রশ্ন করি? বলল শুভ্র।
অবশ্যই।
তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য যে আকুলতা ছিল, সেটা কী তুমি বুঝতে?
হ্যাঁ।
তাহলে সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে কেন? জানতে চাইল শুভ্র।
ভয়ে। আমাকে আরও বেশি পাওয়ার আগ্রহ জন্মাত তোমার মধ্যে। তাছাড়া আমিও হয়তো এলোমেলো হয়ে যেতাম।
ট্রেনে আমার যে কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা বুঝতে পেরেছিলে সেদিন?
তুমি অনেকবার আমার হাত ধরতে চেয়েও ধরনি। তাছাড়া তোমার মধ্যে যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছিল, সেটা আমার মধ্যেও ছিল।
যদি হাত ধরতাম রাগ করতে?
ত্রিশ বছর পর এ উত্তর জেনে কী হবে?
আমার জানতে খুব ইচ্ছা করছে।
রিতা আবেগমাখা কণ্ঠে বলল, হয়তো আমিও শক্ত করে ধরে রাখতাম।
শুভ্রের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তুমি একটু আগ্রহ দেখালে না কেন? অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে আমি তোমাকে খুঁজে বেরিয়েছি ত্রিশ বছর ধরে। বলল শুভ্র।
তোমার কী মনে হয় আমার মনে হাহাকার নেই? প্রশ্ন করল রিতা।
এখন আর সেই ভয় নেই। এই বলে রিতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল শুভ্র।
রিতা শুভ্রকে ঝাপটে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে তার একটি হাত শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে আছে রিতা। ট্রেন দ্রুত গতিতে সিলেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ভ্রমণে সবই আছে। শুধু নেই ত্রিশ বছর আগে শিরহিত হওয়ার অনুভূতিটুকু।
