গল্প
মরা গাঙের ঢেউ
Advertisement
সফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষ ভাবে, সংসার ভাঙে বড় কোনো ঝড়ে। পরকীয়া, হাতাহাতি কিংবা উকিলের পাঠানো একখানা খামে। আসল সত্য হলো, সংসার এক ধাক্কায় ভাঙে না। সংসার ভাঙে ধুলোর মতো। প্রতিদিন একটু একটু করে জমে, কেউ টের পায় না। তারপর একদিন ভোরে ঘুম ভেঙে দেখা যায়, পাশে শুয়ে থাকা মানুষটা এক হাত দূরে নয়, হাজার মাইল দূরে।
আমি সেই ধুলো জমতে দেখিনি। দেখার সময় ছিল না।
বিয়ের পর প্রথম প্রথম জুমন খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলত। রাগলে একেবারে আগুন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে, তিতাসের পারের জল-হাওয়ায় বড় হয়েছে। রক্তে যেন জোয়ার-ভাটার জিদ। একটু এদিক-ওদিক হলেই চোখমুখ লাল করে বলত, ‘তোমার কি আক্কেল-সেয়ান কিচ্ছু নাই? সংসারের কোনো হিল্লা করো না, খালি নিজের ধান্দায় ঘুরো!’
আমি হাসতাম। ‘রাগ কইরো না। রাগের মাথায় কথা কইলে আয়ু কমে।’
সে মুখ ঘুরিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠত, ‘আমার আয়ু কমলে তোমার কী? তুমি তো বাঁচলা!’
রাতে ফিরতে দেরি হলে দেখতাম, সে দরজার চৌকাঠে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোমরে আঁচল গোঁজা, চোখে শাসন। ‘কয়টা বাজে দেখছ? মানুষ চিন্তা করে না?’
সেই রাগের ভেতরে একটা জ্যান্ত নদী ছিল। মানুষ তো তার ওপরেই রাগ করে, যাকে সে আপন ভাবে। পরের ওপর কেউ রাগ করে না, বড়জোর ভদ্রতা করে।
আমি মূর্খ, সেটা বুঝিনি।
তিন-চার বছর যেতে না যেতেই নদীটা শুকাতে শুরু করল।
দেরি করে ফিরলে এখন আর দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। কলিংবেল বাজাই। অনেকক্ষণ পর দরজা খোলে। জুমন হয়তো বারান্দার আলোয় বসে সেলাই করছে, কিংবা ছাদ থেকে শুকনো কাপড় তুলে আনছে।
‘খাবার ঢাকা আছে?’
সুই থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় বলে, ‘হ, টেবিলে রাখা আছে। খাইয়া নিও।’
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা, মেয়েটার এতদিনে আক্কেল হয়েছে। ঠান্ডা হয়েছে।
অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুরুব্বিরা বলেন, ‘পানি থই থই করলে নাও ডুবনের ডর নাই, থমথমে গাঙেই নাও ডুবে।’
আমার সংসারের গাঙ তখন থমথমে। আর আমি নৌকায় বসে ভাবছি, আহা, কী শান্ত জল!
আমাদের মেয়ের নাম জিনিয়া।
ছোটবেলায় আমার গলা জড়িয়ে না ধরলে তার ঘুম আসত না। অফিস থেকে ফিরলেই ছোট ছোট আঙুল দিয়ে আমার পকেট হাতড়াত। চকলেট পেলে সে কী হাসি! যেন গুপ্তধন পেয়েছে।
একদিন জুমন রান্নাঘর থেকে দেখে বলেছিল, ‘মাইয়াডারে খালি মাথায় তুইলা রাখছ। দুইটা ভালো কথা শিখাও, সময় দাও। নাইলে বড় হইলে কিন্তু মুখ ফিরায়া নিব।’
আমি জিনিয়াকে কোলে নাচাতে নাচাতে বললাম, ‘আমার মাইয়া আমারে ছাইড়া যাইব কই? তুমি তোমার কাজ কর তো।’ বলেই আমি বিছানায় শুয়ে মেয়েকে পায়ে বসিয়ে নাচাতে থাকি। আর গীত গাইতে থাকি ‘জল্লইরে জল্লই, মামুর বাড়ি কল্লই, মামু গেছে আছাড়ে, গাওয়া ব্যাঙে নাছারে, চিলরে চিল বিলে যা, বিলে গিয়া মাছ খা।’ বলতে বলতে মেয়েকে প্রশ্ন করি-‘কোন গাঙে যাবি? বড় গাঙে নাকি ছোট গাঙে?’ মেয়ে গাঙ পছন্দ করে আমি ফেলে দিই একদিকে। মেয়ে খিলখিল করে হাসে।
আমার হালকা মুড দেখে জুমন আর কথা বাড়ায়নি। সে ততদিনে কথা বাড়ানো ছেড়ে দিয়েছে।
বছর কয়েক পর সত্যিই জিনিয়া আর পকেট হাতড়ায় না। আমি ঘরে ঢুকলে তার ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেজানো থাকে। ভেতরে কানে হেডফোন, হাতে মোবাইল। দরজায় লেখা থাকে, ‘কেউ নক করবে না’।
একদিন নিজেই গিয়ে দরজায় দাঁড়ালাম। ‘কী রে মা, কী করিস? আব্বুর লগে গল্প করবি না?’
পর্দা থেকে চোখ না তুলেই বলল, ‘পড়া আছে আব্বু। পরে।’
সেই পরে আর কোনোদিন আসেনি।
দরজায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এলাম। নিজেকে বোঝালাম, মেয়ে বড় হয়েছে, এখন বাবার কোলে উঠতে লজ্জা পায়। কিন্তু সে রাতে ঘুমন্ত জুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এই দূরত্ব একদিনে তৈরি হয়নি। আমি যখন সংসারের ঘানি টানতে টানতে চোখে ঠুলি বাঁধা বলদের মতো ঘুরছিলাম, তখন আমার নিজের রক্ত একটু একটু করে আমার কাছ থেকে সরে গেছে। কখনো মেয়ে, কখনো বউ, কখনো আমি নিজেই নিজের কাছ থেকে।
এক বিকেলে জুমন খুব ইতস্তত করে কাছে এসে দাঁড়াল। ‘বাপের বাড়ি থাইকা বড় খালা আইছে। হাজারীবাগ। উনার বাসায় একটু যাইবা আমার লগে?’
আমি তখন ল্যাপটপে অফিসের স্প্রেডশিট মেলাচ্ছি। কোথাও একটা হিসাব মিলছে না। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ধুর! দেখ না কাজের প্রেশার? এখন পারব না।’
‘কখন পারবা?’
‘ঠিক নাই। পরে একদিন সময় কইরা যামু।’
সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। স্যান্ডেলের শব্দটাও শুনিনি। অথচ স্প্রেডশিটের হিসাবটা ঠিকই মিলিয়ে ফেলেছিলাম। শুধু জীবনের হিসাবটা যে গরমিল হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে চোখ যায়নি। পরদিন সকালে দেখি, বাথরুমের প্লাস্টিকের বদনাটা চুইয়ে পানি পড়ছে। জুমনকে ডাকলাম। ‘এই ফুটা বদনাটা এখনো রাখছ ক্যান? ফালায়া দাও না!’ সে তখন আলমারি থেকে সুই-সুতা বের করছিল। নিচু গলায় বলল, ‘একটু ফুটা হইলেই সব জিনিস ফালানি লাগে না। পানি একটু পড়ে, তাও কাজ তো চলে।’
‘ভাঙা জিনিস ঘরে জমায়া রাখা কোনো বুদ্ধির কাজ?’
সে আমার দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসল। সে হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল শুধু ক্লান্তি।
‘সব ভাঙা জিনিস একবারে ফালানো যায় না গো। কিছু ভাঙা জিনিস লইয়াও মানুষ সারাটা জীবন পার কইরা দেয়।’
কথাটা সেদিন বাথরুমের মেঝেতে পড়ে থাকা পানির মতোই গড়িয়ে চলে গেল। কথাটার মানে বুঝতে আমার লেগেছিল বহু বছর।
আমরা তখন একই ছাদের নিচে দুটো দ্বীপ। মাঝখানে নীরবতার লোনা জল। দুই দ্বীপের মধ্যে খেয়া চলে শুধু দরকারি কথার। চালের কেজি কত, জিনিয়ার কোচিংয়ের বেতন গেছে কি না, কারেন্ট বিল এলো কি না, গ্যাসের চুলা জ্বলে না কেন। গ্রামের ঈদের খরচ দেওয়া হয়েছে কিনা, আত্মীয়স্বজন, অমুক তমুক সকল বিষয় দেখা হয়েছে কিনা।
কিন্তু ‘আজ তোমার মনটা ভার কেন?’ কিংবা ‘চলো, একটু হাঁটতে যাই’ জাতীয় কথা ঘর থেকে কবে যে উড়ে গেছে, কেউ টেরও পাইনি।
তারপর একদিন জুমন বিছানা থেকে উঠতে পারল না। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, মাথা তুলতে পারে না। আমি টেবিলে নাশতা ঢেকে রেখে বললাম, ‘আমি অফিসে যাইতেছি। তুমি পাশের বাসার ভাবিরে লইয়া ডাক্তারের কাছে যাইও। আজ আমার জরুরি মিটিং।’
সে চোখ তুলে একবার তাকাল। ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে, শুকনো পাতার মতো। ‘তুমি একবার লগে যাইতে পারবা না?’
আমি কবজির ঘড়িটার দিকে তাকালাম। কাঁটা ছুটছে। ‘এখন গেলে মিটিং মিস হইব। রিকশা লইয়া চইলা যাও, বিকালে খোঁজ নিমু।’
সে আর কিছু বলল না। পাশ ফিরে বালিশে মুখ গুঁজলো।
দুপুরে হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। রিকশা থেকে নামতে গিয়ে জুমন জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গেছে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলাম। ওয়ার্ডের সাদা বিছানায় সে শুয়ে আছে, হাতে স্যালাইনের সুই। এত ছোট লাগছিল তাকে! যেন বিছানার চাদরের ভাঁজে হারিয়ে যাওয়া একটা মানুষ। মধ্যবয়সি মহিলা ডাক্তার রিপোর্ট হাতে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামি।
‘মারাত্মক অ্যানিমিয়া। শরীরে রক্ত প্রায় নেই। দীর্ঘদিনের পুষ্টিহীনতা, সঙ্গে ডিপ্রেশন। অনেক দিন ধরেই উনি অসুস্থ। আপনি খেয়াল করেননি?’
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ‘প্রতি মাসে তো বাজারের লম্বা ফর্দ আসে। মাছ-মাংস, ফলমূল, কোনোটার তো কমতি নাই!’
ডাক্তার চশমা খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘ঘরে খাবার থাকা আর মানুষটা মন নিয়ে সেই খাবার মুখে তুলতে পারা, এক কথা নয় ভাই। অনেক মেয়ে সবাইকে খাইয়ে-দাইয়ে নিজে হাঁড়ির তলানিটুকু খায়, তাও না খেয়েই উঠে যায়। কেউ দেখে না।’
কেউ দেখে না। কথাটা তিরের মতো বুকে গেঁথে গেল। আজও সেখানে গাঁথা আছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর জুমন আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। ঘরকন্নার সব কাজ আগের মতোই নিখুঁত। জিনিয়ার টিফিন, আমার শার্টে ইস্ত্রির ভাঁজ, বারান্দার টবে পানি। শুধু আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। একদিন আর সইতে না পেরে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ‘জুমন, তুমি কি আমার ওপর রাগ কইরা আছ?’
সে বঁটিতে মাছ কুটছিল। শান্ত গলায় বলল, ‘না তো। রাগ করুম ক্যান?’
‘তাইলে আমার লগে কথা কও না ক্যান?’
সে হাত ধুয়ে আঁচলে মুছল। তারপর সোজা আমার চোখের দিকে তাকাল। ‘কথা কওনের মতো কিছু কি বাকি রাখছ তুমি?’
‘ক্যান? কত কথা আছে! সংসারের কথা, জিনিয়ার কথা...’
সে মৃদু হাসল। ‘ঐগুলা তো সংসারের দরকারি কথা। আমাগো দুইজনের নিজের কোনো কথা আছে?’
আমার গলায় কী যেন দলা পাকিয়ে আটকে গেল। উত্তর খুঁজে পেলাম না। বিশ বছরের সংসারে দুজনের নিজের একটা কথাও খুঁজে পেলাম না। জিনিয়া মেডিকেলে চান্স পেল, চট্টগ্রামে চলে যাবে। ব্যাগ গোছানো চলছে। আমার মনে হলো, এবার ভাঙা হাঁড়িটা একটু জোড়া লাগানো দরকার। এক শনিবার সকালে বললাম, ‘জিনিয়া, চল আইজ আমরা তিনজন নদীর পাড়ে ঘুরতে যাই। দুপুরে বাইরে খামু।’
জিনিায়া অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ‘আম্মু যাইব?’
জুমন ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘না রে মা, তোরা যা। ঘরে মেলা কাজ।’
আমি একটু জেদ ধরলাম। ‘কাজ তো সারা জীবনই থাকব। আইজ চলো না!’ জুমন ঝাড়ুটা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। ‘তুমি কি সত্যিই চাও আমি যাই? নাকি মাইয়ার সামনে ভালো জামাই সাজতে চাও?’ আমি চমকে উঠলাম।
সে আরও শান্ত, আরও ধীর গলায় বলল, ‘যে মানুষটা বিশ বছর ধইরা একলা একলা পথ হাঁটা শিখা ফালাইছে, তারে এখন আর লগে নেওনের ভং ধইরো না।’
সে রাতে জিনিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর জুমনের সামনে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ উসখুস করে বললাম, ‘জানি, আমি ভালো স্বামী হইতে পারি নাই। কিন্তু আমি কি এতই খারাপ? কোনোদিন তোমার গায়ে হাত তুলছি? গালি দিছি? টাকার কষ্ট দিছি?’
জুমন জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। দেওয়ালঘড়িটা টিকটিক করছে।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল, ‘না। তুমি কোনোদিন মারো নাই। গালিও দাও নাই। খাওনের কষ্টও দাও নাই।’
‘তাইলে এত অভিমান ক্যান?’
সে ফিরে বসল। চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু গলা কাঁপছে না। ‘তুমি খালি সংসার চালাইছ, আমারে ভালোবাস নাই। কোনোদিন জানতে চাও নাই আমার কোন রং পছন্দ, কোন গান শুনলে মন ভালো হয়, কোন রাইতে ঘুম আসে না। বিয়ের পরদিন তোমার হাতে হাত রাখছিলাম। ভাবছিলাম, একটা বন্ধু পাইলাম। কিন্তু তুমি আমারে বানাইলা বেতন ছাড়া এক কাজের মানুষ।’
একটু থামল। ওড়নার কোণ দিয়ে চোখটা মুছল। ‘আমাগো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ রাগ করলে থালাবাটি ঝনঝন করে, চিল্লায়। আমিও পরথম পরথম তা-ই করতাম। তুমি ওইডারে ক্যাঁচক্যাঁচ ভাবছ। রাগের পেছনে যে কান্নাডা আছিল, ওইডা দেখ নাই। যেইদিন থাইকা আমি চিল্লানি থামাইছি, বুইঝা নিও, সেইদিন থাইকা তোমার লাইগা আমার ভেতরের মানুষটা মইরা গেছে।’ তারপর খুব আস্তে, প্রায় নিজের মনে বলল, ‘মরা গাঙে আর ঢেউ ওঠে না গো।’
মনে হলো, মাথার ওপরের ছাদটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। যে রাগ ছিল আমার ওপর তার অধিকারের দাবি, তাকে আমি ভেবেছি উৎপাত। আর যেদিন সে রাগ করা ছেড়ে দিল, আমি ভেবেছি সে শান্ত হয়েছে। অথচ সে শান্ত হয়নি, সে আমার ওপর থেকে আশাই ছেড়ে দিয়েছিল।
নদী শুকিয়ে গেলে জল থাকে না ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর থেকে যায় একটা দীর্ঘ চর। সেই চরে আমি এতদিন ঘর বানিয়ে ভেবেছি, এটাই সুখের সংসার।
পরদিন সকালে জীবনে প্রথমবার আগে থেকে কিছু না জানিয়েই অফিস কামাই করলাম। জুমন অবাক। ‘অফিসে যাইবা না? শরীর খারাপ?’ ‘না। আইজ তোমারে লইয়া নিউমার্কেট যামু।’ ‘ক্যান?’
‘তোমার লাইগা শাড়ি কিনমু।’ ‘আমার শাড়ির অভাব নাই।’ ‘তাও যামু।’ নিউমার্কেটের এক দোকানে একটা বেগুনি সুতি শাড়ির সামনে সে থমকে দাঁড়াল। আঁচলটায় আলতো করে হাত বুলাল, যেন বহুদিন পর কোনো পুরোনো সইয়ের গালে হাত রাখছে। তারপর দামের ট্যাগ দেখে চুপচাপ ভাঁজ করে রেখে দিতে গেল। আমি দোকানিকে বললাম, ‘ভাই, এইটা প্যাক কইরা দেন।’ জুমন আমার দিকে তাকাল। ‘তুমি ক্যামনে জানলা, এইডা আমার পছন্দ হইছে?’ আমি একটু হেসে বললাম, ‘জানি নাই তো। বাকি জীবনটা পইড়া আছে, অহন থাইকা শিখতাছি।’
ফেরার পথে রিকশায় বহু বছর পর জুমন আমার হাতটা ধরল। খুব শক্ত করে নয়, আবার আলগাও নয়। যেভাবে মানুষ নদী পার হওয়ার সময় সাঁকোর বাঁশ ধরে, সেভাবে।
‘জানো, সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগত কখন?’
‘কখন?’
‘যখন দেখতাম, তুমি দুনিয়ার সব মানুষের লাইগা সময় পাও। খালি আমার দিকে একবার তাকানোর লাইগা পাঁচটা মিনিট তোমার হাতে থাকে না।’
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কিছু কিছু অপরাধের কোনো জবাব হয় না, শুধু স্বীকার করা যায়। তার হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরলাম।
জিনিয়াকে তুলে দিতে তিনজনই স্টেশনে গেলাম। ট্রেন ছাড়ার আগে মেয়েটা আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে হাত চেপে ধরল। ‘আব্বু, আম্মু কিন্তু খুব একলা। অন্তত এখন উনার দিকে একটু তাকাইও।’
মেয়ের মুখে সেই কথা, যা তার মা বিশ বছর ধরে বলতে চেয়েছে কিন্তু বলেনি। চোখের জল চেপে হাসলাম। ‘তোর বাপের এতদিনে আক্কেল হইছে রে মা।’
ট্রেন ছাড়ল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ হাত নাড়ছি। বিশ বছর আগে যে দুজন একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা যেন আবার নতুন করে স্টেশনে দাঁড়িয়েছে। ফেরার পথে বললাম, ‘চলো, মোড়ের ওই টং দোকানে বইসা এক কাপ চা খাই।’
‘রাস্তার মোড়ে বইসা চা খামু? মাইনষে কী কইব?’
‘কউক। বিশ বছর পর বউরে লইয়া চা খাইতে বাইর হইছি। এতে লজ্জার কিছু নাই।’
নড়বড়ে কাঠের বেঞ্চিতে বসে আমরা এক কাপ চা ভাগ করে খেলাম। কেতলির ধোঁয়া উঠছে, রাস্তায় রিকশার টুংটাং, আর সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় জুমনের চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু চিকচিক করছে।
সে কাঁদল না। বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল। বিয়ের প্রথম বছরের সেই হাসি, যা আমি ভেবেছিলাম তিতাসের জলে চিরকালের মতো ডুবে গেছে।
