গোলাম মোস্তফার কাব্যপরিসর
Advertisement
অয়ন আহমেদ
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামি ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুভূতি, নৈতিক আদর্শ ও মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষার সাহিত্যিক রূপায়ণের মধ্যদিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন কবি গোলাম মোস্তফা। সহজ ও শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি তার কবিতাকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। নওয়াব আবদুল লতিফ কর্তৃক কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি যে মুসলিম রেনেসাঁর সলতে উসকে দিয়েছিল তারই এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার বহন করেছেন কবি গোলাম মোস্তফা।
গোলাম মোস্তফার সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার গভীর ধর্মীয় চেতনা। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবন, ইসলামের নৈতিক আদর্শ এবং আত্মশুদ্ধির ধারণা তার রচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার ‘বিশ্বনবী’ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ধর্মীয় আদর্শকে তিনি মানুষের নৈতিক উন্নতি, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, দয়া ও আত্মত্যাগের মূলমন্ত্র করে তুলেছিলেন।
তবে এখানেই তার সাহিত্যের একটি সীমাবদ্ধতাও দেখা যায়। ধর্মীয় আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে অনেক সময় তার রচনায় শিল্পের স্বাতন্ত্র্য ও বহুমাত্রিকতার চেয়ে বক্তব্যের গুরুত্ব অধিক হয়ে ওঠে। ফলে কিছু রচনা কবিতা হিসাবে যতটা শিল্পসফল, তার চেয়ে নৈতিক বা ধর্মীয় বক্তব্যের বাহক হিসাবে বেশি কার্যকর। আধুনিক কবিতার বহুরৈখিকতা, দ্ব্যর্থতা ও অন্তর্গত প্রশ্নমুখরতা গোলাম মোস্তফার রচনায় তুলনামূলকভাবে কম।
গোলাম মোস্তফার সাহিত্যকে মানবিক মূল্যবোধের সাহিত্য বলা যায়। কিন্তু তার মানবতাবাদ মূলত ধর্মীয় নৈতিকতার ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ মানুষের কল্যাণের কথা বললেও সেই কল্যাণের আদর্শিক কাঠামো তিনি ইসলামি জীবনদর্শনের মধ্যেই খুঁজেছেন। তার কাছে সঠিক জীবনযাপনের একটি সুস্পষ্ট নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে। ফলে তার সাহিত্য পাঠককে গভীর নৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানোর পাশাপাশি অনেক সময় সেই প্রশ্নের উত্তরও আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেয়।
‘বিশ্বনবী’ গোলাম মোস্তফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এর বড় শক্তি হলো, তিনি ধর্মীয় ইতিহাসকে আবেগ, কাহিনি ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে সাধারণ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। মহানবীর জীবনকে তিনি শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে নয়, আদর্শ মানবজীবনের দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। গ্রন্থটি নিছক সাহিত্যিক অনুসন্ধান নয়; এর মধ্যে আদর্শ প্রচারের অভিপ্রায়ও লক্ষযোগ্য।
গোলাম মোস্তফার ভাষার একটি বড় শক্তি হলো তার সরলতা ও আবেগপ্রবণতা। তিনি দুর্বোধ্য প্রতীক বা অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতার আশ্রয় না নিয়ে সহজ ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার তার কাব্যভাষায় স্বকীয়তা যোগ করেছে।
কিন্তু এ সরলতাই কখনো কখনো তার কাব্যের সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার অনেক কবিতায় বক্তব্য এতটাই প্রত্যক্ষ যে, পাঠকের জন্য ব্যাখ্যার অবকাশ কমে যায়। আধুনিক কবিতার শক্তি যেখানে অনেক সময় নিহিত থাকে ইঙ্গিত, প্রতীক, নীরবতা ও বহুবিধ অর্থের সম্ভাবনায়, গোলাম মোস্তফার কবিতায় সেখানে সরাসরি বক্তব্য ও আবেগ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
গোলাম মোস্তফাকে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তুলনা করা হয়, বিশেষত ইসলামি ঐতিহ্য ও মুসলিম সাংস্কৃতিক চেতনার ব্যবহারের কারণে। কিন্তু তাদের সাহিত্যিক প্রবণতা মূলত ভিন্নমুখী। নজরুল ইসলামি ঐতিহ্যকে ব্যবহার করেছেন বিদ্রোহ, সাম্য, মানবমুক্তি ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি হিসাবে। গোলাম মোস্তফার ক্ষেত্রে ইসলামী ঐতিহ্য অধিকতর নৈতিক শৃঙ্খলা, আত্মশুদ্ধি ও আদর্শ জীবন নির্মাণের ভিত্তি। অর্থাৎ নজরুলের ইসলামি চেতনায় বিদ্রোহের শক্তি প্রবল, আর গোলাম মোস্তফার ইসলামি চেতনায় নৈতিক ও আদর্শিক শৃঙ্খলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কবিতার নান্দনিক বিবর্তনে নজরুলের অভিঘাত যে তুলনামূলকভাবে অধিক ব্যাপক ও বহুমাত্রিক, সেটি অনস্বীকার্য।
গোলাম মোস্তফার সাহিত্যকে তার সময়ের সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করা কঠিন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজের মধ্যে আত্মপরিচয়, ধর্মীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তার সাহিত্য সেই ঐতিহাসিক চাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে তার সাহিত্যকে শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ হিসাবে দেখলে তার সামাজিক তাৎপর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। তিনি বাংলা ভাষার সাহিত্যিক পরিসরে মুসলিম ঐতিহ্য ও ইসলামি জীবনবোধের একটি শক্তিশালী জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। তবে একইসঙ্গে এ কথাও বলা বাহুল্য যে, এ আত্মপরিচয় নির্মাণের সাহিত্যিক প্রয়াস সবসময় বৃহত্তর সামাজিক বৈচিত্র্য বা ব্যক্তিসত্তার জটিলতা সমানভাবে ধারণ করেনি। ফলে তার সাহিত্য একইসঙ্গে আত্মপরিচয় নির্মাণের দলিল এবং নির্দিষ্ট আদর্শিক অবস্থানের বয়ান-দুভাবেই পড়া যায়।
পরিণত বয়সে তিনি কবি মিলটনের অনুসরণে বণি আদম নামে একটি মহাকাব্য লেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা শেষ করতে পারেননি। সাহিত্যের বিচিত্র শাখা তার অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। নানা ছন্দের প্রবর্তন করেছেন তিনি। শিশু-কিশোরদের উপযোগী তার কিছু লেখা এখনো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘কিশোর’, ‘প্রার্থনা’, ‘শিশুর পণ’, ‘বনভোজন’ প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যায়। ‘কিশোর’ কবিতার কয়েকটি চরণ প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠেছে-‘ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে/ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ কিংবা ‘শিশুর পণ’ কবিতায় কবি বলেন,‘এই করিনু পণ/মোরা এই করিনু পণ/ফুলের মতো গড়ব মোরা/মোদের এই জীবন।’ কবিতাগুলো শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বাংলা ভাষায় ইসলামি ঐতিহ্য, নবীপ্রেম, নৈতিক আদর্শ এবং মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় সাহিত্যিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গোলাম মোস্তফার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তার সাহিত্য যেমন ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শক্তিশালী প্রকাশ, তেমনি অতিরিক্ত বক্তব্যনির্ভরতা, আদর্শিক পূর্বনির্ধারণ এবং কাব্যিক বহুমাত্রিকতার সীমাবদ্ধতারও পরিচায়ক।
তার সাহিত্য বাংলা মুসলিম মানসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। গোলাম মোস্তফা রেনেসাঁর চেতনায় প্রভাবিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে যে ইসলামি মানবতাবোধের ভাবপ্রবাহ জন্ম দিয়েছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় উত্থান ঘটেছে ‘সাত সাগরের মাঝি’র স্রষ্টা ফররুখ আহমদের। গোলাম মোস্তফা তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
