ধ্রুপদি ঐতিহ্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অ্যান কার্সন
মানুষের ভেতর সত্যের আলো প্রতিদিন নতুন রঙে প্রতিবিম্বিত হয় -অ্যান কার্সন
Advertisement
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে এক অনন্য ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের নামে-কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সন। সুইডিশ একাডেমি তার সাহিত্যকর্মকে অভিনন্দিত করতে গিয়ে বলেছে, তার সাহসী ও উদ্ভাবনী রচনাসম্ভার ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক কৌতুকপূর্ণ অথচ গভীর সংলাপে লিপ্ত হয়ে সমকালীন সাহিত্যের সামনে নতুন রূপ ও দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
১৯৫০ সালে টরন্টোয় জন্ম নেওয়া কার্সন এমন এক বিরল স্রষ্টা, যার কলম কবিতা, গদ্য এবং অনুবাদের প্রাচীরগুলো নিমেষেই গুঁড়িয়ে দেয়। তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণের অতল থেকে মণিমুক্তো তুলে এনে আধুনিক মানুষের জটিল মনস্তত্ত্বের ক্যানভাসে সাজিয়ে দেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’-যেখানে প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্য ও মানবীয় কামনার বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বকে এক বিস্ময়কর সাহিত্যিক মূল্যায়নে তুলে ধরা হয়েছিল। এরপর ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার সর্বাধিক আলোচিত পদ্য-উপন্যাস ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। প্রাচীন গ্রিক কবি স্তেসিকোরোসের খণ্ডাংশের অনুপ্রেরণায় হেরাক্লিসের হাতে নিহত ডানাওয়ালা রক্তবর্ণ দানব গেরিয়নের রূপকথাকে তিনি রূপান্তর করেছিলেন এক আধুনিক কিশোরের প্রেম, হৃদয়ভঙ্গ ও আত্মানুসন্ধানের মর্মস্পর্শী আখ্যানে।
২০০১ সালে ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম নারী হিসাবে তিনি টিএস এলিয়ট পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১০ সালে ভাইয়ের প্রয়াণবেদনা নিয়ে তৈরি তার ‘নক্স’ (ঘড়ি) গ্রন্থটি কেবল কোনো গ্রন্থ নয়, বরং অ্যাকর্ডিয়ন-ভাঁজের এক বাক্সে রাখা পাণ্ডুলিপি ও স্মৃতির কোলাজ। লার্সলো ক্রাসনাহোরকাই, আনি এরনো, বব ডিলান, লুইস গ্লিক ও ওলগা তোকারচুকের পর ৭৬ বছর বয়সি কার্সনের হাতে নোবেলের এই অভিষেক যেন আধুনিক ধ্রুপদি চেতনারই এক মধুর উদযাপন। তার সৃষ্টি ‘রং নরমা’ (Wrong Norma) এবং তার শিল্পভাবনা নিয়ে নেওয়া প্যারিস রিভিউ-এর দীর্ঘ, অন্তরঙ্গ ও বহুমাত্রিক সাক্ষাৎকারটি এখানে এক গভীর সাহিত্যিক অবয়বে রূপান্তরিত হলো।
আপনার গ্রন্থ ‘রং নরমা’-র নামের সঙ্গে যে ‘ভুল’ (Wrong) শব্দটি জড়িয়ে আছে, তার পেছনের ভাবনাটি জানতে চাই
: লোকে যখন জানতে চায় আমেরিকান আর কানাডিয়ানদের পার্থক্য কোথায়, আমি মৃদু হেসে বলি-কানাডিয়ানদের একটাই বিশেষ স্বভাব : তারা অত্যন্ত বিনম্র, কিন্তু সব সময় ‘ভুল’। এই ভুল থেকেই হয়তো গ্রন্থটির নামের সূচনা। তবে এর আরেকটা গভীর স্তর আছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক জীবনে আপনি প্রতিমুহূর্তে এক অদৃশ্য আতঙ্কে ভোগেন-এই বুঝি আপনি ভুল করে বসলেন! সেখানে সবকিছুই এক কঠোর বিচার ও শ্রেণিবিন্যাসে বাঁধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী পদ পাওয়ার শর্তই যেন হয়ে ওঠে, প্রতিবার কথা বলার সময় কোনোভাবেই ভুল প্রমাণিত না হওয়া। আমি চেয়েছিলাম এই সংকীর্ণ ও ভীতিকর মানসিকতাকে পুরোপুরি অচল করে দিতে। দার্শনিক সিমোন ভেইল তার এক প্রবন্ধে স্ববিরোধিতা নিয়ে অপূর্ব কথা বলেছেন। দর্শনের পাঠে মানুষ যখন স্ববিরোধিতার মুখোমুখি হয়, তখন দিশেহারা বোধ করে; অথচ ভেইল এই স্ববিরোধিতা উদযাপনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি বলতেন, স্ববিরোধিতা মানুষের মনের ভেতর এক পরম উপকারী আলোড়ন তোলে। কারণ, তা আমাদের অনমনীয় মনকে আলগা করে দেয়, বন্ধনমুক্ত করে। আর মন যখন একবার শিথিল হতে শেখে, তখন সে গভীরতর, প্রশস্ততর সত্যের সন্ধান পায়-যে সত্য এতক্ষণ আমাদের চেনা স্তরের নিচে নিঃশব্দে শুয়ে ছিল। ভুলের এই যে অধিকার, এই ভুল হওয়াই আসলে মনের জানালাকে এমনভাবে খুলে দেয় যাতে সেখানে নতুন হাওয়া এসে লাগে। মানুষ তো কোনো স্থির প্রতিমা নয়, সে এক বহুরূপী প্রিজম; তার ভেতর সত্যের আলো প্রতিদিন নতুন রঙে প্রতিবিম্বিত হয়।
‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা বলি প্রেমিক বা বন্ধুরা নাকি একই ভাষায় কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে কি তাই? সম্পর্কের ভেতরেও কি প্রতিনিয়ত এক অনুবাদের চেষ্টা চলে না?
: সত্যি বলতে কী, মানুষ যখন কথা বলে, অপরজন তার ভেতরের সঠিক অর্থটি কতটুকু বোঝে-তা নিয়ে আমার প্রবল সংশয় রয়েছে। একে নিছক ‘অনুবাদ’ বলাও হয়তো এক ধরনের কোমল সান্ত্বনা। সম্পর্কের ভাষা আসলে নিজেকে অতল অন্ধকারের মধ্যে ছুড়ে দেওয়ার মতো এক নিঃসঙ্গ অভিযাত্রা। মানুষের ভাষা অত্যন্ত ব্যক্তিগত, গোপন ও অদ্ভুত। প্রতিটি বাক্যের মাধ্যমে এই যে পরস্পরের কাছে পৌঁছনোর আর্তি, তা মূলত মানবজীবনের সেই আদিম অসহায়ত্বকে অতিক্রম করারই এক আজীবন সংগ্রাম।
অনুবাদক হিসাবে যখন আপনি মূল রচনা এবং অনূদিত পাঠের মাঝখানে দাঁড়ান-সেই শূন্যস্থানটি কেমন অনুভব হয়?
: আমার কাছে সেই স্থানটিকে মনে হয় দুটো পথ বা দুটো দেশের মাঝখানে পড়ে থাকা এক গভীর পরিখা। অনুবাদকের মনের পর্দাটি এক অদ্ভুত দোলাচলে দোলে-সেখানে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ভাষা পাশাপাশি ভাসতে থাকে। তারা একই কথা বলছে; কিন্তু তাদের ভাব সম্পূর্ণ এক নয়। এমিলি ডিকিনসন এই পরিখাটিকে ব্যবহার করেছিলেন নিজের ভাষার ভেতরেই। তিনি অন্য ভাষা অনুবাদ করেননি, তিনি অনুবাদ করেছিলেন নিজেকে। কোনো পঙ্?ক্তি লিখে শব্দ কেটে দিতেন, পাশে নতুন শব্দ বসাতেন, কিংবা পাতার উলটো পিঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ দাঁড় করাতেন। এই দোলাচল, এই অসম্পূর্ণ ও অমীমাংসিত রূপই তার কবিতার পরম সত্তা।
প্রাচীন গ্রিক কবিতা অনুবাদের সময়ও ঠিক এমনটাই ঘটে। মূল পাঠে হয়তো ব্যাকরণগত ভুল আছে, আর নিচে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন পণ্ডিতদের বিভিন্ন পাঠান্তর বা ব্যাখ্যা। এসব সম্ভাবনা যখন মনের মধ্যে একসঙ্গে দোলা দেয়, তখন মনে হয়-কবি আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন তার এক অলৌকিক সম্ভাবনা ভেসে বেড়াচ্ছে। গ্রন্থের ছাপা অক্ষরে বা কম্পিউটারের কৃত্রিম লিংকে এই অনুভূতির গভীরতা ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। এটি এক নীরব, অপ্রকাশ্য ও ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতা।
কোনো কিছু যখন একদম শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন, সেই অনুভূতি কেমন?
: সৃষ্টির মুহূর্তটি মনের দরজায় হঠাৎ এসে দাঁড়ায় এক অচেনা অতিথির মতো। অনেকটা যেন আপনার উঠোন দিয়ে হঠাৎ একটা বুনো শিয়াল দৌড়ে চলে গেল, আর আপনি তার পদচিহ্ন ধরে হাঁটতে শুরু করলেন-দেখি তো শেয়ালটা কোথায় গিয়ে থামে! ‘রং নরমা’-র শেয়ালটিও তেমনই এক বিস্ময়। আইসল্যান্ডীয় শিল্পী রাগনার কিয়ারতানসনের কাজের জন্য নোট লেখার সময় আনমনে আঁকিবুঁকি করছিলাম। হঠাৎ ছবির ভেতর একটি শিয়ালের মুখ ফুটে উঠল। ছবিটি এতটাই প্রাণবন্ত ছিল যে আমি ভাবলাম, একে কোথাও স্থান দিতেই হবে। এভাবেই অযাচিত সৌন্দর্য সৃষ্টিতে জায়গা করে নেয়।
আপনার সৃজনশীলতার সবচেয়ে নিবিড় মুহূর্তগুলোয় কীভাবে প্রবেশ করেন?
: অনেক সময় আমার লেখার শুরুটা হয় কেবল দিনের আলোর রূপটি কেমন, তা দেখার মধ্য দিয়ে। আমার মনে হয়, আলোর সঙ্গে আমার এক অলিখিত ও নিঃশব্দ চুক্তি রয়েছে। এই ব্যক্তিগত নোটবুকে, যা কোনোদিন কেউ পড়বে না-আমাকে ঠিকঠাক শব্দ দিয়ে লিখে রাখতে হবে আজকের আলোটি ঠিক কেমন ছিল। কেন এই চুক্তি বা কোথা থেকে এর জন্ম, আমি জানি না। কিন্তু এই আলোটুকুকে স্পর্শ করার পরই বাকি সব কিছু আসে-মায়ের স্মৃতি, রাতের খাবার, কিংবা মার্সেল প্রুস্তের অনুবাদের দর্শন। কিন্তু আলোর বন্দনা শেষ হতেই যেন লেখার আসল অধ্যায়টি ফুরিয়ে যায়। আলোই ছিল সবকিছুর প্রাণভোমরা।
আপনার লেখায় কি কোনো অলৌকিক পূর্বাভাস বা মৃত্যুর ইঙ্গিত প্রায়ই আসে?
: গ্রিক পুরাণে হার্মিস দেবতাকে বলা হতো ‘সাইকোপম্প’, যিনি মৃত্যুর মুহূর্তে এসে আত্মাকে পরলোকের ওপারে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। একবার মিশিগানের জনমানবহীন প্রান্তরে আমার স্বামী কারি এবং আমি তার বাবার শেষকৃত্যে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম পথের ধারে পরিপাটি নীল স্যুট পরা এক আগন্তুক দাঁড়িয়ে। অদ্ভুতভাবে তার শরীর থেকে কাঁচা কাপড়ের সুবাস বের হচ্ছিল। তিনি কথা বলতে চাননি, শুধু একটি নির্জন লাইব্রেরিতে নামিয়ে দিতে বলেছিলেন। পরে জানলাম, ঠিক সেই দিনেই কারির বাবা দেহত্যাগ করেছিলেন। সেই অচেনা মানুষটি যেন পরলোকেরই এক নিঃশব্দ বার্তাবাহক ছিলেন। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে বারবার আসে না; কিন্তু এলে তা চিরতরে দাগ কেটে যায়।
লেখার বাইরের কোনো অভ্যাস কি আপনার সাহিত্যকে রসদ জোগায়?
: ছবি আঁকা, ঘরদোর গুছিয়ে রাখা আর সাঁতার। সাঁতার আমাকে অবসাদ ও তিক্ততা থেকে মুক্ত রাখে। পানির স্পর্শ মনের মেঘগুলো ধুয়ে দেয়। অনেকে পানির সান্নিধ্য ছাড়া বাঁচতেই পারে না, আমিও তাদের একজন। পুলের পানিতে ভাসতে ভাসতে অনেক সময় আশ্চর্য সব চিন্তা আসে, যদিও ডাঙায় উঠে লিখে রাখতে গেলে দেখা যায় তা স্বপ্নের মতোই অর্থহীন হয়ে মিলিয়ে গেছে।
আপনি এবং কারি বহু বছর জন কেজের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টিশীলতার ক্লাস নিয়েছেন। সেখানে অহংবোধ মুছে ফেলার কথা বলা হতো...
: লেখকদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো তারা নিজেদের স্মৃতির ভান্ডার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেন-যাকে তারা বলেন ‘আত্মজীবনী’। এরপর সারা জীবন তারই পুনরাবৃত্তি করে চলেন। এই অহংবোধের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হওয়া সাহিত্যের জন্য পরম জরুরি। তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক ‘ক্রাফট’ বা কাঠামোর চেয়ে সত্যের গভীরে অবগাহন করাই সৃষ্টির আসল ধর্ম।
আধুনিক জগতে আমাদের মনোযোগ কি ক্ষয়ে যাচ্ছে? আপনি কি চিন্তার জগতে কোনো বিচ্যুতি লক্ষ করেন?
: প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখার সময় আমাদের প্রতিটি অপরিচিত শব্দের জন্য ধীরলয়ে ভারী লেক্সিকন বা অভিধানের পাতা ওলটাতে হতো। সেই সময়টিতে মনের ভেতর চিন্তার এক মিষ্টি মগ্নতা তৈরি হতো-আমরা শব্দের অর্থ পুরোপুরি জানি না, আবার একেবারেই যে জানি না, তাও নয়। এই মধ্যবর্তী অপেক্ষার ক্ষণটিকে আমি বলি ‘দ্বিধা’ (Hesitation)।
আজকের দিনে মানুষ কম্পিউটারের বোতাম টিপেই মুহূর্তের মধ্যে অর্থ পেয়ে যায়। যন্ত্র তাকে প্রসঙ্গের সবচেয়ে উপযোগী অর্থটি ছুড়ে দেয়; কিন্তু শব্দের আদি ইতিহাস এবং তার রূপক অর্থের সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর অবকাশটুকু কেড়ে নেয়। এই যে দ্বিধার ক্ষণটি হারিয়ে গেল, তা ভাষাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দিয়েছে। এটি ছিল বিশ্বাসের এক প্রশান্ত বিরতি, যার অপমৃত্যুতে আমি গভীর বেদনা অনুভব করি।
আপনি কি মনে করেন আমাদের সময়ের অনুভব মনোযোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
: আমরা আসলে প্রতিনিয়ত সময়কে থামিয়ে দেওয়ার পথ খুঁজি। গভীর মনোযোগের মুহূর্তেই কেবল সময় থমকে দাঁড়ায়, তা নেটফ্লিক্সে কোনো চলচ্চিত্র দেখার সময়ই হোক কিংবা নিজের সেরা কবিতাটি রচনার মুহূর্তেই হোক। মানুষ যখন এমন এক তীব্র নিমগ্নতায় প্রবেশ করে, তখন সে সময়ের সীমানা ভুলে যায়। কারণ, সময় যদি না থামে, তবে জীবন কেবল একঘেয়েমি আর ক্লান্তিকর বিষাদে ঢেকে যায়।
সূত্র : দ্য প্যারিস রিভিউ ।। ভাবানুবাদ : মেজবাহ উদ্দিন
