Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০

মানভাষা গণভাষা

Advertisement

Icon

সালেহ মাহমুদ রিয়াদ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

পৃথিবীর বহুদেশের মানভাষা বা জনমান্য-ভাষা রাজধানীর ভাষা ধরিয়া নির্ধারিত হয় নাই। কোথাও এইরূপ হইয়া থাকিলে তাহা ওই দেশটির রাজধানীর ভাষা বলিয়াই হইয়াছে- এমন নহে। প্রকৃতপ্রস্তাবে, এইরূপ ধারণা ভাষাতত্ত্ব ও জনসংস্কৃতি- কোন দিক হইতেই সম্ভব নহে। রাজধানীর ভাষা বলিয়া আদৌ কোন ভাষা আছে কিনা- আমাদের জানা নাই। কলিকাতা রাজধানী থাকিবার সুবাদে যদি ‘জাতীয়’ ভাষা হইবার জন্য গোঁ ধরিয়া থাকে তবে ঢাকা রাজধানী হইয়া কেন একই গোঁ ধরিবে না? উত্থান-পতন মিলিয়া ঢাকা রাজধানীরূপে কলিকাতা হইতে বহু প্রাচীন। আমরা রাজনৈতিক ইতিহাসের সূত্র ধরিয়া ভাষা-ইতিহাসের রূপরেখা গড়িয়া তুলিলে তাহা ইতিহাস বা ভাষা- কাহারও জন্য সুসংবাদ বহন করিবে না।

এখানে একটি তথ্য জানাইয়া রাখা যাইতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জনৈক যশস্বী মনীষী ঢাকার ভাষাকে মানভাষা তথা জাতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁহার বাসনা ফলবতী হয় নাই। ইহা কীরূপে সম্ভব! ঢাকা হইলে চট্টগ্রাম তাহা মানিবে কেন! সিলেট কীভাবে গ্রহণ করিবে! বরিশাল তো অগ্রাহ্য করিতেই পারে। প্রায়-সমগ্র উত্তরাঞ্চল উদাসীন অবহেলা করিলে বলিবার কিছু নাই। সুতরাং, ঢাকা গৃহীত হইবার কোন সম্ভাবনা নাই, কারণও নাই। কথিত রাজধানীমগ্ন প্রত্যাশাকারীও তাহা জানিতেন। আর রাজধানী হইলেই সেই স্থানের ভাষা সারা দেশবাসীর জন্য আবশ্যক করিয়া তুলিতে হইবে- এইরূপ প্রথার কথা কে কবে কোথায় শুনিয়াছে!

অতঃপর এই অপরিহার্য স্বাভাবিক প্রশ্ন আসিবে: তবে কি একটি দেশ, রাষ্ট্র বা জাতির সকলের পক্ষে আদরণীয় ও পালনীয় একটি অভিন্ন ভাষারূপ থাকিবে না? নিশ্চয়ই থাকিবে; না থাকিলে সমগ্র দেশ কীভাবে মিলিত হইবে, তাহাদের ‘একক’ হইয়া উঠিবার উপায়ই বা কী হইবে? আবার যদি জাতীয় সংহতি, ঐক্য, সংস্কৃতি- এইসব মানসিক মহামিলনের প্রশ্ন আসিয়া উপস্থিত হয়, উহারই বা কী উপায় হইবে? এ-সকল বড় গুরুতর প্রশ্ন; আমরা এমন একটি অনিবার্য ও তাৎপর্যপূর্ণ জিজ্ঞাসার উত্তর পাইবার জন্য বীরেশ্বর সেন মহাশয়ের দ্বারস্থ হইলাম:

‘প্রত্যেক বস্তুরই একটি প্রাণ বা আত্মা (vital principal) আছে, তাহা তত্ত্বদর্শীগণই উপলব্ধি করিতে পারেন। এই প্রাণই আইডিয়া। একজন তত্ত্বদর্শী শিল্পী একজন সাধারণ লোকের প্রতিকৃতি এমনভাবে অঙ্কিত করিতে পারেন যে, প্রতিকৃতি দেখিলেই সেই লোকটি বলিয়া চিনিতে পারা যায়, অথচ সেই লোকটিতে সে সৌন্দর্য মোটেই ছিল না, প্রতিকৃতিতে সেই সৌন্দর্য থাকে। এই প্রতিকৃতিই সেই লোকটির আইডিয়াল মূর্তি। বাঙ্গলা ভাষার যতগুলি উপবিভাগ আছে সে, সকলগুলি দেখিয়া ও পরীক্ষা করিয়াই যেন আমাদের জাতীয় প্রতিভা আমাদের সাধুভাষা রূপ আইডিয়াল ভাষা প্রস্তুত করিয়াছে। প্লেটো বলেন, স্বর্গে একটা আইডিয়াল ত্রিভূজ আছে, যাহা সমবাহুও নহে, সমদ্বিবাহুও নহে, অসম বাহুও নহে, সমকোণও নহে, অসম কোণও নহে। আমাদের সাধুভাষাও সেইরূপ;- বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুরেরও নহে, কলিকাতা, হুগলী, বারাসাতেরও নহে, ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহেরও নহে, শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরাও নহে, রঙ্গপুর, দিনাজপুর, কুচবিহার, গোআলপাড়া, কামরূপেরও নহে, নদীয়া, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, মালদহেরও নহে। যে-যে জেলাগুলির নাম করিলাম সেইগুলিতে এবং বঙ্গের অন্যান্য জেলায় পৃথক পৃথক প্রাদেশিক ভাষা প্রচলিত। এই সমস্ত প্রাদেশিক ভাষা এতই বিভিন্ন যে, কলিকাতার লোকে কুচবিহার, রঙ্গপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম, শ্রীহট্ট প্রভৃতি স্থানের লোকের একটি কথাও বুঝিতে পারে না। অথচ প্রত্যেক প্রাদেশিক ভাষা হইতে সাধুভাষার বিভিন্নতা অতি অল্প। সুতরাং সমস্ত বঙ্গে কোন এক ভাষার প্রচলন করিতে হইলে সাধুভাষারই প্রচলন হওয়া উচিত। যে দেশে যত প্রাদেশিক ভাষা বা উপভাষা প্রচলিত সে দেশে সেই অনুপাতে একতার অভাব। সুতরাং এই অভাব দূর করিবার জন্যও দেশমধ্যে যতদূর সম্ভব এক ভাষা প্রচলিত করিতে চেষ্টা করা উচিত। এই চেষ্টার ফলে সকল প্রদেশেরই উপভাষা ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইবে। উপভাষার উচ্ছেদ করা সুশিক্ষার একটা উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। মার্জিত ভাষাই শিক্ষিত ব্যক্তিকে পূত ও বিভূষিত করে। আমাদের সাধুভাষাই আমাদের মার্জিত ভাষা। সৌন্দর্যে, লালিত্যে, ভব্যতায়, গাম্ভীর্যে ও সুগমতায় বঙ্গের কোন উপভাষাই সাধুভাষার সমকক্ষ নহে’। (বাঙ্গলা সাধুভাষা)

বীরেশ্বর সেন একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলিয়াছেন। তিনি সাধুভাষাকে ‘আমাদের জাতীয় প্রতিভা’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এইরূপ শনাক্তকরণ আজ অবধি কেহ করিতে পারেন নাই। ইহাতে আমরা আন্তরিক শ্লাঘা অনুভব করি। এমনও হইতে পারে, কেহ বলিতে অজ্ঞাত কুণ্ঠাবোধ করিয়াছেন; পাছে তাঁহাদের স্ব-প্রযোজিত ও স্ব-আরোপিত ‘ঐতিহ্যের’ শরীর মলিন হইয়া উঠে। আমরা তাঁহাদের অবস্থান ও মননের সমালোচনা করি না। সমগ্র বঙ্গভাষীর জাতীয় সম্পদ নিয়া নীরবতা অবলম্বন এবং সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা ও গৃহকাতরতা নিয়া কেহ মুগ্ধ হইয়া থাকিলে আমাদের কিছু বলিবার নাই। কেহ কেহ আবার বেশ জাঁক করিয়া সাধুভাষাকে ‘অস্বাভাবিক বা কৃত্রিম বস্তু’ বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছেন। সেন মহাশয় এই ধারণার বিরোধিতা করিয়া স্পষ্টভাবে বলিলেন যে, সভ্যতার নামান্তরই কৃত্রিমতা। তাজমহলের বহু পরিমাণে কৃত্রিমতা আছে বলিয়াই তাহার এত আদর এবং এতকাল স্থায়ী হইয়া আছে। সংস্কৃতভাষার গৌরবও উহার কৃত্রিমতার জন্য।

সেন মহাশয় ‘উপভাষা উচ্ছেদ’ করিবার যে প্রস্তাব দিয়াছেন- আমরা উহা সমর্থন করিতে পারি না। তিনি, যতদূর অনুমান করি, একটি একক ও সামগ্রিক ভাষারীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়া সমগ্র বাঙলাভাষীর ভিতর জাতীয় ঐক্য গড়িয়া তুলিবার আশায় এমন প্রস্তাব দিয়াছেন। আমরা উচ্ছেদতত্ত্বে বিশ্বাস করি না।

সাধুরীতি সকলের। সমগ্র বঙ্গ ভূভাগ জুড়িয়া উহার অবস্থান ও অধিকার। কেহ আসিয়া বলিতে পারিবে না-ওহে, ইহা আমার ভাষা, তোমার ইহাতে অংশ নাই, তোমাকে আমরা আহ্বান করি নাই। টেকনাফ হইতে পুরুলিয়া হইয়া জলপাইগুড়ি পর্যন্ত সকলেই বলিবে সাধুভাষা তাহাদের ভাষা। এইখানে দল করিয়া সুবিধা নাই, গোল করিয়া প্রাপ্তি নাই, গোষ্ঠী গড়িলে ক্ষুদ্র হইবে, আলাদা হইলে লুপ্ত হইবে। সিংহ, ঠাকুর, চৌধুরিগণও ইহা পরিত্যাগ করিয়া বুক ঠুকিয়া বলিতে পারিবেন না- আমরা সাধু ছাড়িয়া দিলাম চিরতরে। তাঁহাদের ঘরের লোকের সহিত কথা-বার্তা বলিতে তো কেহ আপত্তি করে নাই। তাঁহারা চাহিলে ঘরে সুপ্রাচীন আরমাইক ভাষাতেও কথা বলিতে পারেন; তাই বলিয়া বাপু আমি সিলেটের মানুষ হইয়া তোমাদের ঘরের ভাষায় কথা কহিতে পারিব না; শুনিবারও কোন বাসনা আমার নাই। অবস্থা এমন ‘বিপ্লবাত্মক’ হইয়া উঠিলে কাহারও কিছু বলিবার নাই।

তুলামূলকভাবে ‘প্রায়-আধুনিক’ কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের ভাষারীতি বিষয়ে কীরূপ ধারণা, তাহা এ-স্থলে আলোচনা করা আশা করি অ-প্রাসঙ্গিক হইবে না। মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী, সৈয়দ এমদাদ আলী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ মুসলিম সাহিত্যিক বাঙলাভাষার রূপভেদ নিয়া গভীরভাবে চিন্তা করিয়াছেন। শিল্প-সাহিত্য লইয়া তাঁহারা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন বলিয়া কেহ কেহ মতপ্রকাশ করিলেও (ইহা অতি অবশ্যই একটি সংকীর্ণ ধারণা) বাঙলাভাষা-প্রশ্নে তাঁহারা প্রায়-সকলেই বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে কোন দ্বিধা করেন নাই। তাঁহাদের কাঁহারও কাঁহারও কণ্ঠে আমরা বীরেশ্বর সেনের অবিকল প্রতিধ্বনি শুনিতে পাই: ‘সকলে জানেন, পশ্চিমবঙ্গের নানা জিলার কথ্য ভাষা নানারূপ। আবার পূর্ববঙ্গ বা উত্তরবঙ্গের কথ্য ভাষার সহিত যেমন পরস্পরের মিল নাই, তেমনি উহার কাহারও সহিত পশ্চিমবঙ্গের কথ্য ভাষারও মিল নাই। কিন্তু এই প্রভেদকে ডুবাইয়া দিয়া বাঙ্গালীর জন্য যে এক সাধারণ ভাষার সৃষ্টি হইয়াছে, তাহাই লেখ্য ভাষা নামে পরিচিত হইয়াছে। এই লেখ্য ভাষাকে বর্জন করিয়া কথ্য ভাষার প্রচলন করিতে গেলে বাংলার অধিবাসীকে বহুধা বিভক্ত করিয়া দিতে হয়। আমাদের প্রতিপক্ষগণ হয়ত বলিবেন, লেখ্য ভাষাকে কথ্য ভাষার অর্থাৎ কলিকাতার কথ্য ভাষার ছাঁচে ঢালিয়া সাজাইলেই সকল গোল মিটিয়া যাইতে পারে। কিন্তু তাঁহারা যখন এ কথাটা বলেন, তখন তাঁহারা climatic influence বলিয়া যে একটা কথা আছে, তাহা ভুলিয়া যান। কথ্য ভাষার ভিতরকার আব-হাওয়ার এই প্রাধান্য তাঁহারা রোধ করিবেন কী করিয়া? দুই চারিজন শিক্ষিত ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের কথ্য ভাষার আবৃত্তি করিলে বা করিতে সক্ষম হইলেই যে উহা দেশের আপামার [আপামর] সাধারণের গ্রহণীয় হইয়া গেল বা তাহারা উহা গ্রহণ করিল, কোনো প্রকারেই একথা বলা যায় না।’ (সৈয়দ এমদাদ আলী: বাংলাভাষা ও মুসলমান)

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হইবার আগে হইতে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হইবার পর হইতে এই রাষ্ট্রের একদল কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক পাকিস্তানের তথাকথিত জাতীয় সংহতি গড়িয়া তুলিবার আকাঙ্ক্ষায় বেশ বড়রকমের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে মাতিয়া উঠেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ ভাষাপ্রশ্নে সম্প্রদায়গত সংশয়পূর্ণ মনোভাবের শিকার হইলেও ভাষারীতি বিষয়ে তাঁহারা কিছুমাত্র আপস করেন নাই। অবশ্য আবুল মনসুর আহমদ একদা ময়মনসিংহ এবং ঢাকার কথ্যভাষাকে জাতীয় মান্যভাষা বা লেখ্যভাষা হিশাবে গ্রহণ করিবার প্রস্তাব তোলেন। ইহা যেন সেই প্রমথ চৌধুরীর ‘ঘরের লোকের সঙ্গে কথা-বার্তা’ কহিবার অবিকল সুর; তবে তাঁহার ধারণার দিকে বিশেষ কোন সমর্থন জোটে নাই। তিনিও সম্ভবতঃ প্রস্তাবের অসারতা ও সীমাবদ্ধতা বুঝিতে পারিয়া আর অগ্রসর হন নাই।

কম-বেশি বিগত একশত বৎসর ধরিয়া সাধুভাষা ছাড়িয়া দেওয়ার একটা হিড়িক পড়িয়া গিয়াছে। ত্যাগকারীদের একটি দল বলিতে শুরু করেন যে, তাঁহারা যুগধর্মের স্বভাব মানিয়া ত্যাগপন্থার শরণ নিয়াছেন। আমরা তাঁহাদের ‘আধুনিকতার’ প্রতি আনুগত্যের সমালোচনা করিব না; তবে এ-বাবদে কয়েকটি কথা বলিবার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করিলাম। আশা করি, আধুনিকগণ উহা ভাবিয়া দেখিবেন:

১. বঙ্গভাষীদের চিন্তা করিবার ভাষা বাঙলা ভিন্ন অন্যকিছু নহে। জগতের সকল জাতির জন্যই ইহা একটি পাকা কথা। একজন রুশভাষী বাঙলা ভাষায় চিন্তা করিয়া কথাবার্তা বলেন- এমন বিস্ময়কর সংবাদ আজও আমরা পাই নাই। প্রকৃতপক্ষে, সকলেই একান্ত নিজের মাতৃভাষাতেই চিন্তা করেন। তথাকথিত আঞ্চলিক ও উপভাষাসহ আরও যে-সকল আন্তরিক ভাষা আছে, সকলের চিন্তাভাষা তাহাদের নিজস্ব ভাষায়। চলিতরীতি চালু করিয়া বাঙালির চিন্তাপ্রণালিতে একটি হাস্যকর উপদ্রব উপস্থিত করা হইয়াছে। এইরূপ প্রণালির ধাক্কা আমরা প্রায়-সর্বক্ষেত্রে দেখিতেছি। সাধু ছাড়িয়া ‘অসাধু’ হওয়ার ফলে আমাদের কথাবার্তার কোন স্থিরতা নাই, বাক্যের সংগতি বিনষ্ট হইয়াছে। বাক্যের অন্বয় বিপুল বেগে নিজের কক্ষপথ ছাড়িয়া অন্যপথ ধরিয়াছে। কোন কোন আধুনিক সাহিত্য পড়িলে যে-কেহ তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবেন।

২. বিগত ছয়দশক ধরিয়া আমি বাঙলাসাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে ঘুরিয়া ঘুরিয়া লক্ষ করিলাম প্রায় সকলপ্রকার সাহিত্য- সংবাদপত্র হইতে শুরু করিয়া কথিত উচ্চাঙ্গের সাহিত্য পর্যন্ত বাঙলা ভাষারীতির মৌলিক কাঠামো ত্যাগ করিয়াছে। লেখকগণ এতবেশি ইংরাজি সাহিত্য পাঠ করিয়াছেন যে, তাঁহারা বাঙলাভাষায় রচিত সাহিত্য ইংরাজিভাষা-প্রকরণের ছাঁচে ফেলিয়া দিয়াছেন। বাঙলার বাগি¦ধি, বাকরীতি, অন্বয়, বাক্যবিন্যাস ছাড়িয়া তাঁহারা ইংরাজিভাষায় নিজভাষাকে সজ্জিত করিতেছেন। পড়িলে মনে হয় না আমি বাঙলা পড়িতেছি; শুধু মনে হয় ইংরাজিভাষা হুবহু তুলিয়া আনিয়া বা উহা অনুবাদ করিয়া উহার দেহের উপর বাঙলা শব্দগুলি বসাইয়া দেওয়া হইয়াছে। বাঙ্গালি লিখিতভাষায় খুব বড় একটা উঁচুদরের ইংরাজ হইয়াছে। ভাবখানি এইরূপ- চলিতভাষার নিবিড় চর্চা করিলে বড় একটা সুবিধা পাওয়া যায়- যে কেহ মনে চাহিলেই যে-কোন জাতির মনুষ্যরূপে নিজেকে স্থাপন করিতে পারে। ধারণাটি মন্দ নহে; কথাবলা এবং রচনাপ্রকাশের মধ্য দিয়া ‘ইংরাজ’ হইয়া উঠিতে পারিলে আমাকে আর পায় কে! অবশ্য অত্যন্ত হতাশ হইয়া দেখিলাম, প্রায় কেহই ইংরাজের বেশিকিছু হইতে পারেন নাই। আবার যে সাধারণ দরের একটি ‘ইংরাজ’ হইতে পারিতেছে- ইহাও জোর দিয়া বলিতে পারি না।

৩. সাধুভাষায় এমন সুবিধা নাই। এই ভাষা লিখিলে ও বলিলে আমাকে বাঙ্গালি থাকিতে হইবে; কেহ আরব কিংবা ডাচ হইতে চাহিলে তো আমাদের বলিবার কিছু নাই। বাঙ্গালি হিশাবে আত্মপরিচয় দিতে চাহিলে সাধুরীতি ভিন্ন গতি নাই। চলিত লিখিলে কি তবে আমার জাত যাইবে? জাত কতখানি ধসিয়া যাইবে কিংবা কিছুমাত্র টুটিবে না- উহা পরিমাপ করা সহজ নহে; তবে জোর দিয়া বলা যায়, মানসিক জাতের কুলীনভাব কিছুটা নষ্ট হইলে অবাক হইবার কিছু নাই। মনোজাগতিক দাসত্ব বলিয়া একটা প্রবল মতবাদের শিকার হইয়া আমরা যদি চিন্তা-কাঠামোর মৌলিক উপাদান ফেলিয়া দিই, আমাদের জন্য কখনও তাহা সুসংবাদ নহে। সাম্রাজ্যবাদের ছোবলে পড়িয়া পৃথিবীর অসংখ্য সমৃদ্ধ ভাষা চিরতরে বিলীন হইয়া গিয়াছে। আমি সেইসব ভাষাহারা মানুষের ক্রন্দন শুনিয়াছি; আর এখন আমাদেরও একই ক্রন্দনকাল ঘনাইয়া আসিতেছে। প্রায়-সর্বত্র উহার আলামত দেখিতেছি।

৪. চলিতরীতির ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ হইবার ফলে আমাদের দশা কী দাঁড়াইয়াছে, উহার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেওয়া দরকার বলিয়া মনে করি। একটি ‘মৌলিক’ গদ্যরচনার নমুনা: ‘এলেন তিনি, যেখান থেকে কথা ছিল আসার। দুপুরবেলা, যা ছিল বৃষ্টিভেজা’ (গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের পরিচয় বলিব না)। বাক্যটি কি আদৌ বাঙলাভাষার? পাঠক, তুমি ইহার ইংরাজি অনুবাদ করিলে দেখিবে ইহা সর্বাংশে ইংরাজিভাষা। এইরূপ হাজার হাজার উদাহরণ দেখিতে পাই। ইহা দেখিয়া যদি আমরা লজ্জিত না-হই, কুণ্ঠিত না-হই, গ্লানিতে আচ্ছন্ন না-হই- তবে আর কী কহিব!

৫. চলিতরীতি বাক্য-শৃঙ্খলার নিয়মনীতি চুরমার করিয়া দিতে পারে বলিয়া লেখকগণ এমনসব আশ্চর্য্য ধরন চালু করিয়াছেন যে, ঠিক কী কথা বলিবার জন্য এত আয়োজন, তাহা যেন অধরা থাকিয়া যায়। আমরা, পাঠকেরা অনেক সময় বাক-জটিলতার আবর্তে জড়াইয়া খাবি খাইতে থাকি। সন্দেহ করিতে ইচ্ছা হয়, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী- অর্থাৎ, যাবতীয় রচনাকার নিজেই কি সম্যক বুঝিয়াছেন, তিনি কী লিখিয়াছেন? ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া খানখান করিয়া দিতে পারিলেই কি তবে একটা ‘মৌলিক’ অবদান সৃষ্টি করা সম্ভব! ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাস’ বড় সহজ কথা নহে।

৬. কোন একটি নির্দিষ্ট ভাষারীতির প্রতি আমাদের কোনপ্রকার বিরাগ বা ভালবাসা নাই। তাই বলিয়া এমন একটি ভাষারীতি আমরা কোনভাবেই মানিয়া নিতে চাহি না- যাহা কোনভাবেই আমাদের নহে। এমন রীতি কোনভাবেই সহ্য করিব না- যাহা আমাদের অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করে, অপদস্থ করে, নির্বিচারে আমাদের নিঃস্ব করিয়া দেয়। একমাত্র সাধুরীতির বেলায় এমন কথা কেহ বুক ঠুকিয়া বলিতে পারিবেন না- ইহা একমাত্র আমার উত্তরাধিকার; জগতে আর কাহারও ইহাতে অধিকার নাই, ভাগ নাই, অংশ নাই। সেন মহাশয়ের সিদ্ধান্ত আবার স্মরণ করি।

৭. সাধুভাষার বিরুদ্ধে একদল এমন আন্দোলনে মাতিয়া উঠিয়াছেন যে, ইহাকে নিপাত না-করিয়া এই দলের শান্তি নাই, স্বস্তি নাই। দলের অধিকাংশ ‘কর্তাব্যক্তি’ আবার ঠিক ভাষার ইতিহাস ও ভাষাবিজ্ঞানের সহিত তেমন যোগ রাখিয়া উঠিতে পারেন নাই। তাঁহাদের সম্প্রদায়গত পরিচয় উল্লেখ করিবার মত নহে; না-করাই উত্তম এবং এইদল বেশকিছুটা সফলও হইয়াছেন। তাঁহাদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ: সাধুভাষায় অতিমাত্রায় তৎসমশব্দ আসিয়া ইহাকে বড়বেশি ভারী করিয়া তুলিয়াছে। সাধু বড় গুরু-গম্ভীর। একটি বিষয় আমাদের নিকট বড় আশ্চর্য ঠেকিল। ভাষাবিদ হইতে শুরু করিয়া মহান সাহিত্যিক, ধ্বনিবিজ্ঞানী হইতে আরম্ভ করিয়া শব্দতত্ত্ববিদ- প্রায় সকলেই সাধুভাষার স্বভাব ধরিতে গিয়া ইহাকে অতীব গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল বলিয়া চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করিয়া দিলেন। তাঁহাদের প্রায় সকলেই আবার সাধুভাষাতেই তাঁহাদের রায় রচনা করিলেন। এইরূপ দৃষ্টান্তকে কি স্ববিরোধিতা বলা নিতান্ত অসঙ্গত হইবে? এইবার ছোটমুখ নিয়া একটি বড়কথা বলিতেই হইবে। ‘অতীব গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল’ বলিয়া চিহ্নিতকারিগণ কি সত্য-সত্যই সাধুরীতির রচনা পাঠ করিয়া এমন সিদ্ধান্তে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, নাকি প্রত্যাখ্যান করিবার, অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করিবার দুর্দমনীয় প্রতিজ্ঞা নিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িলেন!

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ধ্রুপদি ঐতিহ্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অ্যান কার্সন

ধ্রুপদি ঐতিহ্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অ্যান কার্সন

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০ মানভাষা গণভাষা

মানভাষা গণভাষা

গোলাম মোস্তফার কাব্যপরিসর

গোলাম মোস্তফার কাব্যপরিসর

গল্প মরা গাঙের ঢেউ

মরা গাঙের ঢেউ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম