কিশোর হৃদয়ে ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার কবিতার স্পর্শ
Advertisement
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যখনই আমি কিশোর-কিশোরীদের কবিতার ক্লাসে যেতাম, আমার ব্যাগে থাকত একরাশ ধারালো পেনসিল, কিছু সাদা কাগজ, আর ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার কবিতার একটি করে ছাপানো পাতা। লাইব্রেরির কোণে কিংবা গাদাগাদি করে বসা ক্লাসরুমের সেই বারো-তেরো বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের কাছে কবিতা মানেই ছিল একঘেয়ে কোনো পাঠ্য। হয়তো তারা রবার্ট ফ্রস্টের গভীর চিন্তার কথা শুনেছে, কিংবা শৈশবে শেল সিলভারস্টাইনের ছড়া আওড়েছে; কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা? না, তার নাম তাদের জানা ছিল না। ও’হারার কবিতা প্রথাগত শিক্ষকদের চাপিয়ে দেওয়া গুরুগম্ভীর অনুশাসনের চেয়ে ছিল যোজন যোজন দূরে। তার ছোট ছোট স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ, বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস আর সশব্দ বিস্ময় মুহূর্তেই ক্লাসের চেনা হাওয়াকে বদলে দিত।
কবিতা যে কোনো দুর্ভেদ্য দুর্গ নয়, অথবা বড়দের শুধু ভান করে বুঝে ওঠার মতো কোনো গোপন ভাষা নয়-ও’হারা যেন সেই সত্যটিকেই উন্মোচন করলেন। যারা ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত, তারা খুব ভালো করেই জানেন তার লেখার মধ্যে কী গভীর এক সহমর্মিতা আর তাৎক্ষণিকতার টান লুকিয়ে থাকে। তার রচনায় থাকে এক চটজলদি রসিকতা, যা পাঠককে নিমেষেই তার ‘গোপন সঙ্গী’ বা সহ-ষড়যন্ত্রী বানিয়ে তোলে। একবার মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে-যখন প্রকাশক ডোনাল্ড অ্যালেন তার বাড়ির পথে পাণ্ডুলিপি নিতে আসছিলেন-ও’হারা লিখে ফেলেছিলেন তার বিখ্যাত শিল্প-ইশতেহার। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তিনি কবিতা লেখেন ঠিক কোনো একক মানুষের জন্য; যেন তিনি কলম না তুলে খুব অনায়াসেই কাউকে টেলিফোন করতে পারতেন। আমার শিক্ষার্থীদের কাছে এ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারেই অভাবনীয়। ছককাটা ছন্দ আর পরিকল্পিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে কবিতা যে এমন একান্ত আলাপচারিতা হতে পারে, তা তারা আগে কখনো ভাবতেই পারেনি।
তার জন্মের এক শতাব্দী এবং আকস্মিক প্রয়াণের ষাট বছর পেরিয়েও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লেখক ও পাঠকরা ও’হারার এই আপাত-সহজ অথচ অতলান্ত গভীরতার মাঝে খুঁজে পেয়েছেন প্রাণের রসদ। অনেক অর্থেই, নিউইয়র্কের শিল্প-আন্দোলনের অঘোষিত সম্রাট হিসাবে তার সিংহাসন আজও অটুট।
ও’হারার সবচেয়ে নন্দিত কাব্যগ্রন্থটির নাম লাঞ্চ পোয়েমস (Lunch Poems)। এটি কোনো নিভৃত পাহাড়ি কুটিরে বসে লেখা হয়নি; লেখা হয়েছিল মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের (মোমা) ফ্রন্ট ডেস্কের রিসেপশনিস্ট হিসাবে কাজ করার সময়, তার সামান্য দুপুরের খাবারের বিরতিতে। জীবনের এ এক আশ্চর্য পাঠ-ভবিষ্যতের বড় বড় শিল্প সমালোচক কিংবা কিউরেটরদেরও অনেক সময় শুরুটা করতে হয় সাধারণ প্রবেশপথের ডেস্কে বসেই! প্রচলিত সাহিত্যিক সমাজ তাকে সহজে গ্রহণ করেনি; ফলে তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিমূর্ত অভিব্যাক্তিবাদী (Abstract Expressionist) চিত্রশিল্পীদের দিকে। বিখ্যাত কবি টেড বেরিগান এ সংকলনটির প্রশংসা করে লিখেছিলেন-এটি সমকালীন কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল।
এ সংকলনের বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘দ্য ডে লেডি ডায়েড’, ‘আভে মারিয়া’, এবং ‘আ স্টেপ অ্যাওয়ে ফ্রম দেম’। শেষোক্ত কবিতাটিই ছিল ক্লাসরুমে আমার তুরুপের তাস। ক্লাসের কোনো এক উৎসাহী শিক্ষার্থীকে বলতাম কবিতাটি জোরে জোরে পড়তে, আর বাকি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের কাগজের পাতায় চোখ বুলিয়ে সেই শব্দের আঙিনায় হারিয়ে যেত :
‘এখন আমার মধ্যাহ্নভোজের প্রহর, তাই বেরিয়ে পড়ি-/ভনভন শব্দের ট্যাক্সিগুলোর মাঝে একটু হেঁটে নিতে।/প্রথমে ফুটপাত ধরে, যেখানে ঘর্মাক্ত মেহনতি মানুষেরা/তাদের ধুলোবালি মাখা চকচকে শরীরে স্যান্ডউইচ আর কোকাকোলা পুরে নেয়,/মাথায় হলুদ হেলমেট-
বোধহয় ওপর থেকে খসে পড়া ইট থেকে বাঁচতেই, আমার ধারণা।’
ও’হারা নিজের এই রচনাশৈলীকে বলতেন ‘আই ডু দিস, আই ডু দ্যাট’ (আমি এটা করি, আমি ওটা করি) ঘরানার কবিতা। আরও বৃহত্তর অর্থে তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘পার্সোনিজম’। ও’হারা মজা করে বলতেন, ‘এটি এমন এক আন্দোলন যা আমি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করেছি এবং যার সম্পর্কে কেউ কিচ্ছু জানে না!’ এই ঘরানার মূল কথা হলো চিন্তার ভারে ন্যুব্জ না হয়ে সাহসের ওপর ভর করে চলা। তিনি লিখেছেন, ‘যদি কোনো লোক ছুরি হাতে তোমাকে তাড়া করে, তবে তুমি শুধু প্রাণপণে দৌড়াবে; তুমি নিশ্চয়ই পেছনে ফিরে চিৎকার করে বলবে না-‘ক্ষান্ত দাও! আমি মিনেওলা স্কুলের সেরা দৌড়বিদ ছিলাম!’ ভাবুন একবার সেই দৃশ্যটি-ডব্লিউ ৫৩ নম্বর রাস্তা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজের শেষ মুহূর্তে সময় মেপে মেপে তিনি হাঁটছেন, আর ভেতরের তীব্র এক তাড়নায় কোনো কসরত ছাড়াই কলম দিয়ে ঝরে পড়ছে আশ্চর্য সব পঙ্ক্তি।
পাঠ্যক্রমের বাঁধাধরা নিয়মের তোয়াক্কা না করে ক্লাসের পরের অংশটিকে আমি করে তুলতাম আরও প্রাণবন্ত। কোনো সামরিক কায়দার লাইন ছাড়াই, একদল চঞ্চল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে হাতে কলম দিয়ে স্কুলের দীর্ঘ বারান্দায় বের করে আনতাম এক ‘কবিতা-পদযাত্রা’র জন্য। আমি তাদের বলতাম, ‘তোমরা এখন প্রত্যেকে একেকজন ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা। চোখ মেলে তাকাও-রং দেখো, শব্দ শোনো, আশপাশের মানুষগুলোকে লক্ষ করো।’
কয়েক মিনিট পর যখন আমরা আবার জড়ো হতাম, তারা এমন সব সূক্ষ্ম বিবরণ নিয়ে আসত যা তারা মাসের পর মাস পাশ কাটিয়ে চলে গেছে অথচ কোনোদিন খেয়াল করেনি। কেউ বলত দেওয়ালে জেগে থাকা এক সরু ফাটলের কথা, কেউ-বা দরজার কোণে জমে থাকা জীর্ণ মাকড়সার জালের কথা। আট বছর পেরিয়ে এসেও সেই ছোট্ট শিশুদের গভীর পর্যবেক্ষণগুলো আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
ও’হারা আমাকে যা শিখিয়েছিলেন, আমিও সেই অমূল্য সত্যটি তাদের অন্তরে বুনে দিতে চেয়েছিলাম: কবিতা কোনো কঠিন শব্দের গোলকধাঁধা বা অলংকারের জটিল কসরত নয়। কবিতা হলো বস্তুত ‘দেখার এক চোখ’-যা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অবহেলিত সৌন্দর্যকে পরম মমতায় আবিষ্কার করতে শেখায়। প্রতিদিনের চেনা দৃশ্যগুলোতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই; কিন্তু ও’হারা আমাদের শেখান নতুন করে বিস্মিত হতে।
মূল রচনা : ক্যাথরিন সাওওস্কি । ভাবানুবাদ : মেজবাহ উদ্দিন
সূত্র : লিটেরারি হাব
