যৌনতা সেলিব্রেটি ও গ্ল্যামারের রাজনৈতিক ব্যবহার
Advertisement
রেজাউল করিম রনি
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজনীতি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আবেগ, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অনুষঙ্গকেই ক্ষমতার প্রয়োজনে ব্যবহার করে না; যৌনতার মতো অতি ব্যক্তিগত বিষয়কেও কাজে লাগায়। ক্ষমতার প্রয়োজনে যৌনতার ব্যবহার বা যৌনতাকে কাজে লাগানো অতি প্রাচীন একটি পদ্ধতি। আধুনিক এবং ইন্টারনেট দুনিয়ার সংস্কৃতির মধ্যে সবকিছুকেই কোনো-না-কোনোভাবে যৌনতার আমেজ দেওয়ার একটা প্রবণতা আছে। ফরাসি দার্শনিক এলান বাদিউ’র একটি গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে ‘দ্যা পর্নোগ্রাফিক এজ’ নামে বাজারে এসেছে ২০২০ সালে। শুরুতেই তিনি আলোচনা করেছেন আমাদের বর্তমানকে ভুলিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা চারদিকে জারি রয়েছে তা নিয়ে। পর্নোগ্রাফিককালের এটা একটা ভালো নিদর্শন। আমরা অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মেতে থাকি। আমাদের জীবন থেকে বর্তমানই নাই হয়ে যায়। এমনসব প্রসঙ্গ ও ইভেন্ট তৈরি করা হয় আমাদের যাপিত বর্তমান হয়ে ওঠে বিমূর্ত। আমরা বুঝতে পারি না কেমন সময়ের মধ্যে আমরা আছি। আর এ কাজে যৌনতার চেয়ে ভালো উপাদান আর হয় না। জনগণ বিপুল আমোদের সঙ্গে এসব বিনোদন গ্রহণ করে এবং উত্তেজক খবর হিসাবে মিডিয়ার কাছে এর চাহিদা তুঙ্গে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডে যৌনতার ব্যবহার নিয়ে অনেক ধরনের গবেষণা ও বইপত্রও রচিত হয়েছে, হচ্ছে।
ক. আমরা ফুকোর বদৌলতে বায়োপলিটিকসের কথা জানি। শরীর ও সমাজের সম্পর্ক এবং এর সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যৌনতার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস হদিস করতে হবে। শরীর সরাসরি ক্ষমতা ও রাজনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্র। শরীরের অনেক রকম ব্যবহার আছে কিন্তু এর সবচেয়ে চরমতম ব্যবহার হলো রাজনৈতিক ব্যবহার। এভাবে শরীরের রাজনৈতিক ব্যবহারে শুধু যৌনতা না খোদ রক্ত-মাংসের শরীরও একটি অস্ত্র। আপনারা উদাহরণ হিসাবে ভাবতে পারেন, আত্মঘাতী আক্রমণের কথা। এর বাইরে শরীরকে কেন্দ্র করে সমাজে যে ধরনের ডিসকোর্স/বয়ান থাকে তার গঠনে যৌনতার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
ক্ষমতা যৌনতার এ সম্মোহনী শক্তিকেও কাজে লাগায় নানাভাবে। এজন্যই বলা হয়, ‘Power has no gender’। কিন্তু এ কথাটা আসলে ক্ষমতার যৌনতার ওপর কতটা দখল আছে তা ভালো মতো প্রকাশ করতে পারে না। বরং বলা ভালো, ‘Power has both gender’। যতরকম জেন্ডার রোল সবই ধারণ করতে পারে ক্ষমতা। এবং প্রয়োজনে ক্ষমতা জেন্ডারের নয়া ধারণাও তৈরি করতে পারে। জেন্ডারের বাংলা কোনোভাবেই লিঙ্গ হতে পারে না। জেন্ডার এমন কিছু যা লিঙ্গ নির্ধারণে ব্যবহার হয়। বাজে অনুবাদে খোদ জেন্ডারকেই লিঙ্গ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যা হোক, জেন্ডার যেটাই হোক না কেন-ক্ষমতা সেটাকে ব্যবহার করতে পারে। এজন্য প্রয়োজনে ব্যক্তির আইডেনটিটিও চেঞ্জ করে ফেলা হয়। একজন ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী মতের কাউকে ফাঁসানোর জন্য নিজেকে ‘নারী’ দাবি করে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দিয়ে তাকে আইনিভাবে জব্দ করতেও আমরা দেখেছি। ফলে যৌনতার নিরিখে ব্যক্তির যে ধরনের পরিচয় সমাজে নির্মাণ হয় ক্ষমতা তাকে গ্রাস করতে পারে। প্রয়োজনমতো তাকে ব্যবহার করতে পারে। আবার যখন দরকার হয় মোরাল গেইম খেলার তাও খেলতে পারে।
খ. মিডিয়ায় আমরা বিভিন্ন অস্ত্রধারী সংগঠনের আক্রমণের খবর পাই। এ ধরনের হামলাকে এসাসিনেশন বলে খবর করা হয়। ঠিক তেমনই রাজনীতিতে চরিত্রহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলা। আর এ ‘ক্যারেকটার এসাসিনেশন’ কাজে কোনো গোলাবারুদ, বন্ধুক ব্যবহার করতে হয় না। সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো যৌনতা। ভিন্নমত, দলকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের আইনি কাঠামো ব্যবহার করে হোক বা দলীয় বাহিনী দিয়ে হোক দমন করা, হত্যা করা কোনোভাবেই কোনো স্বৈরাচারী শাসকের অবস্থানকে শক্তিশালী করে না। সব নৈতিকতা ধ্বংস করার পরে যৌনতাকে নৈতিক উপাদান হিসাবে এ ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করতে তার সবরকম শক্তিকে কাজে লাগায়। এতে জনপরিসরে তাকে যেমন জনপ্রিয়তার সংকটে পড়তে হয় না, তেমনি জনগণ প্রকৃত সমস্যা ও ক্ষমতা এবং রাজনীতি ও তার অধিকারের প্রশ্নের চেয়ে সিনেমাটিক উত্তেজনায় মেতে থেকে বিনোদিত হতেই পছন্দ করে। ফলে নিজেদের কার্যকরী ভূমিকার দিকে মনোযোগ ফেরানোর বদলে বিপুল জনগণ এ উত্তেজক উপাদানের গ্রাহক হয়ে ওঠে। যাই হোক এ দিকগুলো আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করি, যদিও চিন্তাভাবনা করে এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো খতিয়ে দেখি না। তাহলে দেখা যাচ্ছে হত্যা, গণহত্যা, ইত্যাদির মাধ্যমে দমন বা অত্যচারের চেয়ে আরও কার্যকর হলো, ‘ক্যারেকটার এসাসিনেশন’।
গ. তথাকথিত সেলিব্রেটিদের (ছেলেমেয়ে উভয়) প্রতি সাধারণ জনতার যে কামনামিশ্রিত আগ্রহ আছে তা মোটা দাগে যৌনতাপ্রসূত। কিন্তু এ যৌনতার চোরাটানকে বিনোদনবাণিজ্যের জগতে ‘গ্ল্যামার’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। পাবলিককে তখন বোঝানো হয় উনি তারকা বা সেলিব্রেটি কারণ তার আছে গ্ল্যামার। আসলে গ্ল্যামার বলতে কী বোঝায়? কেউ স্পষ্ট বলতে পারবে না। এবং কেন মনে করা হয় এই কারণে একজনের গ্ল্যামার আছে, আর এ কারণে অন্যজনের নাই-এ বিচারে ন্যায্যতার কোনো জাস্টিফিকেশন নাই। এটা একটা আলগা গর্বের মতোই বানানো জিনিস। যেই লুঙ্গি পরিধান করাকে একসময় বিবেচনা করা হতো একটা খ্যাত/অসংস্কৃত/অনাধুনিক বিষয় সেটাকেও বিনোদনবাণিজ্যের প্রয়োজনে পণ্য গ্ল্যামার হিসাবে হাজির হতে দেখা যায়। এমন বহু বিষয় আছে। ফলে এ গ্ল্যামার ব্যাপরটা একটা বিমূর্ত ও রহস্যময় বিষয় করে রাখা হয়েছে। এটা বিনোদনবাণিজ্যের অদৃশ্য হাত বা অজুহাত। একবার চিন্তা করেন তো, যৌনতাহীন গ্ল্যামার কি বিক্রি হবে? নাকি তাকে তারকা হিসাবে পাবলিক মেনে নেবে?
ফলে গ্ল্যামার এখানে একটা যৌনপর্দা বা ঢাকনা ছাড়া আর কিছু না। এ গ্ল্যামারকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে জানে ক্ষমতা। কিন্তু যদি ক্ষমতার প্রয়োজনের বা স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তখন এ পর্দা সরিয়ে তাকে উদাম করে দেওয়া হয়। তখন পতন হয় তারকার। নিজের ক্ষুদ্র কমিউনিটিতে সে হয়তো তখনো তারকা হিসাবে টিকে থাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু সমাজিক ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে তার তারকাগিরিকে জাহির বা হাজিরের পথ কোনো-না-কোনোভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছুদিন মুখরোচক গল্পের খোরাক জুগিয়ে হারিয়ে যায় সেই তারকা। দেখবেন বিভিন্ন সমাজে ও দেশে-এ ধরনের তারকা বা সেলিব্রেটিদের খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয় ফ্যাসিবাদের পক্ষে। তাদের মধ্যে এ সেলিব্রেটিদের নিয়ে ভাগবাঁটোয়ারাও চলে। স্বার্থের সংঘাত শুরু হলে তখন হয়তো একদল আরেকদলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। আর তখন জনগণ ডাবল বিনোদন পেতে থাকে। কাল যে বিশাল সেলিব্রেটি, জাতির গর্ব ছিল আজ হয়ে যায় সবচেয়ে খারাপ, নোংরা মানুষ। মিডিয়া রসিয়ে রসিয়ে এ ঘটনার বয়ান করতে থাকে। যদিও এ ধরনের সেলিব্রেটিদের বেশির ভাগই ক্ষমতার দাস। কোনো নাগরিক পজিশন নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্রোতে বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেখা যায় না।
আবার এ সেলিব্রেটি ক্রেজজনিত বিষয়টা যদি ক্ষমতার বিপক্ষে যায় তাইলে তাকে হাজির করা হয় একটা নীতির প্রশ্ন আকারে। তখন তাকে মিডিয়া ও সমাজের সামনে প্রথমে অনৈতিক কাজের জন্য হেয় করা হয়। আবার যখন দরকার হয় তখন তাকে ভিকটিম হিসাবে উপস্থাপন করে তার পক্ষে জনগণের সিম্পেথিও তৈরির চেষ্টা করা হয়। একই কারণে সে পূজিত, নন্দিত, আবার একই কারণে নিন্দিতও হতে পারে। মানে, তার নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার কোনো সেল্ফ/স্বত্ববোধ থাকে না। এজন্য বেশির ভাগ সেলিব্রেটিই ননপলিটিক্যাল থাকতে চেষ্টা করেন। এটা করতে গিয়ে ক্ষমতার পক্ষেই থাকতে হয়। না হলে তো তাকে মূলধারায় টিকতে দেওয়া হবে না।
বিরোধিতা করলে বা তাকে ক্ষমতার প্রয়োজনে কুরবানি দিতে হলে দেখা যায়-কোনো তারকার যদি মদ খাওয়ার লাইসেন্স থাকে তার পরেও তাকে মদ্যপ হিসাবে প্রচার করা হয়। বেকায়দায় পেলেই তাকে সাইজ করার জন্য যৌনতাকে ব্যবহার করা হয়। তখন যৌনতাকে হাজির করা হয় মোরাল ব্লেইম আকারে। আসলে সত্যি সে কী করছেন তাতে কিছু যায় আসে না। ক্ষমতা যে ধারণাটা পয়দা করতে চায় সেটা সে করবেই সেই ব্যক্তি মহাপবিত্র হলেও কোনো সমস্যা নাই। এবং যারা স্লেভ/দাস নৈতিকতার চর্চা করে তাদের জন্য এটা খুবই সহজ। দাসের নৈতিকতা হলো, অন্যের কাছে দেখানোর জন্য, মানুষ কি বলবে(এগুলাই স্লেভ/দাস নৈতিকতা। যা ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজির হতে পারে যে কোনো সময়)। নিজের কাছে তার কোনো জবাবদিহিতা নাই। কাজেই এ ধরনের নৈতিকতার আলোকে যে সমাজ চালিত হবে সেখানে একজন গুন্ডা রায় দেবে আপনি ভদ্র না অভদ্র। একজন ধর্ষক বিচার করবে যৌনতার বিষয়গুলো। এসব স্লেভ মোরালিটি এক ধরনের নৈতিক সুড়সুড়িমূলক খেলার পরিবেশ তৈরি করে। এটার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নন-ইস্যুকে ইস্যুতে পরিণত করা যায় সহজেই। অন্যদিকে আরও হাস্যকর বিষয় হলো, পরাধীন মানুষগুলোও প্রগতির আলগা আস্ফালনে এসব ঘটনায় যৌনস্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। এগুলা সবচেয়ে সরস ফটকা। যে কোনো স্বৈরাচারের প্রথম পছন্দ হলো এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন স্বেচ্ছাচারপ্রিয় লোকজন।
মনে রাখতে হবে, যতদিন ভালো ও মন্দের বাইনারি জাজমেন্ট (এক এর বিপরীতে আর এক) দিয়ে আমরা একজনকে বিচার করব ততদিন আমরা সত্য থেকে দূরে থাকব। যে কোনো সেকুলার-ফ্যানাটিক কন্ডিশনে ভালো ও মন্দ একই জিনিস। আজ যাকে ভালো মনে করছেন কাল এই আপনিই তাকে খুবই মন্দ ও বাজে মনে করতে শুরু করবেন। কারণ, আপনার কাছে যা খুব খারাপ অনেকের কাছে তা খুব ভালো। এবং এটার একটা তর্ক সমাজে জারি থাকে, জারি রাখা হয়। আপনি এ তর্কদ্বারা প্রভাবিত হয়ে, ভালো বা খারাপের পক্ষে অনড় কোনো পজিশনে থাকতে পারেন না। সমাজে এসব ধারণা যেভাবে পরির্বতন হয় আপনিও এটার সঙ্গে সঙ্গে মত পরির্বতন করে ফেলেন। এভাবে মতাদর্শিক কোনো পজিশন নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না আর। এতে ইডিওলজিহীন একটা জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। তারা এ একজনকে আকাশে তুলছে, এ একজনকে পাতালে নামাচ্ছে। পুরাই হুলুস্থুল ব্যাপার।
কাজেই এসব চিন্তাহীন, সেল্ফ কমিটমেন্টহীন সেকুলার কন্ডিশনে ভালো-খারাপের পার্থক্য থাকে না। একই জিনিস হয়ে যায়। এজন্যই দেখাতে পাওয়া যাচ্ছে-কালকের ভারতবিরোধী, আজ ভারতপন্থি। আজকের পাকবিদ্বেষী কাল পাকপ্রেমী। আমাদের দেখতে হবে ‘বিয়ন্ড গুড এন্ড ইভিল’ (ভালো-মন্দের বাইনারির বাইরের) পজিশন থেকে। ভালো ও মন্দের দ্বৈততা থেকে আমরা যখন মুক্ত হতে পারব তখন বাকি থাকবে সত্যের দিকে পৌঁছানোর পথ, আর তা না হলে তথাকথিত ভালো-মন্দের তর্কে আটকে থাকতে হবে। যৌনতা ও মোরালিটি ফ্যাসিবাদের খুব কমন ব্যবহারের জিনিসগুলোর একটা। আমরা দেখতে চাই বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল পজিশন থেকে। বিয়ন্ড স্লেভ মোরালিটি থেকে। দেখতে চাই ট্রুথফুল কন্ডিশন থেকে।
