Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

ফররুখ আহমদ: রোমান্টিক থেকে ধ্রুপদি

Advertisement

Icon

আহমেদ বাসার

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

চল্লিশের দশকের বাংলা কবিতার এক স্বকীয় স্বর ফররুখ আহমদ। রোমান্টিক ও ধ্রুপদি মনোভঙ্গির মিশেলে কবিতার আধার ও আধেয়গত খোলনলচে পালটে দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি। ইসলামি রেনেসাঁর কবি হিসাবে তিনি সমধিক পরিচিত হলেও সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে মানবিক ও ঐতিহ্য চেতনার বলিষ্ঠ রূপায়ণে তিনি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। ধর্মীয় বোধ, মানবিক আকাঙ্ক্ষা, স্বদেশভাবনা ও ভাষিক কারুকার্যের মিথস্ক্রিয়ায় এক বিশেষ কাব্যজগৎ নির্মাণ করেছেন তিনি। ফররুখের কবিতায় আদর্শবাদিতা বেশ প্রবল। কিন্তু শুধু ধর্মীয় বা আদর্শনির্ভর কাব্যধারার কবি তিনি নন; বরং ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে দারুণ দক্ষতায় সমন্বয় করে এক অভিনব সৃজনশীল কাব্যশৈলীর জন্ম দিয়েছেন তিনি। তার কবিতায় আরবি-ফারসি অনুষঙ্গ, ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস, বাংলার প্রকৃতি, মানুষের সংগ্রাম এবং ইসলামের পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষা নান্দনিক রূপ লাভ করেছে।

১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থের মধ্যদিয়ে ফররুখ আহমদ বাংলা কবিতায় অভিনব এক কাব্যঢেউ নিয়ে আসেন, যে কাব্যের কেন্দ্রে আছেন আরব্য রজনীর সিন্দাবাদ চরিত্র। তার পূর্ববর্তী মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যের নায়ক ছিলেন রাবণ, যার মধ্যে মধুসূদন আধুনিকতার ছায়া দেখেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যের কেন্দ্রে ছিলেন শিব, যিনি একইসঙ্গে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক। ফররুখ আহমদ সিন্দাবাদকে মুসলমান সমাজের পুনর্জাগরণের পথপ্রদর্শক হিসাবে দেখেছেন। সিন্দাবাদ কবিতায় তিনি বলেন -

ভেঙে ফেলো আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ

দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ

ছিঁড়ে ফেলো আজ আয়েশী রাতের মখমল-অবসাদ

নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ!

মুসলমান সমাজের জড়তা, পশ্চাৎপদতা ও ভুলের বৃত্তে আবর্তিত পথরেখা বদলে দিয়ে গৌরবোজ্জ্বল অতীতের উজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা এখানে স্পষ্ট। ‘পাঞ্জেরী’ কবিতায়ও পাঞ্জেরীকে পথের কাণ্ডারি হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে।

ফররুখের কবিতার মূলস্বর মূলত অভিযাত্রা। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যের সিন্দাবাদ ছাড়াও ‘হাতেম তায়ী’ কাব্যের হাতেম তায়ীও একজন অভিযাত্রী। এ প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বারবার তিনি যাত্রার কথা বলেছেন-অবিচল যাত্রার কথা। স্বর্ণ ঈগল, আকাশ, মাঝি-মাল্লা, নাবিক, তেজী ঘোড়া তার কবিতায় ঘুরে ঘুরে এসেছে। তার সিন্দাবাদ, হাতেম তায়ী, হজরত মুহাম্মাদ (সা.) যাত্রীই আসলে। ’ [চলে গেছেন অপরাজেয়, ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দিন আহমদ সম্পাদিত]।

তার অধিকাংশ কবিতার কেন্দ্রে আছে জাগরণের অভিলাষ। কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ কাব্যের কবিতাগুলোতেও একই প্রবণতা লক্ষযোগ্য। যদিও ভাষা ও মেজাজগত দিক থেকে নজরুল ও ফররুখ দুজন পুরোপুরি আলাদা ঘরানার। নজরুল ছিলেন চিত্রকল্পনির্ভর, অন্যদিকে ফররুখ প্রতীক ও রূপকের অভিমুখী।

‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্য যখন রচিত হয় তখন এ অঞ্চলে চলছে পঞ্চাশের মন্বন্তর। এ কাব্যের ‘লাশ’ ‘আউলাদ’ কবিতায় দুর্ভিক্ষের ছায়াপথ ঘটেছে। ‘লাশ’ কবিতায় কবি বলেন-জানি মানুষের লাশ মুখ গুঁজে পড়ে আছে ধরণী পর/ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ীর তাপে পড়ে আছে/নিসাড় নিথর। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে কবি একদিকে সমকাললগ্ন, অন্যদিকে আদর্শিক স্বপ্নে বিভোর। ‘সাত সাগরের মাঝি’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন একই সময়ে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দুজন কবি জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে’র যথাক্রমে ‘মহাপৃথিবী’ ও ‘সাত ভাই চম্পা’ কাব্য দুটি প্রকাশিত হয়। লক্ষণীয় যে, এ দুজন কবিই পূর্বের রোমান্টিক চেতনা থেকে সরে এসেছেন সমকালীন বাস্তবতার চাপে। অন্যদিকে ফররুখ আহমদ আপাদমস্তক রোমান্টিকতায় নিমজ্জিত আলোচ্য কাব্যে। পরবর্তী কাব্যগুলোতে তিনি ধীরে ধীরে ধ্রুপদি ভঙ্গির প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তবে ফররুখের কাব্যে রোমান্টিকতা ও আদর্শবাদিতার কোনো দ্বন্দ্ব লক্ষ্যযোগ্য নয়। প্রায় সব কাব্যে তার চমৎকার সহাবস্থান ঘটেছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো ফররুখ আহমদের কবিতায় ধ্রুপদি প্রবণতা সহজলক্ষ। এমনকি প্রেমের কবিতাতেও ফররুখের ধ্রুপদি চাল লক্ষ করার মতো। ‘দিলরুবা’ কাব্যের কবিতাগুলোর কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। আদর্শবাদী চিন্তাভাবনার ফলেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তিত্বকে কবিতার স্থান দিয়েছেন। এ শ্রেণির উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলো হলো, সিরাজাম মুনীরা, উমর দারাজ-দিল, আবুবকর সিদ্দিক, ওসমান গনি, আলী হায়দার প্রভৃতি। ‘উমর দারাজ-দিল’ কবিতায় কবি বলেন-দুর্গত জনগণের দরদী বেছে নিলে সেরা পথ/মাটির তখতে বসেছে তোমার সাম্যের খিলাফত/আজও যেন দেখি জীর্ণ বস্ত্র মেলে বসে আছো একা/তোমার দিলের সেরা দৌলত ছিন্ন পিরানে লেখা।

এখানে হজরত উমরের মানবিক ও সাম্য চেতনার দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতায়ও এ বিষয়টি আমরা লক্ষ করি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আচারগত দিকের চেয়ে সাম্য ও মানবিক চেতনার দিকটি ফররুখের কবিতায় অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা রচনায়ও অসামান্য দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন ফররুখ আহমদ। তার রচিত প্রথম ও শেষ কবিতা দুটিই ছিল সনেটধর্মী। ‘মুহূর্তর কবিতা’ গ্রন্থে তিনি প্রায় একশ সনেট সংকলন করেছেন। গ্রন্থটির নামকরণের ক্ষেত্রে কবি দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটির ‘দ্য হাউজ অব লাইফ’ সনেট সিকোয়েন্স গ্রন্থের ‘আ সনেট ইজ আ মোমেন্টস মনুমেন্ট’ উক্তির প্রভাব লক্ষযোগ্য। আঙ্গিকগত নিরীক্ষা, বিষয়ের ব্যাপ্তি ও সংখ্যাগত দিক থেকে সনেট রচনায় বাংলা সাহিত্যে অগ্রভাগে অবস্থান তার। বিশেষ করে সনেটে নাট্য সংলাপের প্রয়োগ বা নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়াস এক্ষেত্রে তার মৌলিক প্রচেষ্টা। উল্লেখ্য, সাত সাগরের মাঝি বা সিরাজাম মুনীরা কাব্যের অনেক কবিতাই নাট্যগুণে সমৃদ্ধ।

ফররুখ আহমদ ঐতিহ্য চেতনায় বাংলা কবিতায় অভিনব ধারা যোগ করেছেন। মূলত ঐতিহ্যবোধই তার লেখার মূল চালিকাশক্তি। একদিকে আরব্য উপাখ্যান, ইরান ও আরব সংস্কৃতি ও পুরাকীর্তি, কুরআনে উল্লেখকৃত কাহিনির ঐতিহ্য, অন্যদিকে মুসলিম স্বর্ণযুগের ব্যক্তিত্ব ও ভাবধারাগত ঐতিহ্য তার কাব্যচেতনার মর্মমূলে ক্রিয়াশীল ছিল। বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যগত দিকটিকেও তিনি উপেক্ষা করেননি। তবে তার প্রবণতা আরব-ইরান সংস্কৃতিমুখী। একে মুসলিম পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ প্রয়াসের ফসল বলা যায়। ঐতিহ্যের প্রয়োগেও তিনি প্রতীক ও সংকেতের আশ্রয় নিয়েছেন।

ফররুখের কবিতার বহুমুখী পাঠ ও বিশ্লেষণ সম্ভব। শুধু মুসলমান সম্প্রদায়ের মুক্তি ও পুনর্জাগরণ নয়, সমগ্র মানবজাতির মুক্তির পরিপ্রেক্ষিতেও তার কবিতার মুক্তপাঠ সম্ভব। আর এখানেই কবি ও শিল্পী হিসাবে ফররুখ আহমদের সার্থকতা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

যৌনতা সেলিব্রেটি ও গ্ল্যামারের রাজনৈতিক ব্যবহার

যৌনতা সেলিব্রেটি ও গ্ল্যামারের রাজনৈতিক ব্যবহার

অ্যান কার্সন: সাহিত্যের সীমানা ভাঙার নবনির্মাতা

অ্যান কার্সন: সাহিত্যের সীমানা ভাঙার নবনির্মাতা

ফররুখ আহমদ: রোমান্টিক থেকে ধ্রুপদি

ফররুখ আহমদ: রোমান্টিক থেকে ধ্রুপদি

কিশোর হৃদয়ে ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার কবিতার স্পর্শ

কিশোর হৃদয়ে ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার কবিতার স্পর্শ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম