দস্তয়েভস্কির পতন, দহন ও অমর পুনরুত্থান
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিল্পীর জীবন কোনো মসৃণ রাজপথ নয়; তা আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন এক কুরুক্ষেত্র। মানুষের অন্তর্জগতের অতলস্পর্শী অন্ধকার, পাপ, অনুশোচনা আর মুক্তির আকুলতাকে বিশ্বসাহিত্যে ফিয়োদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কির মতো এতখানি নির্মম ও মমতাময় সততায় খুব কম মানুষই তুলে ধরতে পেরেছেন। আজ যে দস্তয়েভস্কিকে আমরা বিশ্বসাহিত্যের হিমালয়সম মহিরুহ হিসাবে শ্রদ্ধা করি-যার সৃষ্ট ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, দি ইডিয়ট কিংবা দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ মানবাত্মার গভীরতম গহ্বরের সন্ধান দেয়-তার যাত্রাপথ কিন্তু কোনো রূপকথার মসৃণ আখ্যান ছিল না। বরং তা ছিল অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা, রক্তক্ষরণ এবং আত্মিক পুনর্জন্মের এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।
১৮২১ সালে মস্কোয় জন্ম নেওয়া দস্তয়েভস্কি শৈশবেই রূপকথা, লোকগাথা এবং দেশি-বিদেশি সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন। ১৮৩৭ সালে তার মাতৃবিয়োগ ঘটে এবং প্রায় একই সময়ে তিনি বিদ্যালয় ছেড়ে নিকোলায়েভস্কি ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে যোগ দেন। স্নাতক শেষ করার পর তিনি প্রকৌশলী হিসাবে কাজ শুরু করেন এবং কিছুটা বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে অতিরিক্ত আয়ের জন্য বই অনুবাদ করতে থাকেন। ১৮৪০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি লিখে ফেলেন তার প্রথম উপন্যাস পুওর ফোক (দরিদ্র মানুষ), যা সেন্ট পিটার্সবার্গের অভিজাত সাহিত্যবৃত্তে তার প্রবেশদ্বার খুলে দেয়। তবে জারশাসিত রাশিয়ার সমালোচনা রয়েছে এমন নিষিদ্ধ বই পর্যালোচনাকারী ‘পেত্রাশেভস্কি সার্কেল’ নামের একটি সাহিত্যদলের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে ১৮৪৯ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দস্তয়েভস্কিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও একদম অন্তিম মুহূর্তে তা মওকুফ করা হয়। এরপর তাকে কাটাতে হয় সাইবেরিয়ার এক কঠোর বন্দিশিবিরে চার বছরের নির্বাসন-যা পরবর্তী সময়ে তাকে দ্য হাউস অব দ্য ডেড (১৮৬০-১৮৬২) রচনায় অনুপ্রাণিত করে। বন্দিশিবির ছাড়াও তাকে ছয় বছর বাধ্যতামূলক সামরিক নির্বাসন ভোগ করতে হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেন, নিজস্ব কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজের রচনার সংকলন আ রাইটার্স ডায়েরি প্রকাশ করেন। পশ্চিম ইউরোপ ভ্রমণের সময় তার মধ্যে জুয়ার মারাত্মক নেশা জন্মায়, যা তাকে চরম আর্থিক দুর্দশায় ফেলে। একসময় তাকে অর্থের জন্য হাত পর্যন্ত পাততে হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় রুশ সাহিত্যিকদের শিখরে স্থান করে নেন।
দস্তয়েভস্কির রচনাসমগ্রের মধ্যে রয়েছে তেরোটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, তিনটি নভেলা, সতেরোটি ছোটগল্প এবং অসংখ্য প্রাসঙ্গিক কাজ। তার লেখা শুধু রাশিয়ার বুকেই নয়, গোটা বিশ্বের পাঠকহৃদয়ে আলোড়ন তোলে। আলেকসান্দর সোলঝেনিৎসিন ও আন্তন চেখভ থেকে শুরু করে আলবেয়ার কামু এবং জঁ-পল সার্ত্রের মতো দার্শনিকদের তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন; তার ছায়া রয়েছে অস্তিত্ববাদ ও ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের উন্মেষেও। ফ্রিডরিখ নিটশে তার টুইলাইট অব দ্য আইডলস গ্রন্থে দস্তয়েভস্কিকে স্মরণ করে লিখেছিলেন-‘তিনিই একমাত্র মনোবিজ্ঞানী, যার কাছ থেকে আমার কিছু শেখার ছিল।’ তার সাহিত্য অনূদিত হয়েছে ১৭০টিরও বেশি ভাষায়।
আমার ব্যক্তিগত প্রিয় রুশ লেখক হলেন দস্তয়েভস্কি। তার সেরা বইগুলো শুধু মানুষের অন্তরাত্মার গভীর ব্যবচ্ছেদই নয়; একইসঙ্গে তা নির্মম, সংক্ষুব্ধ, তীব্র বিদ্রূপাত্মক এবং কখনো কখনো অসম্ভব কৌতুকপূর্ণ। সম্প্রতি আমি অঁরি ত্রোয়াত রচিত ফায়ারব্র্যান্ড বইটি হাতে নিই-যা দস্তয়েভস্কির জীবনের এক চমৎকার ঔপন্যাসিক আখ্যান। বইটি এতটাই মনোগ্রাহী যে, সেই আনন্দের তরঙ্গে ভেসে আমি আমার বুকশেলফে জমে থাকা দস্তয়েভস্কির কিছু ভারী গ্রন্থ নতুন করে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই; যার মধ্যে ছিল তার নির্বাচিত চিঠিপত্র এবং কনস্তান্তিন মচুলস্কির লেখা কিছুটা নিরানন্দ অথচ তীক্ষ্ণ সমালোচনামূলক জীবনীগ্রন্থ।
একই তথ্য উপাদান থেকে কীভাবে একটি রোমাঞ্চকর পাঠ্য এবং অন্যটি শুষ্ক সমালোচনামূলক কাজ হয়ে উঠতে পারে, তা দেখা সত্যিই বিস্ময়কর। পড়তে পড়তে পুনরায় আমার মনে পড়ল দস্তয়েভস্কির জীবনের সেই নাট্যময় অধ্যায়গুলো: পিতার হত্যাকাণ্ড, সাজানো ফাঁসির মঞ্চের অভিজ্ঞতা, নির্বাসনের দিনলিপি, জুয়ার উন্মাদনা এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের সাহিত্যমঞ্চে তার আকস্মিক অথচ বিপর্যয়কর অভিষেক। যাদের গল্পটি জানা নেই, তাদের জন্য বলি- দস্তয়েভস্কির প্রথম উপন্যাস পুওর ফোক প্রকাশের আগে তৎকালীন প্রভাবশালী ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ সমালোচক ভিসারিওন বেলিনস্কির হাতে পৌঁছায়। পাঠমাত্রই বেলিনস্কি ঘোষণা করেন, দস্তয়েভস্কিই হলেন মহান গোগোলের যোগ্য উত্তরসূরি! অবশ্য এটি ছিল কিছুটা বাড়িয়ে বলা: পুওর ফোক বস্তুত এমন এক ভাবালুতাপূর্ণ উপন্যাস, লেখক যদি পরবর্তী সময়ে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের মতো মহাকাব্যিক কাজ না করতেন, তবে তা হয়তো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেত। তবুও, চব্বিশ বছর বয়সি তরুণ ‘ফেদিয়া ডি’ রাতারাতি সেন্ট পিটার্সবার্গের নতুন সাহিত্য-জিনিয়াস হিসাবে সংবর্ধিত হলেন। কিন্তু সেই সাফল্য তার মাথা ঘুরিয়ে দিল; তিনি অহংকারী ও উদ্ধত হয়ে উঠলেন এবং নিজের নতুন সাহিত্যিক ‘বন্ধুদের’ পর করে দিলেন। সেই তথাকথিত বন্ধুরা প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় যখন তিনি তার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য ডাবল প্রকাশ করেন। বইটি শুধু প্রত্যাখ্যাতই হয়নি, চারদিক থেকে তা তীব্র নিন্দার মুখে পড়ে। দস্তয়েভস্কি পরিণত হন এক হাস্যস্পদ পাত্রে।
যে তথ্যটি আমার কাছে এতদিন অজানা ছিল, তা হলো-তার পরম গৌরবের মুহূর্ত ও সেই মর্মান্তিক পতনের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধানটি কত অবিশ্বাস্য রকমের সংক্ষিপ্ত ছিল! তখনকার লেখকরা আজকের লেখকদের চেয়ে অনেক দ্রুত লিখতেন। মিলান কুন্ডেরার একটি নিরস নভেলা লিখতে যে সময় লাগে, উনিশ শতকের সুবিশাল আকারের মহাকাব্যিক উপন্যাসগুলো রচিত হতো তার চার ভাগের এক ভাগ সময়। তা মাথায় রেখে একবার অনুমান করুন তো : মধ্যমণি হিসাবে ফেদিয়া ডি-র রাজত্ব কতদিন টিকেছিল? এক বছর? নয় মাস? ছয় মাস? নাকি তিন মাস?
সঠিক উত্তরটি হলো : মাত্র ১৫ দিন! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ১৮৪৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় পুওর ফোক; আর ঠিক তার পরই, ৩০ জানুয়ারি আলো দেখে দ্য ডাবল। আর মুহূর্তেই নেমে আসে তার সাহিত্যিক সুনামের মহাপ্রলয়।
এটি নিশ্চিতভাবেই এক অনন্য রেকর্ড। তেরো বছর পর নির্বাসন থেকে ফিরে তিনি তার স্মৃতিচারণমূলক উপন্যাস হাউস অব দ্য ডেড দিয়ে সফল প্রত্যাবর্তন ঘটান বটে, কিন্তু জীবনীকার মচুলস্কির মতে, দস্তয়েভস্কি তার সেই হারানো আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি আর ফিরে পাননি। এমনকি যখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের সেরা গ্রন্থগুলো রচনা করছিলেন, তখনো তার মনস্তত্ত্ব এ আশঙ্কায় কুঁকড়ে থাকত যে-তিনি হয়তো এখনো সমাজে নিজের কাক্সিক্ষত ‘খ্যাতি সুপ্রতিষ্ঠিত’ করতে পারেননি!
যা-ই হোক, এ ঘটনা আমাকে ভাবিয়ে তুলল : ১৮৪৬ সালের জানুয়ারিতে দস্তয়েভস্কির ভাগ্যে যে নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটেছিল, এমন সর্বনাশা পতন কি আর কোনো লেখকের জীবনে ঘটেছে? (অবশ্য পরবর্তী সময়ে এমন ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থানও আর কারও ভাগ্যে ঘটেনি, তা নিশ্চিত)। আমার মাথায় প্রথম যে নামটি আসে, তিনি হলেন মার্টিন এমিস। সমালোচকরা তার শুরুর দিকের বইগুলো খুব পছন্দ করেছিলেন; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার কাজগুলোকে নির্মমভাবে তুলোধুনা করা প্রায় এক জাতীয় খেলায় পরিণত হয়েছে। তবে সেই তিক্ত পরিণামে পৌঁছাতে এমিসের কয়েক দশক লেগেছে এবং তিনি এতটাই আত্মম্ভরী যে বিশ্বাস করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন তার মূল্যায়ন করবে।
মৃত্যুর পর অনেক লেখকের খ্যাতিতেই হঠাৎ ধস নামে : যেমন সমারসেট মম একসময় ছিলেন সর্বব্যাপী, আজ তিনি অনেকটাই ম্লান। সত্তর, আশি বা নব্বইয়ের দশকেও পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত অ্যান্থনি পাওয়েলের দেখা মিলত। মাটির নিচে যাওয়ার পর তার সুনামের পুরোপুরি ধস হয়তো নামেনি, কিন্তু খুব কম মানুষই এখন আর তাকে মনে রেখেছে। আর আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জের মতো কাল্ট ক্ল্যাসিক সৃষ্টির অবিচল জনপ্রিয়তা না থাকলে হয়তো আরেক খ্যাতনামা অ্যান্থনির (বার্গেস) ভাগ্যেও একই পরিণতি জুটত।
প্রকৃতপক্ষে, চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা বিনষ্ট খ্যাতির এ কুরুক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করলে দস্তয়েভস্কির অভিজ্ঞতার সবচেয়ে কাছাকাছি যাকে মনে হয়, তিনি হলেন লন্ডনস্তানির লেখক গৌতম মালকানি। বাঁধভাঙা প্রচার, ৩ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ডের অগ্রিম রয়্যালটি-অথচ বইটির বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায়! দ্বিতীয় কোনো বই লেখার আগেই মানুষ তার ওপর আক্রোশ ঝাড়তে শুরু করে। ২০০৭ সালের মে মাসের পর তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটটিও আর হালনাগাদ হয়নি। অধিকাংশ পাঠকের মতো আমিও বইটি পড়িনি, তাই মালকানির ভাগ্য কতটা ন্যায্য ছিল তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় (কার ভাগ্যই বা পুরোপুরি ন্যায্য?); তবে তিনি যেন ছিলেন অবাস্তব প্রত্যাশার এক স্বেচ্ছাপ্রণোদিত শিকার। বহুজাতিক লন্ডন নিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢেলে প্রকাশনা শিল্পের চাটুকাররা জোর করে আরেকটি ব্রিক লেন কিংবা হোয়াইট টিথ-এর মতো কৃত্রিম আলোড়ন তৈরি করতে চেয়েছিল। তাদের সেই নির্বুদ্ধিতার দায়ভার নিশ্চয়ই লেখকের একার নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-এটা কি প্রকৃত খ্যাতির পতন, নাকি স্রেফ বাতাসের এক রঙিন বুদবুদ ফেটে যাওয়া? আদতে কি সেখানে কোনো খাঁটি খ্যাতি আদৌ উপস্থিত ছিল? দস্তয়েভস্কির ক্ষেত্রে কিন্তু তা ছিল : পুওর ফোক প্রকাশের আগেই যুগের শ্রেষ্ঠ সমালোচক তাকে ‘জিনিয়াস’ বলে বরণ করে নিয়েছিলেন। অন্তত মালকানি এই ভেবে সান্ত্বনা পেতেই পারেন যে, তার সেই বিপুল অগ্রিম অর্থ কেউ কেড়ে নেয়নি; আর সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে পাঠানোর আগে কেউ তাকে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করিয়ে ফাঁসির প্রহসন দেখায়নি-যদিও শেষ বিচারে, সেই অগ্নিপরীক্ষাই কালক্রমে দস্তয়েভস্কির প্রতিভাকে অমরত্বের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।
মূল : ড্যানিয়েল কাল্ডার
ভাবানুবাদ : মেজবাহ উদ্দিন
সূত্র : দি গার্ডিয়ান অনলাইন
