জ্ঞানতত্ত্ব, দর্শন এবং বিজ্ঞান
শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষ প্রাণিকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাণী। তবে মানুষ বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। স্রষ্টা বলেছেন, মানুষকে উত্তম আচরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত রেখে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মানুষ তার আচরণ দ্বারা ফেরেশতাদের ওপরে চলে গেছে। আবার নিকৃষ্ট আচরণ দ্বারা অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। দর্শনে মানুষকে জীববৃত্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে শুধু জীববৃত্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তির কথা স্বীকার করলে চলবে না। কারণ বুদ্ধিবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও মানুষ যদি নীতি-নৈতিকতা পালন না করে, তাহলে জগতে তার অস্তিত্ব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। মানুষ হবে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগ্য প্রাণী। তাই মানুষের অস্তিত্বের স্বার্থে জীববৃত্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে নৈতিকতার সংযোগ করার অপরিহার্যতা অস্বীকার করা যায় না।
বিজ্ঞানে হোমোস্যাপিয়েন নামে খ্যাত মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন মানুষ, আধুনিক সভ্য মানুষ এবং ফ্যাশনেবল মানুষে পরিণত হয়েছে। লেমার্ক, ডারউইন, হাবার্ট স্পেন্সার প্রমুখ দার্শনিক প্রাণিজগৎ এবং বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং বলেছেন মানুষের পূর্বপুরুষ হলো বানর সদৃশ্য আর বানর থেকে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। হাবার্ট স্পেন্সার বলেছেন, ‘যে মহাবিশ্ব বস্তু, গতি, শক্তি দ্বারা গঠিত। পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে এটা প্রতিনিয়ত সম্মুখপানে অগ্রসরমান।’ জগতে প্রতিটি বিষয় বা বস্তুর ক্ষেত্রে এই গতি শক্তিই বিদ্যমান। তাই তো কবি বলেন, ‘গতিই সত্য, স্থিতিই মৃত্যু’। মানুষ নিজে জ্ঞানী হয়েছেন না তাকে জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে এ নিয়ে তর্কের শেষ নেই। মানুষ জগতে আসার পর এই অপরূপ জগতের কলাকৌশল দেখে বিস্মিত হয়েছে। এ বিস্ময় থেকে প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে। কে আমি? কি আমার পরিচয়? এ জগৎ কি কোনো পরম বুদ্ধিমান সত্তা সৃষ্টি করেছেন না এটা এমনিতেই উদ্ভব ঘটেছে। আমি যে লিখি, কথা বলি এই শক্তির উৎস কী? এগুলো কি ব্রেনের কাজ না আমার ভেতরের কোনো শক্তি আছে? প্রভৃতি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়ার জন্য দার্শনিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের জ্ঞানকে দুই ভাগ করা যায়। যথা : ১. Physics ২. Metaphysics এর জ্ঞান।
পৃথিবীর সব বিদ্যা তাই হোক যে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল, পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, সমুদ্রবিদ্যা এগুলো সবই Physics। বিজ্ঞানের পদার্থের বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। বিজ্ঞানী বস্তুগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু মানুষ শুধু পদার্থের জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। তাই সে পদার্থ জগতকে ছাড়িয়ে অতিন্দ্রীয় সত্তার জগতে প্রবেশ করে। এটা Physics-এর জ্ঞান নয়। এটা বস্তুর বাইরের জ্ঞান অর্থাৎ Metaphysics এর জ্ঞান। যেমন-ঈশ্বর, আত্মা, পরলোক, মূল্যবোধ, মানবতা, সৌন্দর্যতত্ত্ব, ভালোবাসা প্রভৃতি। ধর্ম ও বিজ্ঞানের জ্ঞানের দ্বন্দ্ব হলো Physics এবং Metaphysics এর দ্বন্দ্ব। এ দুই শ্রেণির জ্ঞান দ্বারা মানুষ জগতে পূর্ণতা অর্জন করে থাকে। একজন মানুষের আছে বিজ্ঞানের জ্ঞান কিন্তু তার ভেতর ওহির জ্ঞান নাই; তাকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী বলা যাবে না। আবার একজন বৈজ্ঞানিকের ওহির জ্ঞান আছে কিন্তু বিমান চালনার জ্ঞান নাই। তাহলে তিনি বিমান চালাতে পারবেন না। তাই মানুষকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পাশাপাশি জীবন ধারণের জন্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আত্মস্থ করতে হবে। তবেই সে দুনিয়াতেও টিকে থাকবে আবার পরকালও সুন্দর ও সার্থক হবে। দর্শনে বস্তুবাদ ভাববাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। ভাববাদীরা বলে, জগতের আদি সত্তা হলো চেতনা। চেতনা থেকে সবকিছুর উদ্ভব ও বিকাশ। আবার বস্তুবাদীরা বলে জগতের আদি সত্তা হলো বস্তু। বস্তু থেকে সব কিছুর উদ্ভব ও বিকাশ। ভাববাদী দার্শনিকদের মধ্যে আছে সক্রেটিস, প্লেটো, দেকার্ত, বার্কলি, লাইবনিজ, কান্ট, ফিকটে, শেলিং, হেগেল, শোপেনহাওয়ার, বোসাঙ্ক, ব্রাডলি, গ্রিন কেয়ার্ড প্রমুখ। আবার বস্তুবাদী দার্শনিকদের মধ্যে আছে মার্কস, এঙ্গেলস, রাসেল, হিউম ম্যুর প্রমুখ। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, শুধু মানুষ হিসাবে নয়। কারণ স্রষ্টা মানুষকে খলিফা হিসাবে প্রেরণ করেছেন। তাদের উচ্চস্তরের জ্ঞানের ভেতরে আসীন করা হয়েছে। যার কারণে সে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক। ঐশী কিতাবের প্রথম ওহি বাণী ‘পড়’। এমনকি মানুষকে বলতে বলা হয়েছে, ‘হে প্রভু! আমার জ্ঞানকে বাড়িয়ে দাও’। মানুষের জ্ঞান বস্তুজগতের ভেতর সীমাবদ্ধ। কারণ তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সাক্ষাৎ জ্ঞানের সীমানা এত কম যে, সে তেমন কিছুই জানতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির পর জ্ঞানকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। অদৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহ মানুষের ভেতর থেকে মানুষকে নির্বাচন করেছেন। এবং তার ওপর তার জ্ঞান প্রচারের জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করেছেন এবং অদৃশ্যের জ্ঞান মানবমণ্ডলীর কাছে প্রচার করেছেন যা সে জানত না। তিনি মানুষের ভেতর নবি-রাসূল নির্বাচন করেছেন। রেসালাতের দায়িত্ব দিয়েছেন। নবুওয়াতের ক্রমধারায় যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ করে পাঠানো হয়েছে তিনি হলেন রহমতাল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি মানবজাতির ইহকালের সব ধরনের অশান্তি থেকে মুক্তি এবং পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। মানবরচিত যত মত, পথ ও মতাদর্শ আছে সব অন্ধকার ও অজ্ঞতাপূর্ণ। আল্লাহ প্রদর্শিত পথ সত্য ও আলোময়। দেহ ও মনকে আলো ঝলমলে এবং আলোকময় করার জন্য আধ্যাত্মিক শিক্ষার বিকল্প নেই। কারণ মানুষ দেহ ও মন দুটি সত্তা নিয়ে গঠিত। দেহের যেমন ক্ষুধা আছে আত্মারও তেমন ক্ষুধা আছে। দেহের ক্ষুধার জন্য আমরা তিন বেলা খাই আবার আত্মার ক্ষুধার জন্য তেমন কিছু করি না। যার কারণে জগতের মানুষের আচরণ ও চিন্তা জগতে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে জগতের মানব আচরণ সংশয়পূর্ণ এবং অজ্ঞতাপূর্ণ হয়েছে। মানুষ খামাখা নীতিবহির্ভূত কাজকে বেছে নিয়ে জগতে শোরগোল, রক্তপাতের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু যারা দৈহিক ও আত্মিক উভয়দিক দ্বারা আত্মাকে উজ্জ্বল ও ঝলমলে করে তুলেছেন তারা হয়েছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পৃথিবীতে সবাই আলো হবে না। কিছু আলোকময় আত্মা দ্বারা বাকি অন্ধকার আত্মা আলোকময় হবে। একটি প্রদীপ দ্বারা হাজার প্রদীপ জ্বালানো যায় কিন্তু প্রদীপের আলোর জ্যোতি বিন্দুমাত্র কমে না। একজন আলোকময় আত্মা দ্বারা বহু মানুষের আত্মাকে আলোকময় করা যায়। এতে তার আত্মার উজ্জ্বলতা তো কমবে না বরং উজ্জ্বলতা আরও বাড়বে। আলো ও আলোকিত এক নয়। পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ মনীষীদের কাজটি ছিল মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে দূরীভূত করা। তারা আলোয় আলোকিত করে আনন্দ পায়। এখানেই তার সার্থকতা। অন্ধকার আছে বলেই আলোর এত মূল্য। সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হোক বিশ্বের সব কালিমা এবং অন্ধকার, আজ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিশ্বে এই আমাদের প্রত্যাশা।
ধর্মের মতো দর্শনেও জ্ঞানের উৎস ও অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোনো ব্যক্তি বৈজ্ঞানিক কর্ম, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বিপ্লবী আন্দোলন থেকে যত দূরবর্তী থাকুক না কেন, তার কাছে সহজাত প্রশ্ন জাগে মানুষের ভাগ্যে কী আছে? যুদ্ধের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড না শান্তিপূর্ণ জীবন? প্রকৃতি কি টিকে থাকবে না বৈজ্ঞানিককৃত কৌশলগত রাজনৈতিক দাপটে ধ্বংস হয়ে যাবে। এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়ার চেষ্টায় যুক্তিতর্কে বাক-বিতণ্ডায় কেটেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। কিন্তু এখনো মানুষ একমতে আসতে পারেনি। এসব অসীম বিষয় ধর্মের যেমন আলোচ্য বিষয় তেমনই বিজ্ঞানেরও জানার বিষয়। কারণ ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান অন্ধ। মানুষের প্রয়োজনে মানুষ আবিষ্কার করে। ধর্মের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের জ্ঞান জীবন প্রক্রিয়ার দিকদর্শন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় বস্তুর সম্পর্ক কেন্দ্র করে জ্ঞানের সৃষ্টি হয়। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অর্থাৎ সাক্ষাৎ জ্ঞান নিশ্চিত। এটা বিজ্ঞান ও মানবীয় জ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু বস্তু জগতের জ্ঞানই একমাত্র জ্ঞান নয়। শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান দ্বারা মানুষের জ্ঞানকে খাটো করা হয়। মানব জ্ঞানের পূর্ণতার জন্য অতীন্দ্র জ্ঞানের অপরিহার্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ জ্ঞান নিয়ে দর্শনে Epistemology গড়ে উঠেছে। জ্ঞানের উৎস হিসাবে দার্শনিকরা ৪ শ্রেণির মতামতের কথা বলেছেন। যথা-(১) বুদ্ধিবাদ, (২) অভিজ্ঞতাবাদ, (৩) বিচারবাদ ও (৪) স্বজ্ঞাবাদ বুদ্ধিবাদীদের মতে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, তা সর্বজনগ্রাহ্য ও নিশ্চিত নয়। তাদের মতে, বিশুদ্ধ বুদ্ধিই একমাত্র সার্বিক ও নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করতে পারে। বুদ্ধিবাদীদের মতে, মন বা আত্মা হলো প্রধানত সক্রিয় বুদ্ধির স্বাভাবিক গুণ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো এবং আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিক ডেকার্ট, স্পিনোজা, লাইবনিজ ও ভলভ প্রমুখ বুদ্ধিবাদের সমর্থক। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, অভিজ্ঞতাই জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস। সংবেদন এবং অনুভূতির মাধ্যমে আমরা এ জ্ঞান পেয়ে থাকি। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস, প্রোটাগোরাস, জর্জিয়াস এবং আধুনিক লক, বার্কলি, হিউম স্পেন্সার প্রমুখ অভিজ্ঞতাবাদীদের ধারক বাহক। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বুদ্ধিবাদের প্রথম সমর্থক ছিলেন। হিউমের লেখা পড়ে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিচারবাদী দর্শন প্রচার করেন। তিনি বলেন, বুদ্ধি দেয় জ্ঞানের আকার আর অভিজ্ঞতা দেয় জ্ঞানের উপাদান। এ দুয়ে সংমিশ্রণের ফলে জ্ঞানের উৎপত্তি হয়। স্বজ্ঞাবাদীদের মতে, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা কিংবা বিচার বুদ্ধি নয়। মরমি অভিজ্ঞতা বা স্বজ্ঞা জ্ঞানের স্বার্থক উৎস ও পদ্ধতি। ব্যাপক অর্থে স্বজ্ঞা জ্ঞেয় বস্তুর এমন এক চেতনা যা গভীর অভিজ্ঞতাকে নির্দেশ করে যেখানে জ্ঞাতা অতিক্রম করে যায় অভিজ্ঞতার চলমান জগতের সব বহুত্ব ও বিরোধকে এবং একাত্মবোধ করে জগৎ জীবন ও পরম সত্তার সঙ্গে। এ মতের সমর্থকরা হলেন-বার্গসো, বাটলার, জি সি দেব, আজরাফ প্রমুখ দার্শনিক। দার্শনিক জ্ঞান ছাড়াও বিজ্ঞানের জ্ঞান এবং ধর্মের জ্ঞান এসে হাজির হয়েছে একইসঙ্গে যা মানব প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে। ধর্মজ্ঞান লাভ করতে হয় বিশ্বাস ও যুক্তির ওপর নির্ভর করে। আর বিজ্ঞানের জ্ঞান লাভ করতে হয় বিশ্বাস, যুক্তি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে।
বিজ্ঞানের জ্ঞান পদার্থ জগতের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকার কারণে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির কাছে হার মেনে যায়। কারণ মানুষের কল্পনা শক্তির বিশালতা তাকে এক অদৃশ্য জগতে নিয়ে গেছে, যেখানে তার যাওয়ার অধিকার নেই। মানব চিন্তার এ প্রবণতাকে চিন্তাবিদরা বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার দ্বন্দ্ব হিসাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এ জ্ঞানের সীমানা এত ব্যাপক যে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের জনক হলেও তাদের ভেতর মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি উপস্থিতির কারণে বিশ্বাস চলে আসা খুবই সংগত। তাই তো বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। যার কারণে মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মুখে শোনা যায়, ‘মহাবিশ্বের বহুবিধ লীলা খেলা দেখে একজন নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞান কর্মীকে এটা মানতেই হবে অকল্পনীয় সেই শক্তি যা মানুষ থেকে সীমাহীনরূপে বড় এবং যার সামনে আমাদের নতজানু হতেই হবে।’ মহাকালের কবিকে বলতে শোনা যায়, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।’ আসলে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে সে শুধু স্রষ্টাকে কল্পনাই করতে পারে। বাস্তবে প্রত্যক্ষ করা তার সীমানার অতীত বলে এটাকে রহস্যময় মনে হয়। আর যদি কেউ অভিজ্ঞতার আলোকে সৃষ্টি এবং স্রষ্টাকে প্রত্যক্ষ করার ইচ্ছা পোষণ করে তবে তাদের ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞান শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে বলেছেন- ‘If you want to know one microgram salt you need 1000 Russell's brain.’ এত ক্ষুদ্র বস্তুর জন্য যদি এমন প্রয়োজন হয় তাহলে এ বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের জন্য কী দরকার? যদি কোনো নাছোড় ব্যক্তি সৃষ্টিকে জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান বলে- ‘We need a head as big as some 20,000 billion light years diameter across only to understand the creation.’ তাহলে আমাদের সৃষ্টি সম্পর্কে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিলক্ষিত জ্ঞান তো দূরের কথা আমাদের কল্পনারও বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাহলে ধর্মে বর্ণিত বিষয়বস্তু ভাববার বিষয় হিসাবে মানব নামক শ্রেষ্ঠ জীবের কাছে থেকে যাচ্ছে। মানুষের জ্ঞানের পরিপূর্ণতা তখন আসবে যখন সে বিচিত্র জ্ঞানের উৎস নিয়ে মহান সত্তার উদ্দেশ্যে একত্রিত হবে এবং জগৎ ও জীবন নিয়ে মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে সার্বিক মীমাংসায় আসবে।
