শাহেদ আলীর কথাসাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনভাষ্য
আরণ্যক শামছ
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা কথাসাহিত্যের দিগন্তে যে কজন কীর্তিমান লেখক স্বীয় স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিক প্রতিভায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক শাহেদ আলী অন্যতম। শুধু একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকই নন, তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, প্রাজ্ঞ মননশীল চিন্তাবিদ, নির্ভীক সাংবাদিক এবং আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ও অগ্রসৈনিক। বাংলা সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে তার সৃষ্টির সংখ্যা সংখ্যাগত বিচারে হয়তো খুব বিপুল নয়, কিন্তু মাত্র কয়েকটি গল্পগ্রন্থ ও কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে নিজের জন্য একটি চিরস্থায়ী ও ধ্রুপদি আসন নিশ্চিত করেছেন। তার কথাসাহিত্যের মূল শক্তি রূঢ় বাস্তবতার সমান্তরালে স্বপ্ন ও বিশ্বাসের পরাবাস্তব বুননে, যেখানে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, ভাগ্যবিড়ম্বিত ও প্রান্তিক মানুষেরা প্রধান চরিত্র হিসাবে আবির্ভূত হয়। জীবনের গভীর তাত্ত্বিক সত্যকে আধ্যাত্মিক অনুভূতির আলোয় সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যাপনের সঙ্গে যুক্ত করার এক অভূতপূর্ব শিল্পকুশলতা তার গল্পগুলোকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মাহমুদপুর গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৬ মে জন্ম নেওয়া শাহেদ আলী ছিলেন একাধারে ঐতিহ্যমনস্ক ও প্রগতিশীল সমাজ-পর্যবেক্ষক। হাওড় ও নদীবেষ্টিত প্রান্তিক ভূখণ্ডের দরিদ্র মানুষের মনস্তত্ত্ব তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যার প্রকাশ ঘটেছে তার চরিত্রগুলোর বেঁচে থাকার আকুল আকুতিতে। দারিদ্র্য শুধু তার গল্পে একমুখী অর্থনৈতিক সংকট হিসাবে আসেনি, বরং তা শোষিত শ্রেণির দীর্ঘশ্বাস, সামাজিক অসমতা ও মানুষের তীব্র মানসিক ক্ষতকে উন্মোচন করেছে। অতি সাধারণ ও ব্রাত্য জীবনের এ বাস্তব আখ্যানগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে গভীর মানবিক দরদ, যা পাঠককে প্রান্তিক মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম করে তোলে। তিনি লোকায়ত জীবন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এমন এক কথাসাহিত্যিক ধারা তৈরি করেছিলেন, যা সমকালীন কথাসাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন করে।
অধ্যাপক শাহেদ আলীর সমাজ-চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মূল ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। তিনি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রামকে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি, বরং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের গভীরে প্রবেশ করে সত্য অনুসন্ধান করেছেন। তার কথাসাহিত্যে কোনো কৃত্রিম আধুনিকতার মোহ ছিল না, বরং ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের আত্মিক ও সামাজিক সত্যের প্রতি অকপট দায়বদ্ধতা। সাহিত্যে মানবিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণের বিরুদ্ধে নীরব অথচ তীব্র প্রতিবাদ তার কলমকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছিল। গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদের সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয়ের জন্য যে চিরন্তন ও নিষ্ঠুর সংগ্রাম, তা তার সাহিত্যকর্মে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে ফুটে উঠেছে, যা যে কোনো বোদ্ধা পাঠককে আলোড়িত করে।
শাহেদ আলী ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাহিত্য সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে এর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনটিই মূলত বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিল, যার পেছনে শাহেদ আলীর সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ছিল অনন্য। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র হিসাবে খ্যাত ঐতিহ্যবাহী ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে ভূমিকা রেখেছিল।
শাহেদ আলীর রাজনৈতিক জীবন ছিল তার সুনির্দিষ্ট আদর্শ, গভীর দেশপ্রেম ও অনমনীয় নৈতিক মূল্যবোধের এক চমৎকার প্রতিফলন। তিনি শুধু তাত্ত্বিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং মাঠপর্যায়ের জনমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সরাসরি যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি সুনামগঞ্জ থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। আইনসভার সদস্য হিসাবে তিনি সর্বদাই প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর তিনি কলুষিত ও অবরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন। তার এ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি ক্ষমতার লোভের চেয়ে আদর্শকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিতেন।
বাংলা ছোটগল্পে শাহেদ আলী এক অবিসংবাদিত বরপুত্র হিসাবে গণ্য হন, যার গল্পগুলো জীবন ও দর্শনের এক অপূর্ব মহাকাব্য। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ‘অশ্রু’ প্রকাশিত হওয়ার মধ্যদিয়ে তার সাহিত্যিক প্রতিভার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তার প্রকাশিত বিখ্যাত গল্পগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জিবরাইলের ডানা’ (১৯৫৩), ‘একই সমতলে’ (১৯৬৩), ‘শা’নজর’ (১৯৮৫), ‘অতীত রাতের কাহিনী’ (১৯৮৬), ‘অমর কাহিনী’ (১৯৮৭) এবং ‘নতুন জমিদার’ (১৯৯২)। শাহেদ আলীর গল্পগুলোর মূল উপজীব্য মানুষের অভ্যন্তরীণ মনুষ্যত্ববোধ, তীব্র নৈতিকতা, প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধের নান্দনিক প্রকাশ।
বাস্তব ও পরাবাস্তবের আশ্চর্য মেলবন্ধনের সবচেয়ে সার্থক এবং কালজয়ী উদাহরণ তার ছোটগল্প ‘জিবরাইলের ডানা’, যা বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। গল্পের মূল চরিত্র আট বছরের শিশু নবী এবং তার দরিদ্র মা হালিমা, যাদের দৈনন্দিন জীবন চরম ক্ষুধা আর তীব্র অনিশ্চয়তায় জর্জরিত। অভাবের তাড়নায় মা যখন সন্তানকে বিড়ি কারখানার কঠোর পরিশ্রমে বাঁধতে চান, শিশু নবীর মন তখন উড়তে চায় মুক্তির আকাশে। শবেবরাতের রাতে মায়ের মুখে ফেরেশতা জিবরাইলের বিবরণ শুনে শিশুমন এক অপার্থিব আশায় উজ্জীবিত হয়। সে তার সামান্য সুতো ও লাটাইয়ের ঘুড়িকে আসমানে উড়িয়ে আল্লাহর আরশের পায়ায় আটকে দিতে চায়, যাতে মহান আল্লাহ তাদের এই তীব্র দুর্দশার কথা শুনতে পান। গল্পের সেই স্মরণীয় মুহূর্তটি যখন আসে, যেখানে নবী তার বিদ্রোহের নিশান আকাশে ওড়াতে চায়, তখন লেখকের অমোঘ বর্ণনা আমাদের নাড়িয়ে দেয়। শাহেদ আলী লিখছেন, ‘এক সময় হয়তো আটকে যাবে আরশের পায়ায়, আরও শক্ত টান পড়বে হাতে, তখন রশিতে টান দিয়ে সে টলিয়ে দেবে আল্লাহর আরশ।’ এই পঙ্ক্তির মধ্যদিয়ে চরম মারধর ও ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও অবচেতন মনের এক অদ্ভুত পরাবাস্তব ও বিদ্রোহী বিশ্বাস নবীর মুখে এক স্বর্গীয় হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে। বাস্তব জগতের অনটন এবং পরাবাস্তব জগতের তীব্র বিশ্বাসের এ মনস্তাত্ত্বিক দ্বান্দ্বিক রূপায়ণ গল্পটিকে এক নতুন উচ্চতা প্রদান করেছে। চরম রূঢ় বাস্তবতার সমান্তরালে স্বপ্ন ও অলৌকিকতার এ নান্দনিক বুনন বাংলা কথাসাহিত্যে আজও অতুলনীয় ও অনন্য।
ছোটগল্পের পাশাপাশি ঔপন্যাসিক হিসাবেও শাহেদ আলী সমাদৃত। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তার একমাত্র ও বহুল আলোচিত কালজয়ী উপন্যাস ‘হৃদয় নদী’ বাংলা কথাসাহিত্যে এক অমূল্য সংযোজন। এ ছাড়া গ্রন্থাকারে প্রকাশিত না হলেও তার সাহিত্যিক ভাবনায় ‘কাদা মাটির সাতকাহন’ এবং ‘আত্মসমর্পণ’ উপন্যাসের সমাজ-বাস্তবতার এক নিখুঁত আখ্যান তৈরি হয়েছে। নদী যেভাবে প্রতিনিয়ত তার গতিপথ পরিবর্তন করে মানুষের ভাগ্যকে ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতে ওঠে, তেমনি মানুষের মনের অলিগলি ও আবেগও কীভাবে আবর্তিত হয়, তা তিনি তার কথাসাহিত্যে দেখিয়েছেন। তার উপন্যাসের সহজ-সরল অথচ কাব্যিক গদ্যশৈলী ও চরিত্র সৃষ্টির মুনশিয়ানা ঔপন্যাসিক হিসাবে তার তাত্ত্বিক গভীরতার পরিচয় বহন করে।
কথাশিল্পের বাইরেও একজন প্রাজ্ঞ মননশীল প্রাবন্ধিক ও গবেষক শাহেদ আলী। তার রচিত প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘একমাত্র পথ’ (১৯৪৬), ‘তরুণ মুসলিমের ভূমিকা’ (১৯৪৬), ‘ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা’ (১৯৪৮), ‘সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া’ (১৯৫০), ‘তরুণের সমস্যা’ (১৯৬০), ‘বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান’ (১৯৬৫), ‘তাওহীদ’ (১৯৬৫), ‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’ (১৯৭০), ‘ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৭০), ‘Economic Order of Islam’ (১৯৭৮), ‘জীবন নিরবচ্ছিন্ন’ (১৯৮০) এবং ‘Islam in Bangladesh’ (১৯৮১) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মননশীল মননের পাশাপাশি শিশুসাহিত্য, নাটিকা ও আত্মজীবনীতেও শাহেদ আলীর সাবলীল পদচারণা তার সৃষ্টির দিগন্তকে করেছে আরও প্রসারিত। শিশুদের মানসিক বিকাশ ও নৈতিক চরিত্র গঠনে তার রচিত শিশুতোষ গ্রন্থ ‘রুহীর প্রথম পাঠ’ (১৯৮০), ‘ছোটদের ইমাম আবু হানিফা’ (১৯৮০) এবং ‘সোনার গাঁয়ের সোনার মানুষ’ (১৯৯২) এক অমূল্য অবদান। সামাজিক অসঙ্গতি ও ন্যায়ের তুলনামূলক বিচার ফুটিয়ে তুলতে তিনি রচনা করেন বিশেষ নাটিকা ‘বিচার’। জীবনের শেষ দিনগুলোতে স্মৃতির মণিকোঠা হাতড়ে তিনি লিখেছিলেন তার অনন্য আত্মজীবনী ‘জীবনকথা’। তার এ বহুমাত্রিক রচনাগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু ছোটদের বা বড়দের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনন গঠনে আমৃত্যু কলম ধরেছিলেন।
সাহিত্যের অনুবাদ শাখায় শাহেদ আলীর অবদান অত্যন্ত ব্যাপক ও আন্তর্জাতিক মানের, যা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্নগুলোকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছে। তার অনূদিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত চিন্তাবিদ মুহাম্মদ আসাদ রচিত ‘ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার মূলনীতি’ (১৯৬৬) এবং বিশ্বখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মক্কার পথ’ (১৯৯৩)। এ ছাড়া তিনি গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘ইতিবৃত্ত’ (১৯৯৪), কে বি এইচ কোনান্টের ‘আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ’ এবং ‘ককেশাসের মহানায়ক’ অত্যন্ত সফলভাবে বাংলায় অনুবাদ করেন। তার অনুবাদকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মূল গ্রন্থের ভাব ও দর্শনকে অক্ষুণ্ন রেখে অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল বাংলা গদ্যে রূপান্তর করা।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর জটিল ও আত্মকেন্দ্রিক করপোরেট সমাজে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক শাহেদ আলীর সাহিত্যিক ও সামাজিক দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের দিনে যখন বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক মানুষ প্রতিনিয়ত পুঁজিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে এবং চরম নৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন তার সাহিত্য আমাদের দেখায় কীভাবে টিকে থাকতে হয়। চরম অভাবের মধ্যেও মানুষের ভেতরের আত্মিক শক্তি ও বিশ্বাসের যে আলো তিনি জ্বালিয়েছিলেন, তা আজ আমাদের চরম হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখায়। তার অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও যুক্তিনিষ্ঠ ধর্মীয় চেতনা সমাজ থেকে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও উগ্রবাদ দূর করতে এক চমৎকার গাইডলাইন হিসাবে কাজ করতে পারে। তাই বর্তমান প্রজন্মের মননশীল গঠনে তার রচনা পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, অধ্যাপক শাহেদ আলী বাংলা ছোটগল্প ও মননশীল সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক অনন্য ও কালজয়ী ধারার প্রবর্তন করেছেন, যা একদিকে যেমন মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের যন্ত্রণার কথা বলে, অন্যদিকে তা ডানা মেলে ধরে অনন্ত আকাশের অপার্থিব ও শাশ্বত আলোয়। বাস্তব ও পরাবাস্তবের এই সুষম বিন্যাস, ভাষার মরমি মেজাজ এবং প্রান্তিক জীবনের সার্থক রূপায়ণে তার যে শিল্পসার্থকতা, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে চিরভাস্বর ও অক্ষয় করে রাখবে। সমকালীন সীমানা পেরিয়ে আজও তার গল্প ও প্রবন্ধগুলোর যে সর্বজনীন, চিরন্তন ও মানবিক আবেদন রয়েছে, তা-ই সগৌরবে প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃত্তে বন্দি কথক ছিলেন না, বরং ছিলেন সর্বকালের এক মহান ও অমর মননশিল্পী।
