রাণীশংকৈলে তহুরাদের কারাতে বিপ্লব
Advertisement
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুই ধারে সবুজ ধানখেতের বুক চিরে চলে গেছে সরু মেঠো পথ। এই পথ দিয়েই একসময় স্কুলে যাওয়ার সময় নবম শ্রেণির তহুরার বুক ভয়ে ঢিপ ঢিপ করত। মোড়ের মাথায় বখাটেদের জটলা, আড়চোখে তাকানো আর অস্ফুট টিপ্পনী ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল বা হরিপুরের প্রান্তিক জনপদে এটিই ছিল চেনা ছবি। কিন্তু সেই ধূসর দিন এখন অতীত।
মানবকল্যাণ পরিষদের ‘হোপ’ প্রকল্পের হাত ধরে শত শত কিশোরী আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিয়ে হয়ে উঠছে সাহসের প্রতীক।
তহুরা আক্তারদের এই রূপান্তরের গল্প কেবল কারাতে শেখার নয়-এটি এক সামাজিক জাগরণ, যেখানে ভয়কে পেছনে ফেলে আত্মবিশ্বাসই হচ্ছে নতুন পরিচয়।
তহুরা আক্তার এখন এলাকায় আর কেবল এক কিশোরী নয়, সে এখন ‘কারাতে তহুরা’। শুধু তহুরাই নয়, টুপুর রানী, রূপা রানী কিংবা স্বপ্নীল দেবীদের চোখে এখন আর পানি নেই, আছে আত্মবিশ্বাসের তীব্র ঝিলিক। তারা সবাই প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান। দারিদ্র্যের সঙ্গে তাদের আজন্ম মিতালি, কিন্তু অন্ধকারের শক্তির কাছে মাথা নোয়াতে তারা এখন আর রাজি নয়।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ আর ইভটিজিং ছিল এই জনপদের অভিশাপ। সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির দিশারি হয়ে এসেছে ‘হোপ’ প্রকল্প। নেটজ-বাংলাদেশের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ আজ এক সামাজিক বিপ্লবে রূপ নিয়েছে। ২১টি গ্রামের কয়েক হাজার কিশোরী এখন আত্মরক্ষার পাঠ নিয়ে বুক ফুলিয়ে পথে বেরোচ্ছে।
বুলি দ্বারা উচ্চবিদ্যালয়ের তহুরা বলে, তিন মাসের প্রশিক্ষণ আমাকে আগাগোড়া বদলে দিয়েছে। আগে একা পথে চলতে ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। এখন দুষ্ট ছেলেরা আমাদের দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। গ্রামবাসী আমাদের ডাকে ‘সাহসী কন্যা’ বলে।
একই সুর শোনা গেল বাঁশমালি পরিবারের মেয়ে রূপা রানীর কণ্ঠেও। তার ভাষায়, কারাতে কেবল শরীর নয়, তাদের মনকেও পাথরের মতো শক্ত করেছে।
স্বপ্নীল দেবীর লড়াইটা আবার বহুমাত্রিক। অভাবের সংসারে বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করেও সে দমে যায়নি। অবসরে মেতে ওঠে ফুটবলের নেশায়। তার চোখেমুখে আগামীর ম্যারাডোনা হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্নীলের সাফ কথা-দারিদ্র্য আছে সত্য, কিন্তু আমাদের মনোবল পাহাড়ের মতো। কারাতে শিখে আমরা ভয়কে জয় করেছি, এবার অভাবকেও হারাব।
রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম মনে করেন, মূল বাধা কেবল অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। তিনি বলেন, প্রান্তিক ঘরের মেয়েরা খেলাধুলা, শিল্প ও সাহিত্যে যে অভূতপূর্ব লড়াই করছে, তা অভাবনীয়। সঠিক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এরাই একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে। ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানাও এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, এই সাহসী মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প তিনি ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছে দেবেন।
