যশোরে ছিনতাইয়ের নতুন ধরন
কাপল দেখলেই থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, ছিনিয়ে নেয় টাকা
Advertisement
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কলেজ শিক্ষার্থী সানি ও তার বান্ধবী হাসপাতালে রোগী দেখে রিকশায় বাসায় ফিরছিলেন। পথে তাদের গতিরোধ করে পালসার মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক। তারা রিকশা থেকে সানিকে নামিয়ে কৈফিয়ত তলব করে। জানাতে চায়-কেন তারা ঘাড়ের ওপর হাত দিয়ে যাচ্ছিলেন? তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী? এরপর মোবাইল ফোন বের করতে বলে এবং বাসায় ফোন দিয়ে অভিভাবককে আসতে বলে। এরপর একজন সানির বান্ধবীকে উলটো পাশে নিয়ে কাছে কত টাকা আছে, মোবাইল ফোন ইত্যাদি দিয়ে দিতে বলে। এ সময় চাকু প্রদর্শন করায় ভয়ে বান্ধবী ওয়ালেটে থাকা ১ হাজার টাকা দিয়ে দেন। কিন্তু এতে মন ভরেনি ছিনতাইকারীদের। তারা বিকাশে থাকা টাকার অঙ্ক এবং ব্যাংকের ডেবিট কার্ড নিয়ে পাসওয়ার্ড বলতে বলে। এ সময় সানি ও তার বান্ধবী জানান, বিকাশ কিংবা কার্ডে কোনো টাকা নেই। শেষে ছিনতাইকারীরা সানিকে পরামর্শ দেয়-এভাবে রাস্তাঘাটে মেয়ে বন্ধু নিয়ে যেন আর না বের হন। ২ জুন রাত ৮টার দিকে যশোর শহরের ব্যস্ততম মুজিব সড়কের পঙ্গু হাসপাতালের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
সানি বলেন, ‘বিষয়টি আমি যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ‘ক’ সার্কেলকে জানিয়েছি। তিনি আশ্বাস দেন, বিষয়টি দেখবেন।’
শহরের বাসিন্দা, সাংস্কৃতিককর্মী শর্মিষ্ঠা টুপা জানান, তিনি ৪ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হাঁটতে বের হন। সোয়া ৭টার দিকে পোস্ট অফিসপাড়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেন সাদা একটা প্রাইভেট কার তার পেছনে আসছে। থামছে আবার চলছে। দ্রুত হেঁটে তিনি ভোলাট্যাংক রোডে পৌঁছাতে গাড়িটাও দাঁড়ায়। আবার হেঁটে নিজেদের গলিতে ঢুকে বাসায় কলিংবেল চাপতেই হাসবেন্ড নামেন। এদিকে গাড়ি থেকে একটা লোক নামে। তার চোখে কালো চশমা, আর মুখে মাস্ক।
স্বামীকে বিষয়টি বলার পর পেছন দিকে চেয়ে দেখেন গাড়িটি নেই। যশোর টিচার ট্রেনিং কলেজের একজন শিক্ষক স্ত্রীকে পৌঁছে দিতে রিকশায় শহরতলীর শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিলেন। রেল রোড থেকে একটি মোটরসাইকেল তাদের ফলো করতে করতে চাঁচড়া পর্যন্ত আসে। ওই শিক্ষক স্ত্রীকে রেখে ফেরার পথে মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবক জানতে চায় মহিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? যশোর শহরে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক-প্রেমিকা বা কাপলদের টার্গেট করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। তারা রিকশা চলাচলরতদের টার্গেট করে। সুযোগ পেলেই ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায়। সুযোগ বুঝে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেয়।
সম্প্রতি রেলগেট তেঁতুলতলা এলাকায় দিনদুপুরে মাহফুজুর রহমান (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং স্বর্ণালংকার লুটে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে তিনি নিজেই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন।
শুধু নতুন স্টাইলে ছিনতাই নয়, যশোর শহর ও শহরতলীতে এসির (এয়ারকন্ডিশনারের) তামার তার বা পাইপ চুরির হিড়িক চলছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়ি থেকে চুরি হচ্ছে মূল্যবান জিনিস। চলতি সপ্তাহে শহরের ষষ্টীতলাপাড়া এলাকায় অনুপ কুমার, বিশাখা রাণীসহ বেশ কয়েকজনের বাড়ি থেকে এসির ওই মূল্যবান কেবল চুরি হয়েছে। একটি এসির কেবল চুরি হলে ১০-১৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়।
ছিনতাই-চুরি বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. কাজী ফরিদুল ইসলাম বলেন, একটি অপরাধীচক্র খুবই তৎপর। শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্বামী-স্ত্রী বা যে কোনো পরিচয়ের নারী-পুরুষকে হঠাৎ ঘিরে ধরে নাজেহাল করে টাকা দাবি করে। চক্রটি ইতঃপূর্বেও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিল। তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হওয়ায় পুলিশ প্রশাসনের ভয়ে কিছুদিন চুপ থাকে। তবে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় তারা আবার সক্রিয় হয়েছে। তাদের দৌরাত্ম্যে নারী-পুরুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। নয়া স্টাইলে ছিনতাই ও চুরির বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান বলেন, ছিনতাইয়ের নতুন ধরন সম্পর্কে জেনেছি। ক্ষতিগ্রস্তরা থানায় অভিযোগ দিলে আমরা অ্যাকশনে যেতে পারি। এসির কেবল চুরির বিষয়ে তিনি বলেন, মাঝে চক্রের বেশ কয়েকজনকে ধরে জেলে পাঠিয়েছি। কোনো ঘটনা ঘটলে থানায় অবহিত করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
