হাজার কোটি টাকার খাসজমি
কক্সবাজারে মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে দখল
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হাজার কোটি টাকার খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতে সৈকতে প্রবেশের ডান পাশে ১০ একরের বেশি জমি টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে দখলে নেয় একটি চক্র। দুই শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করে ওই জমি দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হকাররা। তবে দখল করা জমি উদ্ধারে রোববার বিকালেই অভিযান শুরু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে জমির সঠিক পরিমাণ ও বাজারমূল্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরেজমিন দেখা যায়, সুগন্ধা সৈকতের প্রবেশপথের ডান পাশে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে বড় একটি এলাকা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার মধ্যরাতে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক সেখানে গিয়ে দ্রুত বেড়া নির্মাণ করেন। তাদের সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জনের একটি দলও সেখানে অবস্থান করছিল।
কর্মরত কয়েকজন শ্রমিকের ভাষ্য, প্রভাবশালী মন্ত্রীর কাছের কয়েকজন ব্যক্তি ও অনুসারীই জায়গাটি ঘেরাও করেছেন। তবে তারা কারা, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো নাম বলতে রাজি হননি। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা জানান, ঘেরাওয়ের আগে ওই এলাকায় দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল। রাতের মধ্যে দোকান সরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের চাপ দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন হকারের সঙ্গে শ্রমিকদের কথা কাটাকাটি হয়। শনিবার বিকালে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুর করেন। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় দেখানোর পাশাপাশি মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তাদের জায়গা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। মন্ত্রীর নাম শুনে অনেকে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে। প্রভাবশালী মন্ত্রীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন রিপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমি দখলের ছবি শেয়ার করে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, সালাহউদ্দিন ভাইয়ের নির্দেশে সাগরের বালিয়াড়ি থেকে দোকান উচ্ছেদ করা হলো, অস্থায়ী কার্ড বাতিল করা হলো। ফলে হাজার খানেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কয়েক কোটি টাকা লোকসান হলো। এখন আবার সালাহউদ্দিন ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে এস আলমের প্লট রাতের আঁধারে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো।
তিনি আরও লেখেন, ‘সালাহউদ্দিন ভাইয়ের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সরকারকে রাজস্ব দেওয়া কার্ডধারীরা দোকান করতে না পারলেও অবৈধভাবে ঠিকই বালিয়াড়িতে দোকান করছে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে খালি প্লট দখল করে মার্কেট তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দখলবাজরা।
শাহাদাত হোসেন রিপন পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, ‘সালাহউদ্দিন ভাই কি আসলেই এসবের সঙ্গে জড়িত? নাকি উনার নাম ভাঙিয়ে উনার কোনো প্রতিনিধি এসব করছে, এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?’
এদিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের জেলা প্রতিনিধি আলমগীর চৌধুরীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যাওয়ার আগেই এক পক্ষ দখলের কাজটা সেরে নিল! সুগন্ধায় যে খেলা চলছে, তা কোন লেভেলে গিয়ে ঠেকেছে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন, আমি জেলার বাইরে আছি। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। দয়া করে আপনারা মন্ত্রীকে বিষয়টি জানান।
নাম ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রীর পিএস হাসনাত আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রী স্যারের নাম ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ তার নাম ব্যবহার করে থাকে এবং জায়গাটি খাসজমি হয়, তাহলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ডিসি ব্যবস্থা নেবেন। আর যদি জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, দখল করা জায়গাটি এস আলম গ্রুপের বাতিল হওয়া প্লটের অংশ। দখলকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম বলেন, সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় জড়িত একজনকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই স্থানের মালিকানা বা ইজারার পক্ষে কোনো বৈধ নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে উপস্থাপনের জন্য বলা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসন কাউকে সরকারি জমি দখল বা ঘেরাও করার অনুমতি দেয়নি। অবৈধ অবকাঠামো ও টিনের বেড়া অপসারণের জন্য শনিবার বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ দখল বজায় রাখার চেষ্টা করা হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান যুগান্তরকে বলেন, ‘দখলের বিষয়টি ইতোমধ্যে অনেকে আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে উচ্ছেদসহ এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে রোববার বিকালে দখল করা জমি উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবৈধভাবে দেওয়া টিন ও বাঁশের বেড়া অপসারণের উদ্যোগ নেন। এ সময় দখলমুক্ত করে সরকারি জমি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
