মানসিক স্বাস্থ্য সংলাপে বক্তারা
দক্ষ জনবল ও চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের ৯২ শতাংশই চিকিৎসার আওতার বাইরে। চিকিৎসক সংকট, সামাজিক কুসংস্কার, অসচেতনতা ও সেবার সীমিত সুযোগ এর অন্যতম কারণ। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ফোকাসড গ্রুপ ডিসকাশন’ শীর্ষক মানসিক স্বাস্থ্য সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ-এর উদ্যোগে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি) আয়োজিত সংলাপের সহযোগিতায় ছিল অপসোনিন ফার্মা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান রয়েল।
আলোচনায় ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ বলেন, মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করতে হবে। চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও কাউন্সেলর তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সচেতনতা বাড়ালেই হবে না, চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিতে হবে। শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এ খাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিএপি সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, মানসিক সমস্যার চিকিৎসা আছে-এ ধারণা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কোর্স বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রয়োজনীয় পদে চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ইনস্টিটিউটে জনবল ও সেবার সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় নিয়োগ, আধুনিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ, কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যক্রম চালু এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ে জাতীয় জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমএইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। গবেষণা, একাডেমিক কার্যক্রম এবং বিশেষায়িত কোর্স বাড়ানো প্রয়োজন।
একই বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান মাকসুদ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিএপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মোহাম্মদ রাহেনুল ইসলাম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ বড় চ্যালেঞ্জ। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতির সমন্বয় প্রয়োজন।
সাজেদা ফাউন্ডেশনের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করতে হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ডেপুটি ডিরেক্টর শাহ নজরুল ইসলাম বলেন, ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ধর্মীয় নেতারা ভূমিকা রাখতে পারেন।
সিআরপির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট) নুসরাত জাহান রিমা মানসিক স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনসেবায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ও লাইসেন্সবিহীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক (ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি) ডা. জহির উদ্দিন তাদের প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির ওপর কোর্স খোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সাইকোলজিস্টদের সম্মান নিশ্চিত করতে মনিটরিংয়ের জন্য একটি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার কথা বলেন।
