ভালোবাসার টানে ফিনল্যান্ড থেকে সরিষাবাড়ী
সন্তানসহ সিমিকে আপন করে নিলেন মিকাইল
Advertisement
জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভালোবাসার কি কোনো সীমানা আছে? ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব-কোনোটিই কি পারে হৃদয়ের টানকে আটকে রাখতে? জামালপুরের সরিষাবাড়ীর এক প্রত্যন্ত গ্রামের গল্প আবারও সেই প্রশ্নের জবাব দিল। ভালোবাসার মানুষকে জীবনসঙ্গী করতে সুদূর ফিনল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন মিকা পেত্তেরি সিমোলা। বিয়ে করেছেন সরিষাবাড়ী উপজেলার এক চা বিক্রেতার মেয়ে শান্তিনা জাহান সিমিকে। শুধু সিমিকেই নয়, তার পাঁচ বছরের সন্তান রায়ান বাবুকেও নিজের সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেছেন তিনি। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মিকা হয়েছেন ‘মিকাইল’।
এ যেন শুধু দুজন মানুষের বিয়ের গল্প নয়; স্বামীহারা এক নারীর নতুন করে স্বপ্ন দেখার, একটি শিশুর জীবনে নতুন অভিভাবক পাওয়ার এবং ভিন্ন দেশের দুই মানুষের ভালোবাসায় নতুন সংসার গড়ার গল্প।
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার আউনা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। পেশায় একজন চা বিক্রেতা। তার মেয়ে সিমির জীবনে নেমে এসেছিল গভীর শোক। তিন বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যায়। সন্তান রায়ানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। সন্তানকে ঘিরেই চলছিল তার জীবনসংগ্রাম।
এরই মধ্যে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয় ফিনল্যান্ডের নাগরিক মিকার সঙ্গে। শুরুতে মোবাইল ফোনে কথোপকথন, ধীরে ধীরে একে অপরকে জানা, আর সেই পরিচয় থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা।
একপর্যায়ে সিমিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন মিকা। সিমিও সম্মতি জানান। এরপর আর দূরত্বকে বাধা হতে দেননি তারা। ভালোবাসার সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু হয় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। সিমিকে বিয়ে করতে ফিনল্যান্ড সরকারের প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেন মিকা। এরপর গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশে পৌঁছান তিনি। বিদেশের মাটি থেকে বাংলার এক গ্রামে এসে ভালোবাসার মানুষকে জীবনসঙ্গী করার এই যাত্রা তাদের সম্পর্ককে দেয় নতুন মাত্রা।
বাংলাদেশে আসার পর জামালপুরে জজ কোর্টে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন মিকা। তার নতুন নাম রাখা হয় মিকাইল। একই দিন কাজির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পন্ন হয় তাদের। সিমির জীবনের নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছোট্ট রায়ান বাবুর ভবিষ্যতও। মিকাইল তাকেও নিজের সন্তান হিসাবে সাদরে গ্রহণ করেছেন।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সিমি বলেন, ‘আমার আত্মীয়দের মাধ্যমে মিকাইলের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর মোবাইলে আমাদের যোগাযোগ হতো। একপর্যায়ে সে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে আমি রাজি হই। এখন আমাকে ও আমার সন্তানকে ফিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাকে বিয়ে করে আমি অনেক খুশি।’
সিমির চোখেমুখে ফুটে নতুন জীবনের স্বপ্নময় প্রত্যাশা। অতীতের শোক আর সংগ্রাম পেরিয়ে এবার সন্তানকে নিয়ে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ব্যতিক্রমী এই বিয়ে ঘিরে দৌলতপুর গ্রামে তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও আনন্দের পরিবেশ। বিদেশি বরকে দেখতে ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। নবদম্পতির জন্য দোয়াও করছেন তারা। প্রতিবেশী আজগর আলী বলেন, ‘সিমি একজন ভালো মানুষ। তাদের বিয়েতে আমরা গ্রামবাসী সবাই খুশি।’
আগামী ১৮ অক্টোবর ফিনল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে মিকাইলের। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া, ভিসা ও পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্ত্রী সিমি ও তার সন্তানকে ফিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
