পশু চিকিৎসকের হাতে ডেলিভারি!
মারা গেল নবজাতক * গুরুতর অবস্থায় প্রসূতি * তদন্ত কমিটি গঠন
Advertisement
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পশু চিকিৎসক পুরুষ এবং হাতুড়ে নারী স্বাস্থ্য সহকারীকে দিয়ে সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রসবকালীন জটিলতায় নবজাতক মারা গেছে এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ওই প্রসূতি। সংক্রমণজনিত কারণে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিষয়টি জানাজানি হলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রসূতির অপচিকিৎসা, নবজাতকের মৃত্যু এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন নেটিজেনরা। এ ঘটনায় সোমবার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেরিঘাটসংলগ্ন শাহাদাত মেম্বার পাড়ায় এ ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী তরুণীর নাম চাঁদনী আক্তার। তিনি রিকশাচালক চানমিয়া শেখ ও চায়না আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার স্বামীর নাম মুন্নাফ শেখ। বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলায়। বিয়ের চার বছর পর এটাই ছিল চাঁদনীর প্রথম গর্ভধারণ ও অনেক স্বপ্ন-সাধনার সন্তান।
সরেজমিন আলাপকালে চাঁদনীর বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যরা জানান, চাঁদনীর গর্ভকালীন কোনো জটিলতা ছিল না। মাস পূর্ণ করে ৮ অক্টোবর রাত ২টার দিকে চাঁদনীর প্রসব ব্যথা শুরু হলে ভোর ৪টার দিকে রোকেয়া বেগম ওরফে রুকি নামে গ্রামের এক ধাত্রীকে ডেকে আনেন তারা। তিনি অনেকক্ষণ ধরে তার মতো করে চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় সকাল ৭টার দিকে খবর দেওয়া হয় গ্রামের পশু চিকিৎসক আসলাম আলী সরদারকে। তিনি এসে চাঁদনীর শরীরে একটি স্যালাইন পুশ করেন। কিন্তু সন্তান প্রসবের কোনো লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় আসলামকে ফোন করে আবারও সেখানে যেতে বলা হয়। আসলাম এবার গিয়ে চাঁদনীকে প্রসব ব্যথা ওঠার জন্য একটি ইনজেকশন দেন। এর ২ ঘণ্টা পর সন্তানের মাথা বেরিয়ে আসে। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও চূড়ান্ত প্রসব হচ্ছিল না। এ পর্যায়ে আসলাম দৌলতদিয়া বাজারের ফার্মাসিস্ট ও লাভলী আক্তার রথি নামে ডিএমএফ কোর্স সম্পন্নকারী এক স্বাস্থ্য সহকারীকে ফোন দিয়ে জরুরি আসতে বলেন। রথি দৌলতদিয়া মজিদ শেখের পাড়ার বাসিন্দা জুয়েল বেপারীর স্ত্রী। রথি গিয়ে চাঁদনীর সন্তান প্রসবের রাস্তার সাইড কেটে একটি মৃত শিশু বের করেন।
এভাবে শিশু বের করায় চাঁদনীর অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ শুরু হলে রথি গজ গুঁজে দিয়ে যেনতেনভাবে তিনটি সেলাই করে দেন এবং তার দোকান থেকে কিছু ওষুধ দিয়ে দেন। এ কাজে তিনি চার হাজার টাকা বিল করলেও চাঁদনীর রিকশাচালক বাবা তিন হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে পারেন। এই টাকা আসলাম ও রথি ভাগ করে নেন।
এদিকে চাঁদনীর স্যালাইয়ের স্থানে ইনফেকশন হয়ে গেলে তিনি অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। এ অবস্থায় তাকে শনিবার গোয়ালন্দ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে লেবার ওয়ার্ডের ২ নং বেডে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা খুবই জটিল অবস্থায় রয়েছে।
খবর পেয়ে সোমবার দুপুরে সরেজমিন চাঁদনীর বাবার বাড়িতে যান গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া একজন গর্ভবতীকে সন্তান প্রসব করানোর চিকিৎসা দিতে পারেন না। সেখানে আসলাম কিংবা রথির মতো টুকটাক কোর্স সম্পন্নকারীদের তো এ বিষয়ে কোনো এখতিয়ারই নেই। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিভিল সার্জন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা হয়েছে। ব্যাপারটি যেহেতু জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট, তাই ভিকটিমের পরিবার কোনো মামলা-মোকদ্দমা না করলেও তারা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
