Logo
Logo
×

Advertisement

খবর

প্রধানমন্ত্রীর সফরে উপকূলের স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা

শিল্পায়ন, টেকসই বেড়িবাঁধ ও পর্যটন উন্নয়নে উদ্যোগ চান খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরার অধিবাসীরা

Advertisement

Icon

আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

নদী-খাল ঘিরেই গড়ে উঠেছে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার জনপদ। একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, অন্যদিকে মোংলা সমুদ্রবন্দর। সম্ভাবনার এমন সমাহার থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনে স্বস্তি খুব একটা আসেনি। নদীভাঙন ও দুর্বল বেড়িবাঁধের আতঙ্ক, সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা, সুন্দরবনে বনদস্যুদের ভয়-সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হয় উপকূলবাসীকে। অন্যদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ, জ্বালানি সংকট, বন্দরের নাব্য নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতায় পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও।

এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা ও বাগেরহাট সফর ঘিরে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও উন্নয়নসংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা-সুন্দরবন ও উপকূল সরেজমিন দেখার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশে আসবে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টের পাশাপাশি খুলনা ও বাগেরহাটের কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নলিয়ান ও আশপাশের এলাকায় কয়েকদিন ধরে চলে নানা প্রস্তুতি। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে স্থানীয় মানুষ নিজেদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এই এলাকার মানুষের চাহিদা-নিরাপদ পানীয় জল, উন্নত চিকিৎসা, ভালো সড়ক আর টেকসই বেড়িবাঁধের প্রত্যাশা পূরণ হবে এমনটাই মনে করছেন তারা।

খুলনা-১ আসনের সংসদ-সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অঞ্চলে আগমন স্থানীয় মানুষের জন্য আনন্দের বিষয়। তাকে স্বাগত জানাতে উপকূলজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খুলনা-৩ আসনের সংসদ-সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের সম্ভাবনা সরেজমিন দেখতে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর গুরুত্বপূর্ণ।

টেকসই বেড়িবাঁধের প্রত্যাশা : উপকূলের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ একটি আতঙ্কের নাম। নদীর পানি বাড়লে কিংবা জোয়ারের প্রবল চাপে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে। কোথাও ভাঙন দেখা দিলে ঝুঁকিতে পড়ে বিস্তীর্ণ জনপদ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এই তিন জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১০০৭.৩৫ কিলোমিটার। ১১ অক্টোবর দাকোপের ঢাকি নদীর বাঁধ ভেঙে বিশাল এলাকায় পানি প্রবেশ করে। সুজন খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, এই অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ী সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করতে হবে। নদীর গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে বাঁধের নকশা ও নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। তার মতে, উপকূলকে সুরক্ষিত না করে বড় উন্নয়ন প্রকল্প নিলেও তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

সুপেয় পানি, চিকিৎসা ও সড়কই বড় চাওয়া : সুন্দরবনসংলগ্ন উপজেলাগুলোর অর্থনীতির চালিকাশক্তি মৎস্যসম্পদ আহরণ। এসব এলাকার মানুষের কাছে নিরাপদ পানীয় জল, জরুরি চিকিৎসা এবং চলাচলের উপযোগী সড়কের সংকট প্রকট। সুতারখালীর বাসিন্দা সুখরঞ্জন মন্ডল জানান, এলাকায় হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসার জন্য মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুর্গম এলাকা থেকে অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন। কাঁচা রাস্তা দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যেতে রোগীর জীবন যায় যায় অবস্থা। হাসপাতালের পাশাপাশি সড়ক মেরামত জরুরি। দাকোপের বাসিন্দা ইসরাফিল বলেন, সুপেয় পানির সংকটে অনেক মানুষ নদী ও পুকুরের পানি পান করতে বাধ্য হন।

নাব্য ফিরলে বাড়বে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম ভরসা মোংলা সমুদ্রবন্দর। পদ্মা সেতু চালু হওয়া এবং খুলনা-মোংলা রেললাইন চালুর পর বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বন্দরের নাব্য, নিয়মিত ড্রেজিং, বড় জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা এবং আধুনিক পণ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, নৌপথের নাব্য রক্ষা করা না গেলে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে জেটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সেবায় দীর্ঘসূত্রতা কমানোও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন এম. রফিকুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক নদীবন্দরগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মোংলা বন্দরের নাব্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। আর্জেন্টিনা ও চীনের নদীবন্দরগুলো কীভাবে নাব্য বজায় রাখছে, তা পর্যালোচনা করে নিয়মিত ও পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বন্দরে জাহাজ চলাচল বাড়বে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য শেখ শওকত আলী বলেন, শস্যবাহী জাহাজের পাশাপাশি কনটেইনারবাহী ও অন্যান্য বড় জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বন্দরে জাহাজের সংখ্যা ও আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সুন্দরবনে বনদস্যুতা কমানো ও ইকোট্যুরিজম বৃদ্ধি : সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের পাশাপাশি বনসংলগ্ন হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। কিন্তু বনদস্যুদের অপহরণ, জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি এবং চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ বনজীবীদের জীবন-জীবিকা। বর্তমানে সুন্দরবনের দুই বিভাগ মিলে প্রায় ১৫টি দস্যু বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সুন্দরবন পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, বনে জেলের থেকে ডাকাত বেশি। চাঁদার টাকা দিতে দিতে সব শেষ। নতুন সরকারপ্রধানের কাছে দস্যুমুক্ত সুন্দরবন দাবি করেছেন তিনি।

একই সঙ্গে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপদ নৌযান, প্রশিক্ষিত গাইড, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি হোটেল, পরিবহণ, খাবারের দোকান, নৌপরিবহণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসারও প্রসার ঘটবে।

শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধির দাবি : এই অঞ্চলে মোংলার মতো একটি সমুদ্রবন্দর থাকার পরেও শিল্পায়নে প্রত্যাশিত গতি পায়নি। খুলনার ক্রিসেন্ট, পিপলস ও স্টার জুট মিলের মতো এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের জীবিকা ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও পুরোনো শিল্প পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাব, খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও বিনিয়োগের পথে বাধা হিসাবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্প স্থাপন, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে।

খুলনা নগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বচক্ষে এই এলাকার জীবনমান যাচাই করতে এসেছেন। আমরা এখানকার সমস্যা-সম্ভাবনাগুলো উনার কাছে তুলে ধরব। একই সঙ্গে এই এলাকার শিল্পায়নের বিষয়েও দাবি জানাব। তিনি অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন বলে আশা করি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বাস-ইজিবাইক সংঘর্ষ ছেলেসহ দুইজন নিহত আহত মা-বাবা

ছেলেসহ দুইজন নিহত আহত মা-বাবা

প্রধানমন্ত্রীর সফরে উপকূলের স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর সফরে উপকূলের স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা

দুর্ধর্ষ মান্নান বাহিনীর কাণ্ড মাদক পাচার দেখে ফেলায় হামলা, শিশু গুলিবিদ্ধ

মাদক পাচার দেখে ফেলায় হামলা, শিশু গুলিবিদ্ধ

পর্যটন সেমিনারে বক্তারা মহামায়া লেকে লাইভ ফিশ মিউজিয়াম সম্ভব

মহামায়া লেকে লাইভ ফিশ মিউজিয়াম সম্ভব

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম