কুমেক হাসপাতাল
দালালচক্রে জিম্মি সেবাপ্রার্থীরা
প্রশ্রয় দিচ্ছে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সিন্ডিকেট * প্রতিবাদ করলে হয়রানি করা হয় নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের ফটকে ২৪ ঘণ্টাই ওত পেতে বসে থাকেন দালালচক্রের সদস্যরা। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগী এবং তাদের স্বজনদের জীবন দালালদের হাতে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের ফটকে রোগী ঢুকলেই পিছু নেয় দালালরা। রোগী ভর্তি, বেড বুকিং, ডাক্তার দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন এবং ওষুধ ক্রয়সংক্রান্ত সব তারা করে দিতে চান এবং টাকা দাবি করেন। অনেক সময় ভয়ও দেখান তারা। এছাড়া রোগীকে চাপ দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে স্থানান্তর, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করা এবং হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দালালরা তিন শিফটে ভাগ হয়ে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি পালন করছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেটের শেলটারে দালালচক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
রোগীদের অভিযোগ, এ হাসপাতালে দালাল ছাড়া ভর্তি, সিট, অপারেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। আবার দালাল ধরলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সকাল থেকে বিকাল একটি গ্রুপ আউটডোর ও প্যাথলজি বিভাগের সামনে অবস্থান নেয়। বিকাল থেকে রাত একটি গ্রুপ ইনডোর ও ফার্মেসিসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় থাকে। আবার রাত থেকে সকাল একটি গ্রুপ জরুরি বিভাগ ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগে রোগীদের ফাঁদে ফেলার জন্য ওতপেতে থাকে। বিভিন্ন কাজ করে দিয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তাদের মূল কাজ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নথিপত্র ও তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দালালদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসন সময়ে সময়ে অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু কিছুতেই দমন হচ্ছে না দালালচক্র। তবে এ বিষয়ে কুমেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. শাহজাহান বলেছেন, দালাল ও অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট প্রতিরোধে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগ্গির ভালো ফল আসবে।
রোগীদের অভিযোগ, ১ বছরের বেশি জোরালে অভিযান না থাকায় দালালচক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কুমেক হাসপাতাল ফটকের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো এ দালালদের শেলটার দিচ্ছে। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের অভিযোগ, দালালদের অপকর্মে বাধা দিতে গেলে বা রোগীদের সচেতন করতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের উলটো নাজেহাল করা হয়। তাছাড়া রোগী বা তাদের স্বজনরা দালালি বা কমিশনের প্রতিবাদ করলে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পথে মারধর করা হয়। সেখানেও একধরনের রাজত্ব কায়েম করেছে দালালচক্র।
মনোহরগঞ্জ থেকে আসা ক্যাজুয়ালটি বিভাগের রোগী ছালামত উল্লাহ বলেন, হাসপাতালে ঢুকার পথেই দালালরা পথ আটকে ধরে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করানো, ওষুধ ক্রয় কিংবা সেরকারি হাসপাতালে ভালো ট্রিটমেন্ট দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। তিতাস থেকে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসে পদে পদে দালালদের দৌরাত্ম্যের শিকার হতে হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দালালমুক্ত করতে স্থায়ী সিসিটিভি নজরদারি সক্রিয় করতে হবে। আনসার ও নিরাপত্তারক্ষীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
