ভ্রমণ
দেশের আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান
Advertisement
লেখা ও ছবি সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের খোরাকও পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি মানুষেরই স্বাভাবিকভাবে একটি বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়। একইভাবে চলমান ব্যস্ততায় বিরক্তি চলে আসা অবান্তর নয়। তাই বর্তমান সময়ে মানুষ সুযোগ পেলেই বের হয়ে পড়েন অজানা ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। ইতালীয় জেনোয়ার অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভ্রমণে না বের হলে কোনোদিন হয়তো আমেরিকার আবিষ্কারই হতো না। এ কথায় বেশ গভীরভাবে বোঝা যায়, পর্যটনের মাহাত্ম্য কতখানি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য একটি অসাধারণ গন্তব্যস্থল। দেশের বিভিন্ন কোনায় ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান, যা ভ্রমণকারীদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। আজ আমরা বাংলাদেশের কিছু প্রিয় গন্তব্য নিয়ে আলোকপাত করব।
কক্সবাজার
সারি সারি ঝাউবন, বালুর নরম বিছানা, সামনে বিশাল সমুদ্র। অশান্ত মনকে শান্ত করতে বেড়িয়ে আসতে পারেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। রয়েছে নীল জলরাশির গর্জন। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরী, সেন্টমার্টিন কক্সবাজারকে করেছে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। এখানে গিয়ে বেড়াতে পারেন হিমছড়ি ও ইনানী বিচেও। কক্সবাজারের ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে রয়েছে এ দুটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান।
যেভাবে যাবেন : যারা ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে চান তারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার অথবা সরাসরি বাসে কক্সবাজারে যেতে পারেন। কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বেশকটি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ সাত হাজার টাকায় কক্সবাজারে রাতযাপন করা যায়।
সাজেক
পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা আর এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে যে কয়টা নাম মাথায় আসে, এর মধ্যে নিঃসন্দেহে প্রথম বেছে নেওয়া যায় সাজেক ভ্যালিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ ফুট ওপরে অবস্থিত সাজেক ভ্যালি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আদর্শ স্থান এবং এখানে বিদ্যমান সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যটকদের মূল আকর্ষণের কারণ। আঁকাবাঁকা পথ আর এলোমেলো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সুবিন্যস্ত পাহাড়ি রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে সাজেক ভ্যালিতে পৌঁছে যাবেন, টেরও পাওয়া যাবে না। ভোরের সতেজ বাতাস, সকালের কোমল রোদ, খুব কাছ থেকে মেঘদের আলত করে ছুঁয়ে যাওয়া, সীমানার বাইরে যতদূর চোখ যায় শুধুই আকাশচুম্বী সবুজ পাহাড়, আদিবাসীদের আন্তরিকতা এবং আঁধার নেমে এলে নীল আকাশে, ছায়াপথের আনাগোনা এসব শুধু একটা জায়গা থেকেই উপভোগ করা গেলে বিষয়টা নেহাত মন্দ নয়।
যেভাবে যাবেন : সাজেক যেতে হলে আপনাকে প্রথমে খাগড়াছড়ি যেতে হবে, তারপর সেখান থেকে চাঁদের গাড়ি (জিপ) বা অন্য কোনো মাধ্যমে সাজেক ভ্যালিতে যেতে পারবেন। বিকল্প পথে, আপনি ঢাকা থেকে রিজার্ভ লঞ্চে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি যেতে পারেন এবং তারপর সেখান থেকে সাজেক যেতে পারবেন।
সুন্দরবন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের লীলাভূমি এ বিশ্বের ঐতিহ্য সুন্দরবন। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি খুলনা শহরে এসে হোটেলে অবস্থান করে পছন্দের ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুন্দরবন যাত্রা করা যায়। আবার হোটেলে না উঠে সরাসরি ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নির্ধারিত সময়ে জাহাজে চড়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। সুন্দরবনের করমজল বন্য ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হারবাড়িয়া ইকো সেন্টার, কটকা, শেখেরহাট টেম্পল, কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম সেন্টার, মান্দারবাড়িয়া অভয়ারণ্য নামের স্পটগুলো পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত। এসব স্পটে কুমির প্রজনন, অসুস্থ হরিণের পরিচর্যাসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ভাগ্য ভালো হলে হাঁটতে হাঁটতে বানর, হরিণ, গুইসাপ, কাঁকড়া অথবা কুমিরের ঘুরে বেড়ানো দৃশ্যও দেখতে পারেন।
যেভাবে যাবেন : অল্প সময়ে কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণের স্বাদ নিতে হলে করমজলই শ্রেষ্ঠ। মোংলা বন্দর থেকে নৌপথে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট নৌকায় চড়ে এখানে যাওয়া যায়।
নিঝুম দ্বীপ
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় নিঝুম দ্বীপের অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এ চর ইছামতীর চর হিসাবেও পরিচিত। প্রচুর গাছপালা থাকার সুবাদে এ দ্বীপটি জাতীয় উদ্যান হিসাবে স্বীকৃতি পায়। এখানে প্রচুর কেওড়া গাছ আছে। এ ছাড়া এ দ্বীপটি হরিণের অভয়ারণ্যের জন্যও সুপরিচিত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যানগ্রোভ বন হিসাবে এ দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের খুব আকর্ষণ করে। এখানে পৌঁছানো কিছুটা ঝক্কির ব্যাপার হলেও এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নদী ও সড়কপথে নিঝুমদ্বীপে যাওয়া যায়। সবচেয়ে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা হলো ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে হাতিয়া, সেখান থেকে নিঝুমদ্বীপ। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকাল সাড়ে ৫টায় একটিমাত্র লঞ্চ হাতিয়ায় তমুরদ্দী ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে পরদিন সকাল ৯টা বেজে যাবে। তমুরদ্দী ঘাট থেকে ঢাকার ফিরতি লঞ্চ ছাড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায়। তমুরদ্দী ঘাট থেকে সিএনজি অটোরিকশায় বা মোটরসাইকেলে মোক্তারিয়া ঘাট পৌঁছা যাবে। বাকি পথটা একইভাবে পাড়ি দিতে হবে।
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য কুয়াকাটার প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নেই। প্রকৃতির উপহার দীর্ঘ সাগর সৈকত সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বের আকর্ষণীয় সমুদ্রসৈকতগুলোর মধ্যে কুয়াকাটা অন্যতম। কুয়াকাটার এ মনোরম সাগর সৈকতে গেলেই সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মতো বিরল, বর্ণিল দৃশ্য সহজেই অবলোকন করা যায় তাও একই স্থানে দাঁড়িয়ে।
যেভাবে যাবেন : গাবতলী বাসস্ট্যান্ড অথবা সায়েদাবাদ টার্মিনালে থেকে টিকিট নিয়ে সকাল-বিকাল-রাত যে কোনো সময় বাসে যাত্রার ৮ ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। যেতে পারবেন নদীপথে ডবল ডেকার লঞ্চযোগে। ঢাকা থেকে লঞ্চ ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। ১৪ ঘণ্টার মাঝেই পৌঁছে যাবেন। তারপর সকাল সকাল পটুয়াখালী জেলা শহরে পৌঁছে রিকশা, অটোরিকশায় চেপে বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রীবাহী বাসে কুয়াকাটা দুই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। কুয়াকাটা পৌঁছে আপনার বুকিং করা হোটেল-মোটেল বা গেস্ট হাউসে উঠতে পারবেন।
মনপুরা
মনপুরা ভোলা জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দ্বীপের মাধুর্যতা শীত মৌসুমে আরও বেড়ে যায়। দ্বীপে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করাটা বেশ মনোমুগ্ধকর হয় এ মৌসুমে। এখানে আউশ ও আমন ধানের ফলন হয়। প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। ঘন বনাঞ্চল এবং কিছু দিঘির সন্নিবেশ এ দ্বীপটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নয়নাভিরাম মনপুরা দ্বীপ।
যেভাবে যাবেন : বিছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় লঞ্চ হচ্ছে মনপুরা দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র বাহন। ঢাকার সদরঘাট থেকে এমভি ফারহান-৩ এবং ৪ নামে দুটি লঞ্চ প্রতিদিন বিকাল ৫টায় হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে সকাল ৭টা থেকে ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে মনপুরা দ্বীপে পৌঁছায়। লঞ্চ থেকে সূর্যোদয় দেখতে মোহনীয় লাগে।
রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা অবস্থিত সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায়। প্রায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের এ বনভূমিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৯৮২ সালে। এটি প্রায় ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রায় ৬২ প্রজাতির প্রাণী এবং প্রায় ১৬৭ প্রজাতির পাখির আবাস। এ অভয়ারণ্যে আছে অপরূপ সুন্দর ৩টি ট্রেইল, গোটা বনকে একনজর দেখার জন্য আছে সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে টমটমে চড়ে যেতে হবে নতুন ব্রিজ। সেখান থেকে সিএনজিতে চুনারুঘাট মধ্যবাজার পৌঁছে আরেকটি সিএনজিতে করে কালেঙ্গা বাজার নামতে হবে। তারপর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটলেই অভয়ারণ্যের প্রধান ফটক।
রাতারগুল
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হলো রাতারগুল। রাতারগুলের বনে শত শত হিজলে ফল ধরে আছে। বড় অদ্ভুত এ জলের রাজ্য। কোনো গাছের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে থাকে পানির নিচে। একটু ছোটগুলোর অর্ধেকই পানির নিচে। কোথাও মাছ ধরার জাল পেতে রেখেছে জেলেরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সত্যিই নয়নাভিরাম এ রাতারগুল।
যেভাবে যাবেন : সিলেট শহর থেকে রাতারগুলের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। তাই সিলেট থেকে সকালে রাতারগুল গিয়ে বিকালের মধ্যেই ফিরে আসা যায়। একসঙ্গে কয়েকজন হলে সারা দিনের জন্য সিএনজি কিংবা লেগুনা ভাড়া করে নিতে পারেন।
