পূজার আমেজে শাঁখারিবাজার
Advertisement
মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছে পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজারের অলিগলি। সরু পথের দুপাশে সারি সারি দোকান, কোথাও শাঁখের শুভ্রতা, কোথাও মাটির প্রদীপে নতুন নকশার কারুকাজ, আবার কোথাও শাড়ির রঙে চোখ আটকে যাচ্ছে। গলিতে ঢুকতেই নাকে এসে লাগে ধূপের সুবাস, মানুষের কোলাহল, দোকানিদের হাঁকডাক আর উৎসবের কেনাকাটায় মুখরিত পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাঁখারিবাজার।
শাঁখারিবাজারে পা রাখলেই চোখে পড়ে কোথাও ঝুলছে শাঁখা-পলা, কোথাও সাজানো কাঁসার বাসন, কোথাও ছোট ছোট মাটির তৈজসপত্র। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ পছন্দ করছেন শাড়ি, কেউ হাতে তুলে দেখছেন টিপের পাতা, আবার কেউ দরদাম করছেন পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী। দুর্গাপূজা সামনে রেখে এবার বাজারে বিশেষ নজর কাড়ছে নতুন নকশার মাটির প্রদীপ। প্রচলিত প্রদীপের পাশাপাশি এসেছে ব্যাটারিচালিত পানির প্রদীপ; যা তেল ছাড়া শুধু পানিতেই চলবে এবং ভিন্ন আকৃতি ও নকশার কিছু প্রদীপ। প্রদীপের দাম শুরু হয় ১০ টাকা থেকে। ছোট্ট মাটির শরীরে সূক্ষ্ম নকশা, কোথাও ফুলের ছাপ, কোথাও আলংকারিক বাঁক-সব মিলিয়ে প্রদীপগুলো যেন আলো জ্বলার আগেই উৎসবের গল্প বলতে শুরু করেছে।
প্রদীপের পাশে সাজানো রয়েছে পূজার আরও নানা উপকরণ। মাটির কলস, ধূপদানি, মাটির পাত্র, পূজার থালা, ঘণ্টা, শঙ্খ, ছোট ছোট প্রদীপসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। কারও হাতে কেনাকাটার তালিকা, কেউ আবার তালিকার বাইরেও পছন্দের কোনো জিনিস দেখে থেমে যাচ্ছেন। পূজার প্রস্তুতির এ ব্যস্ততার মধ্যেই যেন শাঁখারিবাজারের পুরোনো বাণিজ্যিক ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে পূজার কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা চোখে পড়ে নারীদের মধ্যে। শাড়ির দোকান থেকে প্রসাধনীর দোকান, সবখানেই তাদের আনাগোনা। কেউ খুঁজছেন পূজার দিনের জন্য পছন্দের শাড়ি, কেউ মিলিয়ে নিচ্ছেন ব্লাউজের কাপড়, কেউ আবার হাতে তুলে দেখছেন রঙিন টিপের পাতা। সঙ্গে রয়েছে আলতা, সিঁদুর, কাজল, চুড়ি ও নানা ধরনের প্রসাধনী।
কিছু দোকানে পূজা উপলক্ষ্যে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়। ফলে একদিকে পছন্দের পণ্য বেছে নেওয়া, অন্যদিকে বাজেটের মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার চেষ্টা দুয়ের সমন্বয়েই চলছে ব্যস্ততা। দোকানিদের মুখেও তাই উৎসবের দিনের প্রত্যাশা। পূজার দিন যত এগিয়ে আসবে, কেনাকাটার ভিড় আরও বাড়বে, এমনটাই আশা তাদের। দোকানের বিক্রেতা জানান, ‘পূজার সময় শঙ্খ, শাঁখা-পলা ও পূজার সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যায়। এখন ক্রেতা আসছেন, বেচাকেনাও আগের তুলনায় ভালো হচ্ছে।’ এ দোকানের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, শাঁখারি বাজারের ইতিহাস যেন ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে রঙিন কাগজের ফুল, আলোকসজ্জার সামগ্রী, সাজানোর মালা, ছোট ছোট প্রতিমা ও ঘর সাজানোর নানা উপকরণ। পূজার ঘর কিংবা বাসার এক কোণকে উৎসবের আবহে সাজিয়ে তুলতে এসব সামগ্রী কিনছেন অনেকে। বিশেষ করে মাটির তৈরি সামগ্রীগুলোর প্রতি রয়েছে আলাদা আকর্ষণ।
পূজার আগে শাঁখারিবাজারের সরু গলির ভিড় পেরিয়ে শাঁখা হাতে তুলে নেওয়া, মাটির প্রদীপের নকশা দেখে থেমে যাওয়া কিংবা পছন্দের টিপের পাতা বেছে নেওয়ার প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে যেন মিশে আছে বহুদিনের বাজার সংস্কৃতি। দুর্গাপূজার দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে এ বাজারের ব্যস্ততা, বাড়ছে মানুষের আনাগোনা আর উৎসবের রঙ। পুরান ঢাকার শতবর্ষী আবহে তাই শাঁখারিবাজার এখন শুধু পূজার কেনাকাটার ঠিকানা নয়, এ যেন উৎসবের আগে শহরের এক পুরোনো হৃদয়ে নতুন করে জেগে ওঠা প্রাণচাঞ্চল্যের গল্প।
