ভ্রমণ
কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব সৌন্দর্য
সেলিম আল রাজ
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী সৌন্দর্য দেখে যে কারও মন-চোখ জুড়াবে তার নৈসর্গিক দৃশ্যে। কী অপরূপ সেই রূপের মাধুর্য। সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মেঘমুক্ত আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে উঁকি দেওয়া এক নয়নাভিরাম মুহূর্ত। দূর পাহাড়ের চূড়া থেকে হাতছানি দেওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রেমে মাতোয়ারা ভ্রমণপিয়াসীরা। বেশ কয়েকবারের পরিকল্পনার পর সত্যি হতে চলল সেই স্বপ্নের যাত্রা। সাড়ে চারশ কিলোমিটারের বেশি পথ। চূড়ান্ত দিনক্ষণে সূর্য ডুবার আগেই আমাদের গাড়ি রওয়ানা দেয় নয়জন ভ্রমণপিয়াসী নিয়ে।
দারুণ উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মন। উদ্দীপনার জোয়ারে ঢেউ লাগে গৌরীপুর থেকে ময়মনসিংহে। আনন্দে ভাসে সবার ভাবনা। রাতের নীরবতায় শোঁ শোঁ শব্দে এগিয়ে চলে গাড়ি। মধুপুর গড় হয়ে টাঙ্গাইল মহাসড়কে দিই চা বিরতি। সতেজ মনে আবার ছুটি। যমুনা সেতু পাড়ি দিয়ে বারোটার দিকে পৌঁছাই বগুড়া শহরে। আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলে পৌঁছাই সোয়া বারোটা। দই ও সুস্বাদু খাবারের জন্য বেশ খ্যাতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। রাতের খাবার শেষে রওয়ানা দিলাম গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে উদ্দেশে। বনফুল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে হলো রাতের ভোজন। গল্প-গানে জমে উঠে পুরো রাত। ভোর পাঁচটায় পৌঁছাই তেঁতুলিয়া চৌরাস্তা বাজারে। ফজরের আজানের মধুর ধ্বনি কানে ভেসে আসে। আমরা চোখে-মুখে পানি দিয়ে তেঁতুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। এখান থেকে এক কিলোমিটারের পথ বাকি। ভোরের আলোয় পৌঁছে গেলাম তেঁতুলিয়া জিরো পয়েন্টে। আমাদের মতো অন্যরাও প্রবেশ করে মূল স্পটে। মোটরসাইকেলযোগে তরুণের দলও ছুটে এসেছে। আমরা ডাকবাংলোর পাশে গাড়ি থামিয়ে ফ্রেশ হলাম। কামাল ভাই, টিটু ভাই ও আবদুল্লাহ আল মামুনকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়লাম।
আমাদের পৌঁছানোর পরপরই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর পাশে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকে। আমাদের কেউ ডাকবাংলোর পাশে কেউবা মহানন্দা নদীর পাড়ে বসে অপেক্ষায় কাঞ্চনজঙ্ঘা অবলোকনে। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বত মায়াবী কাঞ্চনজঙ্ঘা। ভারতের সিকিম রাজ্য ও নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের মাঝে অবস্থিত এ পর্বতের উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার। নেপালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আর ভারতের উচ্চতম পর্বত হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়কন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা। এক কথায় অবস্থান ও সৌন্দর্যে চমৎকার এক সৃষ্টি। তেঁতুলিয়া থেকে ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা এবং সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ রূপ ফুটে ওঠে।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা নদী। কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয় নদীর স্বচ্ছ শীতল পানি। মেঘমুক্ত আকাশে ভাসা কাঞ্চনজঙ্ঘার আভা নদীতে পড়ে অপূর্ব রূপ ধারণ করে। ভ্রমণপিয়াসীরা খুঁজে পায় অনন্য আবেশ। পাড় থেকে নেমে পড়ে নদীর জলে। সকাল থেকে নদীতে দেখা মেলে পাথর সংগ্রহ করতে আসা স্থানীয় লোকজনের। অনেকেই পানির স্রোতে আসা পাথর সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করে। তেঁতুলিয়ায় চা বাগানের দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। ডাকবাংলো, নদীর পাড়ে সবুজ চা বাগানের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে। সহকর্মী আনোয়ার হোসেন, রাকিবুল হাসান, নজরুল ইসলাম ও শাহজাহান সিরাজকে নিয়ে বিস্তৃত চা বাগানের ভেতরে খুঁজি কচি চা পাতার সৌন্দর্য। ঘোরার ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরাবন্দি হই বিভিন্ন দর্শনীয় স্পটে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় সকাল সকাল ট্যুরিস্ট পুলিশের আগমন ঘটে। দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশদের মধ্যে একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। মাহবুব ভাই, একসময় গৌরীপুর থানায় ছিলেন। সে সূত্র ধরে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা উল্লেখযোগ্য। ডাকবাংলোর ভেতরেও অনেক সুন্দর সুন্দর স্থাপনাগুলো ভ্রমণপিয়াসীদের আকর্ষণ করে বেশ।
আমাদের এবারের সফরের ৯ জনের মধ্যে সবার প্রিয় আবদুল ছিদ্দিক স্যারের ডাকে ওয়াচটাওয়ার হয়ে গেলাম তেঁতুলিয়া ইকোপার্কের পাশের চা বিপণিতে। হালকা জল খাবারের পর সবাই নিজেদের জন্য টি প্যাক নিলেন। বৃক্ষপ্রেমী ছিদ্দিক স্যার কিনে নিলেন চা গাছও। হাস্যোজ্জ্বল আমাদের গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে তেঁতুলিয়ার জিরো পয়েন্টে ফ্রেমবন্দি হলাম। এরপর রওয়ানা হই বাংলাবান্ধার দিকে। সীমান্তবর্তী এলাকা সুন্দর জায়গা প্রশস্ত রাস্তার ওপর সাইনবোর্ডে লেখা সিকিম, দার্জিলিং, নেপালের দূরত্ব। আমরা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের দিকে। পাশেই শহীদ মমিন রিট্রিট গ্যালারি। সম্মুখে শারীরিক কসরত-রত বিজিবি সদস্যরা। দলগত কুচকাওয়াজ নজরকাড়ে দর্শনার্থীদের।
সবকিছু মিলিয়ে আমাদের মাঝে প্রশান্তি দোল খেল। গাড়িচালক শাহিন ভাইকে ইশারা দিলাম গাড়ি ছাড়তে। চলতে চলতে প্রাণভরে উপভোগ করি পঞ্চগড়ের পথঘাট, লোকালয় ও প্রকৃতি। বড়ই বিচিত্র; আমরা তিরনই হাট হয়ে শালবাহান বাজার গেলাম। সেখান থেকে সোজা চলে গেলাম কাজী অ্যান্ড টি এস্টেট। এটি পঞ্চগড়ের সবচেয়ে বড় চা বাগান। পাশে তাদের বিশাল গরুর ফার্ম ও আনন্দ ধারা রিসোর্ট। আমরা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলাম কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটে; যা অবলোকনে নয়ন জুড়িয়ে আসে।
