|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হেমন্তের রং কী? প্রশ্ন শুনে অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়ই। ভাবছেন, হেমন্তের আবার রং কিসের। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুন, অবচেতন মনেই আপনার কল্পনায় একটি রং ঠিকই ভেসে উঠেছে। সেটি হলো হলুদ। হেমন্তের রং কি আসলেই হলুদ? হয়তো নয়। অন্যসব ঋতুর মতো হেমন্তও থাকে নানা রঙে রঙিন। কিন্তু ওই যে, প্রকৃতি নামক খেয়ালি কন্যা সর্ষেফুলের একখানা হলুদ শাড়ি জড়িয়ে দিগন্তজোড়া আঁচলখানা ছড়িয়ে থাকে না? সে তো এই হেমন্তেই। শরতের রং যদি হয় কাশফুলের সাদা আর আকাশের নীল, হেমন্তের রং তবে সর্ষেফুল অথবা কাছাকাছি হলে মন্দ কী!
খুব সকালে অল্প অল্প কুয়াশা আর একটু নিগূঢ়ভাবে খেয়াল করলেই শিশিরবিন্দুর দেখা মিলবে এসময়। না। শীত এখনো এসে পৌঁছায়নি। সেজন্য আরও কিছুদিন সময় তো লাগবেই। ততদিন হেমন্তকন্যা তার রূপের বাহার মেলে মিশে থাকবে প্রকৃতিতে। একটু একটু করে ছোট হতে থাকবে দিনের দৈর্ঘ্য। আসরের নামাজ পড়ে এসে বসতে না বসতেই ভেসে আসবে মাগরিবের আজানের ধ্বনি। আর আপনি অবাক হয়ে ভাববেন, বিকেলটা ফাঁকি দিয়ে কোথায় লুকিয়ে গেল। শীতকাল নয়, তবে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে আনবে হেমন্তের আউলা বাতাস।
শীতকালে যে নতুন গুড়ের তৈরি নানা পিঠা খাওয়া হয়, তার শুরুটা কিন্তু হয় এই হেমন্তেই। এসময় অবশ্য খেজুর গুড়ের দেখা মিলবে না। কিন্তু তাতে কী। পিঠা কি শুধু মিষ্টিই হয়? ঘরে ঘরে কৃষকরা যে নতুন ধান এনে তোলেন, সেই চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি নানা পিঠাপুলি খাওয়ার আনন্দই আলাদা। তার সঙ্গে থাকে গৃহস্থবাড়ির পেলেপুষে বড় করা হাঁসের মাংস। এসময় নতুন ধান, চাল, কুঁড়া খেয়ে হাঁসগুলোও বেশ নাদুস-নুদুস হয়ে ওঠে। তাদের গায়ে-গতরে বেশ তেল জমা হয়। ভোজনপটুদের কাছে এমন হাঁসের মাংসের ঝোল আর নতুন চালের আটার রুটি অত্যন্ত লোভনীয়। শুধু কী তাই? নতুন ধানের চিড়া, মুড়ি, খই, চালের গুঁড়া দিয়ে হরেকরকম পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় ঘরে ঘরে।
বাতাস শুষ্ক হতে শুরু করে। উঠোনে জমা হয় উড়ে এসে জুড়ে বসা ঝরা পাতাদের স্তূপ। বাতাসে বাড়তি ধুলাবালির উপস্থিতি জানান দেয়, শীত আসছে। সারা দিন কাজের শেষে নিজের মেঘকালো চুলে নারিকেল তেল মাখাতে বসেন হয়তো গাঁয়ের বধূ অথবা কন্যাটি। আচ্ছা, হেমন্তের কথা বললে বারবার শুধু গ্রামের কথাই উঠে আসে কেন? উত্তরটা আমার মতো আপনিও জানেন। শহরের চার ধারে শুধু ইট, পাথর, আর কাচের দেওয়াল। এখানে তো আকাশ দেখাই মুশকিল, প্রকৃতিকে অনুভব করার সুযোগ কোথায়? হেমন্তকে অনুভব করতে হলে আপনাকে ফিরে যেতে হবে ফেলে আসা গাঁয়ের কাছেই। যেখানে শহুরে কোলাহল এখনো পৌঁছায়নি পুরোপুরি। যেখানে প্রকৃতি এখনো মুগ্ধতা ছড়ানোর উপলক্ষ্য নিয়ে আসে।
নিজের গ্রামের কথা মনে পড়ে আপনার মন যদি খারাব লাগে, দুই-একটা দিন না হয় নাগরিক ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে ফিরে যান সেখানে। হয়তো কোনোকিছুই আর আগের মতো নেই। অপেক্ষা করে নেই দাদির নিষ্প্রভ চোখ দুটি। হয়তো কেউ নেই, কিছু নেই সেখানে। কিন্তু আপনি সেখানে ফিরে আসেন না বলেই তো এ শূন্যতা। নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যান। মানুষও গাছের মতো, ছিন্নমূল হয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে না। হয়তো তার শরীর হেঁটে-চলে কথা বলে বেড়ায়, ভেতরের সবুজ হৃদয়টি ধীরে ধীরে ধূসর, বিবর্ণ হয়ে যায়। এই হেমন্তে, দিগন্তজোড়া হলুদ আঁচল ছড়ানো প্রকৃতির কোলে একবার ফিরে যান। আকাশ আর মাটির মাঝে আপনিও তো এই প্রকৃতিরই অংশ!
