Logo
Logo
×

Advertisement

গোলটেবিল বৈঠক

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

Advertisement

গতকাল পালিত হলো বিশ্ব ক্যানসার দিবস। দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তেমনি এর চিকিৎসার প্রশংসনীয় অগ্রগতিও হচ্ছে। এ দিবসকে সামনে রেখে ‘ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশবরেণ্য ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা চ্যানেল আইয়ের ডিজিটাল স্টুডিওতে উপস্থিত হয়েছিলেন। এ বৈঠকের আয়োজক ছিল মেডিকেল অনকোলজি সোসাইটি ইন বাংলাদেশ। সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. এবং মিডিয়া পার্টনার দৈনিক যুগান্তর ও চ্যানেল আই। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম


জনগণের মাঝে বাস্তবভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে

বিশ্ব ক্যানসার দিবস শুধু একটি দিবস পালন নয়, এটি একটি অঙ্গীকার। ক্যানসার সম্পর্কে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ক্যানসার প্রতিরোধ জোরদার করা, সময়মতো রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা, সর্বোপরি যথাযথ ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের পাশে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এ অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত। ২০২৬ সালে বিশ্ব ক্যানসার দিবসের মূল বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, মাদক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা ক্যানসারের এ বোঝা কমাতে পারি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার মান ও পরিধি বেড়েছে, তবে তা এখনো অপ্রতুল। দেশে এখনো ক্যানসার রোগ শেষ স্টেজে ডায়াগনোসিস হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ রোগীদের থাকছে নানা ধরনের জটিল সমস্যা। এ জটিলতা ভেঙে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম এপ্রোচ রোগীদের জন্য বাস্তবিক অর্থে কার্যকর করা খুব কঠিন। কেমো সঠিক পয়েন্টে দিয়ে রোগীকে সার্জারির জন্য তৈরি করা এবং পরবর্তী সময়ে রেডিওথেরাপি দেওয়া-এ গাইডলাইন চিকিৎসকের কাছে পেয়ে রোগীদের এটি কার্যকর করাও কঠিন কাজ। এ জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রোগীদের পাশে থাকতে হয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো রোগীকে শিক্ষিত ও সাহায্য করে। আমাদের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ক্যানসার রোগ কমাতে পারবো ও এর বোঝা সমাজে লাঘব করতে পারবো। দেরিতে রোগ নির্ণয় আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় বাধা। তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্যানসার সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা জানি, ৩০-৪০ ভাগ ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়। নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সমন্বয় করে চিকিৎসা ও প্রতিরোধের জন্য টেকসই নকশা তৈরি করতে হবে। স্মরণ করছি, সেসব যোদ্ধাকে যারা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন এবং যারা এ রোগের কাছে তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাদের সাহস ও শক্তি আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।

- অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার

প্রেসিডেন্ট, মেডিকেল অনকোলজি সোসাইটি ইন বাংলাদেশ

চিকিৎসাসেবার মান ও পরিধি বাড়াতে হবে

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের ৩২টি মুখ্য সুপারিশের মধ্যে ২৮তম সুপারিশ ক্যানসার নিয়ে করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য দেশব্যাপী কেন্দ্র স্থাপন, ক্যানসারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা এবং রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা বাড়ানো, অন্তত একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি যেন দেশে এপিআই (একটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্টস) তৈরি করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রধান ক্যানসারগুলো যেমন-জরায়ুমুখ, স্তন, কোলন, মুখগহ্বরের ক্যানসার দেশব্যাপী স্ক্রিনিং-এর আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ১৬টি রেডিওথেরাপি মেশিন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শিক্ষার্থীর মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমাদের জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। ২৯৫টি এসেনশিয়াল ড্রাগের মধ্যে ৫০টি ক্যানসারের ড্রাগ রয়েছে। এ ওষুধগুলোর মূল্য কমাতে ভ্যাট কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আমদানি শুল্ক কমালে অনেক কম দামে ওষুধ বিক্রি করা সম্ভব। প্রতিবছর দেশ থেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি করলে সরকার থেকে সফ্ট লোন দেওয়া, ট্যাক্স ও ভ্যাট মওকুফ করে দিলে অনেকে এগিয়ে আসবে।

- অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন

সদস্য, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন

চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশ-বিদেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দরকার

বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনগণকে ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন করা এবং ক্যানসার চিকিৎসাকে কীভাবে বিশ্বমানের করা যায়, তার উদ্যোগ গ্রহণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে, সঠিক চিকিৎসা পাওয়া। বিশ্বমানের চিকিৎসা পেতে হলে বিশ্বমানের সেটআপ অর্থাৎ বিশ্বমানের হাসপাতাল ও বিশ্বমানের দক্ষ চিকিৎসক ও সেবা দেওয়া লাগবে। দক্ষ জনবল সৃষ্টির জন্য শুধু ডিগ্রি নয়, পর্যাপ্ত আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেশ ও বিদেশে করতে হবে। যারা দেশব্যাপী ক্যানসার চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, তাদের শর্ট টার্ম ট্রেনিং ১ মাস, ৩ মাস ও ৬ মাস ধরে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে করানো হচ্ছে। দেশের উদ্যোক্তা ও বিত্তবানরা এ ধরনের প্রশিক্ষণে অর্থ ব্যয় করতে পারেন। ক্যানসার রোগীদের দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসা দিতে পারলে রোগীদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।

- অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর

পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ও অধ্যাপক, সার্জিক্যাল অনকোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

বেশির ভাগ গাইনিকোলজিক্যাল ক্যানসার নিরাময়যোগ্য

গাইনিকোলজিক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য দেশে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে চমৎকার কাঠামো আছে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ব্রেস্ট ও জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে দেশের ২০ ভাগ নারী কভারেজ পেয়েছে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গাইনিকোলজিক্যাল ক্যানসার আক্রান্ত সব রোগীর ডাটাবেস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খাতায় রয়েছে। এর মাধ্যমে হাসপাতালভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি আমরা করতে সক্ষম হয়েছি। গত বছর এ হাসপাতালে জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল ১৮৯৪ জন। এদের মধ্যে শতকরা মাত্র ০.৫ ভাগ রোগী অপারেশনযোগ্য ছিল। ২০১৮ সালের মধ্যে এ রোগীদের শতকরা ৯০ ভাগের টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের ৯৩ ভাগ জরায়ুমুখের ক্যানসারের টিকা পেয়েছে।

- অধ্যাপক ডা. বেগম রোকেয়া আনোয়ার

বিভাগীয় প্রধান, গাইনি অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

নতুন পদ সৃষ্টি করা হোক

যে কোনো সোসাইটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এর অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে মান উন্নয়ন করা। পাশাপাশি অন্য সোসাইটির সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন করার লক্ষ্যে কাজ করা। এভাবে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশে ক্যানসার চিকিৎসা শীর্ষে পৌঁছাবে বলে আমি মনে করি। আমাদের সোসাইটির পক্ষ থেকে দক্ষ ও অধিকসংখ্যক জনবল সৃষ্টির জন্য বছরব্যাপী কন্টিনিউয়িং মেডিকেল এডুকেশন পরিচালনা করে থাকি। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আমাদের ডাক্তারদের ট্রেনিংয়ের জন্য দুটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি, যার কার্যক্রম শুরু হবে। ছাত্রছাত্রীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধকরণের জন্য আমাদের প্রোগ্রাম রয়েছে। এফসিপিএস মেডিকেল অনকোলজিস্ট চালু হয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ জনবলের স্বল্পতা দূর হবে। ইন্টারভেনশনাল মেডিকেল অনকোলজি আমরা এখনো শুরু করতে পারিনি। এ জন্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং করা উচিত। গত ৫ বছর আমরা ৫টি আন্তর্জাতিক সেমিনার করেছি। আশার কথা, এসব কার্যক্রম চলতে থাকলে বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার যুগান্তকারী পরিবর্তন হবে।

- ডা. মো. রফিকুল ইসলাম

মেডিকেল অনকোলজি, সাধারণ সম্পাদক, মেডিকেল অনকোলজি সোসাইটি ইন বাংলাদেশ

মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের ভূমিকা আছে

যে কোনো হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানে ক্যানসার চিকিৎসা করতে গেলে সেখানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসক টিম বা টিউমার বোর্ড থাকতে হয়। এ টিমের লক্ষ্য হচ্ছে একটি সমন্বিত চিকিৎসা দেওয়া, যেন রোগী একটি ভালো মানের সঠিক চিকিৎসা পান। ক্যানসার ডায়াগনোসিস ও স্টেজিং করতে এ টিমে থাকেন মেডিকেল, সার্জিক্যাল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ইমেজিংয়ে যারা কাজ করেন, হিস্টোপ্যাথোলজিস্ট এবং সমন্বয়ক। প্রয়োজনে আরও ফ্যাকাল্টি বা স্পেশালিস্ট যোগ হতে পারে। আমাদের মতো উন্নয়নকামী দেশে সব ক্যানসার রোগের চিকিৎসা টিউমার বোর্ডের মাধ্যমে করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে গাইডলাইনে এই টিউমার বোর্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এটি সব সময় যে আবশ্যিক নয় তাও বলা হয়েছে। যেখানে স্টেজিং নিয়ে মতদ্বৈততা আছে সেখানে রোগীর স্বার্থে অবশ্যই টিউমার বোর্ড করা উচিত। যে চিকিৎসার উদ্দেশ্য হচ্ছে রোগীকে সারিয়ে তোলা, সেখানে টিউমার বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

- ব্রি. জেনারেল (অব.) ডা. মো. কুদরত-ই-ইলাহী

সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অনকোলজি, আহসানিয়া মিশন ক্যানসার ও জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা

জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধন সময়ের দাবি

দেশে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যানসার রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, প্রতিরোধ এবং প্রশমন বা প্যালিয়েটিভ কেয়ারে ব্যয় করা প্রয়োজন। গ্লোবোক্যান ২০২২ অনুসারে দেশে প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০৫ জন। এ সংখ্যার দিক বিবেচনা করলে আমরা বিশ্ব থেকে মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছি। দেশে প্রতি বছর নতুন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর অনুমিত সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার। আশপাশের দেশে জনসংখ্যা রেজিস্ট্রির ফলাফল অনুসারে দেশে জনসংখ্যা ও বয়সের ডিনামিক্স অনুসরণ করে এ সংখ্যা বের করা হয়েছে। এটি বিজ্ঞানভিত্তিক সংখ্যা। কিন্তু এটি যে দেশের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরছে তাও নয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে ক্যানসার রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রয়োজন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে হাসপাতালভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি ইলেকট্রনিক ডাটাবেজ শুরু করা প্রয়োজন।

- অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগ, গণস্বাস্থ্য নগর হাসাতাল

বিশ্বমানের চিকিৎসা দেশেই সম্ভব

বিশ্বের আধুনিক ও ধনী দেশগুলোতে ক্যানসার রোগের যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, সে চিকিৎসা যদি আমাদের দেশে করা যায় তা-ই হচ্ছে বিশ্বমানের চিকিৎসা। রোগ নির্ণয়ের প্রধান ধাপ হচ্ছে হিস্টোপ্যাথলজি যা এক্সসিশন বায়োপসি, কোরনিডল বায়োপসি, ফাইন নিডল এসপিরেশন সাইটোলজির মাধ্যমে করা হয়। দেশে প্রতি বছর ১৩-১৫ লাখ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার রোগী রয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সব রোগীর মলিকুলার, ইমিনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, নেক্সট জেনারেশন জিন সিকোয়েন্স টেস্ট করা সম্ভব নয়। দেশে রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন ১৭৫-২০০টি, অথচ সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে ২৫-৩০টি মেশিন রয়েছে। ইমিউনোথেরাপির খরচ কমিয়ে আনতে পারলে ভালো হয়। দেশে পর্যাপ্ত বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার নেই। রোগীবান্ধব ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকস দরকার।

- মেজর জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম

এক্স কনসালট্যান্ট, ফিজিশিয়ান জেনারেল, ডাইরেক্টরেট জেনারেল মেডিকেল সার্ভিসেস, বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট

ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির ভূমিকা অপরিসীম

রেডিওথেরাপি এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা, যেটি ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার সব স্তরে প্রয়োজন রয়েছে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা হিসাবে গণ্য এবং সার্জারি ও কেমোথেরাপির সহযোগী চিকিৎসা হিসাবে বিবেচিত। প্যালিয়েটিভ চিকিৎসায় রেডিয়েশনের ভূমিকা অপরিসীম। ক্যানসার রোগীর ৭০-৮০ ভাগের তাদের জীবদ্দশার কোনো না কোনো সময় রেডিওথেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। দেশে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় বিলম্ব এবং সব ধরনের চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ার কারণে দেশে রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয় ৯০ ভাগ ক্যানসার রোগীর। দেশের প্রথম ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজে রেডিওথেরাপি মেশিন থাকা প্রয়োজন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ২টি রেডিওথেরাপি মেশিন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১টি কোবাল্ট মেশিন চালু আছে। বেসরকারি পর্যায়ে রেডিওথেরাপির খরচ অনেক বেশি এবং এর সেটআপে অনেক অর্থ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিত্তশালীরা এগিয়ে আসবে বলে আমি আশা করি।

- অধ্যাপক ডা. রকিব উদ্দীন আহমেদ

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রেডিয়েশন অনকোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ব্যক্তি পর্যায়ে উৎকর্ষের জন্য গবেষণার বিকল্প নেই

ক্যানসার নিয়ে গবেষণায় দেশে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। তবে গবেষণায় আরও আগ্রহী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণ, ভালো মানের ও স্বল্প খরচে ক্যানসার চিকিৎসা ও রোগীর জীবনমান উন্নতির জন্য ক্যানসার নিয়ে গবেষণা জরুরি। সরকারিভাবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা আছে। তবে এটি কতটা বাস্তবিক ও কার্যকরী তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রতিটি সরকারি হাপসাতালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে গবেষণার জন্য একটি পৃথক উইং থাকার প্রয়োজন আছে। ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো যারা ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদন করছে তাদের লভ্যাংশের একটি অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ দিতে পারে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যাতে আমাদের বিশেষজ্ঞরা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর গবেষণায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

- ডা. সৈয়দ মো. আরিফুল ইসলাম

সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল

বিভাগীয় শহরে সমন্বিত ক্যানসার সেন্টার প্রয়োজন

ক্যানসার রোগের চিকিৎসায় মূল খরচ হয় রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, পরিবহণ ও রোগীর খাওয়া-দাওয়ায়। রোগ নির্ণয়ের জন্য হিস্টোপ্যাথলজি, ইমিউনো-হিস্ট্রোকেমিস্ট্রি, মলিকুলার ও সাইটোস্টাডি এবং ইমেজিং (সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও পেট স্ক্যান) পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। সরকারিভাবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনে এর অনেকগুলো পরীক্ষা স্বল্পমূল্যে করা হচ্ছে। মলিকুলার সাইটোলজি পরীক্ষা করতে জনবলের কিছু সীমাবদ্ধতা দেশে আছে। পেট স্ক্যানের খরচ ১৫-২০ হাজার টাকায় আনতে পারলে রোগীরা উপকৃত হবে। কেমোথেরাপি, হরমোনথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির কিছু ওষুধ আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো দেশে তৈরি করায় দাম কমে আসছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কোনো কোনো ক্যানসার রোগীকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা করে। এটি বাড়িয়ে সব ক্যানসার রোগীকে ১ লাখ টাকা করে সহায়তা করতে পারলে ভালো হয়। বিদেশে ক্যানসার রোগীদের জন্য প্রাইম মিনিস্টার ফান্ড এবং স্পেশাল ক্যানসার ইন্সুরেন্স আছে। এগুলো আমাদের দেশেও চালু করা দরকার।

- ডা. মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান বিদ্যুত

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিকেল অনকোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম দেশব্যাপী করতে হবে

দেশে ও উপমহাদেশে পুরুষদের মধ্যে মুখ ও মুখগহ্বর, খাদ্যনালি ও ফুসফুস ক্যানসার বেশি হয়ে থাকে। নারীদের জরায়ুমুখ, স্তন ও খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও জাপানে পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট, ফুসফুস, কোলন ক্যানসার বেশি হয়। নারীদের স্তন, কোলন ও খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি হয়। এ পার্থক্য হওয়ার কারণ হচ্ছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক অবস্থান ও ধূমপান। ধূমপান ৯০ ভাগ ক্যানসার হওয়ার জন্য দায়ী। পান, জর্দা, তামাকের কারণে মুখগহ্বরের ক্যানসার দেশে বেশি হচ্ছে। কোন এলাকায় কোন ক্যানসার বেশি হচ্ছে তা যদি আমরা জানতে পারি, তবে সে এলাকায় ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য জোর পদক্ষেপ নিতে পারব। বিশ্বে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আমাদের দেশ থেকে বেশি হলেও সে দেশে মৃত্যুর হার কিন্তু আমাদের দেশের তুলনায় কম। এর কারণ, আমাদের রোগ নির্ণয় দেরিতে হচ্ছে, আমরা সচেতন নই, দারিদ্রতার কারণে রোগীরা ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারছেন না। মেশিনের অপ্রতুলতা ও ডায়াগনস্টিক সুবিধার স্বল্পতা রয়েছে।

- ডা. ফেরদৌস আরা বেগম

কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অনকোলজি, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল

রেফারেল সিস্টেমের বাস্তবায়ন জরুরি

ক্যানসার চিকিৎসার অগ্রগতি যেমন দেশে বাড়ছে তেমনি এ রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ খুঁজে বের করতে হলে একটি জাতীয় নীতি থাকা দরকার। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, রিস্ক ফ্যাক্টর, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না হওয়া যেমন-তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ না হওয়া ক্যানসার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তামাক পণ্য উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ করা হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিকের সংকটও আছে। যন্ত্রপাতি পরিচালনায় দক্ষ লোকেরও অভাব রয়েছে। দেশে ক্যানসার রোগী অনেক ক্ষেত্রে কোয়াক, হোমিও, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার শরণাপন্ন হয়ে রোগ জটিল করে আমাদের কাছে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে জেনারেল প্র্যাকটিশিনারের কাছে ক্যানসার রোগীরা গেলেও সঠিক চিকিৎসক বা সেন্টারে তারা সময়মতো রেফার করেন না। মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ওরাল ক্যানসারের রোগীরা সার্জারির পরে রেডিওথেরাপি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস ধরে সিরিয়াল পান না। চিকিৎসা শেষে রোগীর রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন যা ফিজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল কাউনসেলিং পর্যায়ে হতে হয় তাও হচ্ছে না।

- ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত

সহযোগী অধ্যাপক ও ডিন, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

রোগ নির্ণয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্যানসার রোগ নির্ণয়ের জন্য সুবিধা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এ রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথম প্রয়োজন হিস্টোপ্যাথলজি, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, মলিকুলার ও সাইটোজেনেটিকস টেকনোলজি ও বায়োটেকনোলজি। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রফেশনাল দেশে গড়ে ওঠেনি। সরকারি পর্যায়ে জনবল বাড়ানো দরকার। রেডিওলজিক্যাল ইকুইপমেন্টের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। এগুলো বাড়ালে আমরা বিশ্বমানের চিকিৎসার দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

- ডা. মো. শাহরিয়ার কবীর

সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ ও হাসপাতাল

সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার

দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, ওষুধের সংখ্যা সে হারে বাড়ছে না এবং দামও সে হারে কমছে না। হলিস্টিক অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে পারলে বিশ্বমানের চিকিৎসা এদেশেই সম্ভব। ডায়াগনোসিসের পরিধিও বাড়ানো দরকার। সরকারি খাতে রেডিওথেরাপির চাহিদা পূরণ এখন সময়ের দাবি। ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য ফান্ডের ব্যবস্থা করা দরকার।

- ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ইনসেপ্টা ঐক্যবদ্ধভাবে ক্যানসার চিকিৎসায় অবদান রাখছে

ওষুধ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান। দেশের ক্যানসার রোগীদের কীভাবে সহজে ও শুরুতেই ওষুধ পৌঁছে দিতে পারা যায়, সে লক্ষ্যে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস কাজ করে চলছে। আমরা দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুলভে ও সাশ্রয়ীমূল্যে ক্যানসার রোগীদের কাছে ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছি। ওষুধের মান উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য ইনসেপ্টার পর্যাপ্ত বাজেট রয়েছে।

- কল্যান আশীষ দাস

সিনিয়র সেলস ম্যানেজার, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি.

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে করণীয়

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে করণীয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম