Logo
Logo
×

Advertisement

গোলটেবিল বৈঠক

বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক

কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে কিডনি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে’। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএ) উদ্যোগে সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তরের কনফারেন্স হলে দেশবরেণ্য কিডনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জনরা এক গোলটেবিল বৈঠকে এক হয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এমএ মুহিত। ‘প্রতিরোধ থেকে প্রতিস্থাপন : টেকসই কিডনি সেবার কৌশলগত গোলটেবিল বৈঠক’ শিরোনামে এ আয়োজনে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হাসান চৌধুরী। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. ফারনাজ নবী। অনুষ্ঠানটির সহযোগিতায় ছিল বীকন ফার্মাসিউটিক্যাল্স পিএলসি

Advertisement

Icon

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা আছে

নির্বাচনের দেড়-দুই বছর আগ থেকেই আমরা দেশের ১০-১১টি সেক্টরকে শনাক্ত করে দলমত নির্বিশেষে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সেই সেক্টরকে রিফর্ম করার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সেক্টর অন্যতম। এ পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তারও লিখিত প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। আমার মনে হয় না, এর আগে কোনো সরকার এত প্রস্তুতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে এসেছে। আমাদের পরিকল্পনায় ইউনিয়ন সেন্টারের অধীনে তিনটি করে সাবসেন্টার থাকবে। যেখানে কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা অন্য কোনো অবকাঠামো, যেটি ইতোমধ্যে প্রস্তুত আছে বা অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে সেটি অন্তর্ভুক্ত হবে। সরকারি জনবলকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যায়, সে পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাইমারি হেলথকেয়ারে প্রিভেনশনের ওপর জোর দেওয়ার জন্য আগামী পাঁচ বছর ধাপে ধাপে এক লাখ হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগ দেওয়া হবে; যার ৮০ শতাংশ হবে নারী। এদের ট্রেনিং দেওয়ার মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে এরা শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। রেফারেল লিংকেজে উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞের পদায়ন এবং জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যায়ে সর্বোচ্চ স্পেশালাইজেশনের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকের স্বাস্থ্যগত ডাটা রেকর্ড রাখব। এর ফলে পুরো মেডিকেল সিস্টেমে একটি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের মাধ্যমে রোগীদের পূর্ববর্তী মেডিকেল রেকর্ড থাকবে। এতে চিকিৎসার মান বাড়বে এবং প্রেসক্রিপশন অডিটের সুযোগ থাকবে। যে কোনো একটি জেলায় প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি লেভেলে পুরো জনসংখ্যা নিয়ে ই-হেলথের পাইলট প্রজেক্ট চালু করা হবে। এতে ক্লিনিক্যাল গভর্ন্যান্সের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নিয়েও আমরা কাজ করছি। আমরা জানি একজন রোগী তার স্বাস্থ্য ব্যয়ের শতকরা ৭০ ভাগ নিজেই বহন করে। এক্ষেত্রে প্রাইভেট হাসপাতালের সার্ভিস সরকার কিনে নিলে রোগী সেবার পরিধি বাড়বে। তাই মোটামুটিভাবে বলা যায়, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার অ্যাওয়ারনেস, স্ক্রিনিং, রেফারেল লিংকেজ ও টারশিয়ারি লেভেলে সার্ভিস বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

-অধ্যাপক ডা. এমএ মুহিত

প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

বর্তমানে কিডনি রোগীর সংখ্যা পৃথিবীতে ৮৫ কোটি, যার বেশির ভাগ অতি দরিদ্র ও মধ্য আয়ের দেশে বাস করেন। এদিকে উন্নত বিশ্বে কিডনি অকেজো রোগীর বেশির ভাগই হিমোডায়ালাইসিস অথবা পেরিটেনিয়াল ডায়ালাইসিস করে থাকেন। একজন রোগীর ৪ ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করতে ১৫০ লিটার রিভার্স অসমোসিস বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয়। পৃথিবীতে ৪০ লাখ রোগী হিমোডায়ালাইসিস করে থাকেন। এদের মধ্যে প্রতিবছর ১০ লাখ রোগী মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪০-৫০ হাজার রোগী কিডনি ফেইলিউরে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে ৯ থেকে ১০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন করার সুযোগ পান। বাকি ৭৫ ভাগ রোগী ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজনের অভাবে মারা যান। আবার যারা ডায়ালাইসিস করে তাদের বেশির ভাগই অর্থের অভাবে ৬ মাসের ভেতরেই ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেন এবং অকালে মৃত্যুবরণ করেন। কিডনি ফাউন্ডেশনে শুধু ঢাকাতে ১১ হাজার ৩৬০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন হয় ৭২ হাজার Dilazer, ১ লাখ ৪৮ হাজার Blood Line এবং সমপরিমাণ সুচ। এতে ১৭ লাখ ৪ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন। এ কারণে পরিবেশের ওপর স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়, যা বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক কিডনি সমিতি ডায়ালাইসিস সীমিত করার পরামর্শ দিচ্ছে। ৭০-৮০ বছর বয়স্ক রোগীদের ডায়ালাইসিস করার জন্য নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং কিডনি সংযোজনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

-অধ্যাপক ডা. হারুন-আর-রশিদ

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

সময়মতো রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ দরকার

প্রায় ৮০ ভাগ কর্মক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনির সমস্যা উপসর্গহীন থাকে। যে কোনো ধরনের কিডনি রোগে সাময়িক জটিলতায় আকস্মিক ও দীর্ঘাবস্থায় স্থায়ী কিডনি বিকল হয়। প্রাথমিকভাবে অবস্থা নির্ণয়ে কয়েকটি সহজ টিপস আছে। শুরুটা হলো মনে উচ্চ সংশয় থাকতে হবে। তারপর মূত্রের প্রোটিন ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করা দরকার। রোগ প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন যেসব কারণে কিডনি আক্রান্ত হয় সেগুলোর সময়মতো নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা। কিডনি কার্যকারিতার সহজ পরীক্ষাগুলো নিজ থেকে করার জন্য ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও প্রচার এবং উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম গ্রহণ করে তাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে। গণমাধ্যম, ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন, স্কুলের স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক সংগঠন ইত্যাদির মাধ্যমে তা করা যেতে পারে।

-অধ্যাপক ডা. ইমরান বিন ইউনুস

ইন্টারনিস্ট ও নেফ্রোলজিস্ট, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, নেফ্রোলজি ও অধ্যক্ষ (অব.) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সহসভাপতি চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন

ছয় মাসে একবার কিডনি পরীক্ষা করা উচিত

কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনি রোগ প্রতিরোধে মনোনিবেশ করা বাঞ্ছনীয়। আকস্মিক কিডনি রোগ বহুলাংশে নিরাময়যোগ্য। হঠাৎ পানিস্বল্পতা, রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন, ইনফেকশন, সর্প দংশন, শরীরের মাংসপেশির ধ্বংস ইত্যাদি নানা কারণে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়। অন্যদিকে ধীরগতিতে কিডনি বিকল একটি মারাত্মক রোগ। অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে কিডনি রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হন। কেমিক্যাল সার, অ্যাগ্রোকেমিক্যালস, পোকামাকড় নিধনের ওষুধ, অতি উচ্চতাপমাত্রা ইত্যাদির কারণে কিডনি রোগ হয়। প্রাথমিক শনাক্তকরণের জন্য প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, রক্তের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখা এবং একটি আলট্রাসোনোগ্রাম করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি রোগ নিরূপণ করা যায়।

-অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম

অধ্যাপক, নেফ্রোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আহ্বায়ক, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন (বিআরএ)

সেবাদাতা ও গ্রহীতা সবাইকে সচেতন করতে হবে

একটি কিডনি যখন প্রায় অকেজো হয়ে যায়, তখন যদি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় তখন ইউরোলজিস্টের ভূমিকা আছে। সেবাদাতাদের মধ্যে ডাক্তার ছাড়াও অন্যরা যারা আছেন, যেমন নার্স, টেকনোলজিস্ট তাদের মধ্যেও প্রতিস্থাপনের সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা ও উদ্বুদ্ধকরণের প্রোগ্রামে তাদের একীভূত করতে হবে। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের যে আইনটি সম্প্রতি সংশধিত হয়েছে তা সেবাদাতা ও গ্রহীতা কেউই তেমন ভালোভাবে জানেন না। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরিধি বর্তমানে বিস্তৃত করা হয়েছে। ইমোশনাল ডোনারের ক্ষেত্রে শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিডনিদানকারীদের নাম ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি করার প্রস্তাব রয়েছে। ট্রান্সপ্ল্যান্টের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং এরপরও রোগীদের দীর্ঘ জীবন যে ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হয় তা ব্যয়বহুল।

-অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস

মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউরোলজিস্ট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মেম্বার সেক্রেটারি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ কিডনি রোগের প্রধান কারণ

কোনো কিডনি রোগী যেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে না যায়, সেজন্য পাঁচটি রোগকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, নেফ্রাইটিস, কিডনি বাঁধাগ্রস্থজনিত সব রোগ এবং বংশগত কারণ। হারবাল মেডিসিন বা কবিরাজি ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সঙ্গে কায়িক পরিশ্রম করতে হবে এবং লবণ কম খেতে হবে। ফাস্ট ফুড ও সফট ড্রিংকস পান করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। ধূমপান করা যাবে না এবং প্রয়োজনের বেশি পানি পান করবেন না। নিয়মিত কিডনির ফাংশন যেমন রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করবেন।

-অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ

নেফ্রোলজি বিভাগ, কিডনি ফাউন্ডেশন, ঢাকা।

জাতীয়ভাবে সিকেডি রেজিস্ট্রি গঠন জরুরি

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (সিকেডি) দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হওয়ায়, অনেকেই শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা গ্রহণ করেন, যা চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি উভয়ই বাড়ায়। সিকেডি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। প্রথমত, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রতিরোধ জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা উচিত। তৃতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকদের সিকেডি শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ প্রদান এবং রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে মোবাইল হেল্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমন্বিত সরকারি নীতি, স্বাস্ব্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে সিকেডির বোঝা হ্রাস করা সম্ভব।

-অধ্যাপক ডা. এম. মুহিবুর রহমান

অধ্যাপক, নেফ্রোলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

কিডনি প্রতিস্থাপনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে

কিডনি প্রতিস্থাপন কম হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো পর্যাপ্ত ডোনারের অভাব, cedaveric transplant কার্যকর না হওয়া, উন্নত চিকিৎসার জন্য খরচ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের স্বল্পতা, নার্সসহ অন্য স্টাফ এবং সামগ্রিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জনসচেতনতার অভাব। কিডনি রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নতিকরণের জন্য প্রয়োজন বেশিসংখ্যক চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্টাফদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া উন্নত ইমিউনোলজিক্যাল ল্যাব প্রতিস্থাপন, জাতীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন নেটওয়ার্ক সিস্টেম, কিডনি প্রতিষ্ঠান সেন্টার সংখ্যা বাড়ানো, সরকারি অর্থায়ন প্রদান বা আর্থিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আইনগত প্রক্রিয়া সহজতর করা প্রয়োজন।

-অধ্যাপক ডা. রাশেদ আনোয়ার

বিভাগীয় প্রধান, নেফ্রোলজি, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট

মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন

মৃত দাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত কিডনি প্রতিস্থাপনকে ক্যাডেভারিক কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বলে। সাধারণত মস্তিষ্ক মৃত অথবা হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া আইসিইউতে চিকিৎসারত কোনো অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের সম্মতিক্রমে এ অঙ্গ সংগ্রহ করা হয়। এটি যাদের কিডনি বিকলাঙ্গের শেষ ধাপে আছে অথবা ডায়ালাইসিস করে বেঁচে আছেন এবং যাদের কোনো জীবিত কিডনিদাতা পাওয়া যায়নি তাদের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়ায় কিডনি প্রাপ্তি সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় সাফল্য বর্তমান সময়ে অনেক ভালো। কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। দীর্ঘক্ষণ দেহের বাইরে এ কিডনি থাকার কারণে কিডনির কার্যকারিতা ফিরে পেতে বিলম্ব হতে পারে (ডিলেইড গ্রাফট ফাংশন) এবং রিজেকশনের ঝুঁকি কিছুটা বেশি। তবে আধুনিক ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ ও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির ফলে এর সাফল্য অনেকটা জীবিত কিডনিদাতার ফলাফলের কাছাকাছি।

-অধ্যাপক ডা. আবু সালেহ আহমেদ

বিভাগীয় প্রধান, কিডনি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

হাসপাতালগুলোকে করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ রোগীর কিডনি বিকল হয় এবং ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন হয়, তার মাত্র ৫ শতাংশ বা তারও কম রোগীর ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা সম্ভব হয়। একজন ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন হিসাবে আমি বলতে পারি, এর প্রধান কারণ হলো রোগীদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। অনেকেরই ট্রান্সপ্ল্যান্টের পুরো খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। একজন বেসরকারি সেবা প্রদানকারী হিসাবে আমার অভিমত হলো, অন্তত কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ‘করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গি’ পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত হওয়া অধিকাংশ ট্রান্সপ্ল্যান্টই বেসরকারি খাতে হয়েছে, কারণ সরকারি পর্যায়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিডনি বিকল রোগীদের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মনোভাব ত্যাগ করলে চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যু রোধ করা যাবে।

-অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম

ইউরোলজিস্ট ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন, সেন্টার কিডনি ডিজিজেস ও ইউরোলজি হাসপাতাল

ট্রান্সপ্ল্যান্টকে উৎসাহিত করতে হবে

ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা আমাদের এখনো অপর্যাপ্ত। ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ডোনারের সংকট প্রকট এবং এজন্য আমাদের সচেতনতা দায়ী। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে যে ইমোশোনাল ডোনার সংযুক্ত করা হয়েছে তার মাধ্যমে এখন অনেক কিছু করা সম্ভব। আইসিইউতে যথাযথ সময়ে ব্রেনডেড ডিক্লারেশন না করার কারণে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। দেশে শুধু কিডনি, লিভার ও কর্নিয়া ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য অঙ্গ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এছাড়া আরও ৫টি অঙ্গ ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায়। অর্গান প্রিজারভেশনও আমাদের অবকাঠামোর উন্নতি দরকার।

-ডা. মো. রফিকুল ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি

দেশে অর্গান ডোনেশন কার্ড চালু আছে

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস চিকিৎসার বড় সমস্যা হলো, এটি একটি অসম্পূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে আমরা রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি কিন্তু রোগীর জীবনের যে গুণগত মান তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা একজন চিরস্থায়ী রোগী এবং তার কারণে একটি চিরস্থায়ী রুগ্ণ পরিবার তৈরি করি। কিডনি প্রতিস্থাপন, রোগীর জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি একমাত্র পদ্ধতি যা একজন কিডনি রোগীকে প্রায় সুস্থ জীবনযাপনের সুযোগ দেয়। কিডনি প্রতিস্থাপনে প্রথম প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা। মৃত ব্যক্তি থেকে কিডনি সংগ্রহ করতে হলে অবশ্যই জীবিত অবস্থায় আমি আমার শরীরের কিডনি এবং অন্য প্রতিস্থাপন যোগ্য অঙ্গ দান করতে চাই এ মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে।

-ডা. মেজবাহ উদ্দিন নোমান

সহযোগী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও যুগ্ম আহ্বায়ক, বিআরএ

কিডনির রোগ প্রায়ই লক্ষণবিহীন

বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগ রয়েছে-যেমন প্রস্রাবের রাস্তার সংক্রমণ, কিডনি প্রদাহ ইত্যাদি। এসব রোগ সময়মতো চিকিৎসা না করলে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে, কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এর ফলে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা যায় এবং চিকিৎসা ব্যয়ের মতো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিও কমানো সম্ভব। কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-এ সময় সাধারণত তেমন কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ থাকে, যেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব। নিয়মিত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি শনাক্ত করলে রোগের অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়, যা রোগের অগ্রগতি ধীর করতে বা অনেক ক্ষেত্রে থামিয়ে দিতে পারে।

-ডা. শাহ নেওয়াজ দেওয়ান

সহযোগী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি, যুগ্ম আহ্বায়ক, বিআরএ

কিডনি রোগ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে

দেশের প্রায় শতকরা ১০-১৫ ভাগ রোগী নিয়মিত ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা ডায়ালাইসিসের সুযোগ পান। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষ কিডনি রোগীর সংখ্যা কমানোর জন্য রোগ প্রতিরোধ জরুরি। যারা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপন। কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন রোগী সম্পূর্ণ নতুন জীবন লাভ করে এবং আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডগুলো কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমেই সম্ভব। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে মৃতদেহ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন জনপ্রিয় হচ্ছে। আমাদের দেশেও মৃতদেহ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে পারলে কিডনি রোগীরা নতুন জীবন লাভ করবেন এবং স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ও আয়-রোজগার করতে পারবেন। সবাই যেন ডায়ালাইসিস ও ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

-ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হাসান চৌধুরী

সহকারী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি, সদস্য সচিব, বিআরএ

সহায়ক নীতিমালায় বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী

সারা বিশ্বে পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস ফ্লুইডের ব্যবহার ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাই স্বল্পমূল্যে পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস ফ্লুইডের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে বীকন ফার্মাসিউিটিক্যালস ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি আগামী ৫-১০ বছরের জন্য একটি সহায়ক নীতিমালা ও সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে আমরা এই খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি হিসাবে আমরা সর্বপ্রথম কিডনি রোগীদের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসায় ‘রেনেসিস’ নামে একটি খাওয়ার ওষুধ বাজারজাত করেছি। এর ফলে এ সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। এ ছাড়া যেসব রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ওষুধও বীকন স্বল্পমূল্যে বাজারজাত করছে। কিডনি প্রতিস্থাপন রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ওষুধের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির ব্যবস্থা করা জরুরি।

-এসএম মাহমুদুল হক পল্লব

পরিচালক, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি

সুপারিশ

* কিডনি রোগের ঝুঁকি, যেমন-ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ও অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষতি সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা।

* কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যায়ে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা (রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা) চালু করে দ্রুত রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা করা।

* প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিডনিসেবাকে অন্তর্ভুক্ত ও শক্তিশালী করা। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

* অঙ্গদানের প্রতিশ্রুতিমূলক ডোনেশন কার্ডকে একটি প্রিভিলেজ কার্ড হিসাবে ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

* দেশের সব আইসিইউতে ব্রেনডেথ ডিক্লারেশন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

* কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কুল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি করা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে করণীয়

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে করণীয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম