সিপিডি ও ওইসিডির যৌথ প্রতিবেদন
এলডিসি উত্তরণের আগে কমছে স্বল্পসুদে ঋণ
২০২৭ সালের মধ্যে বহুপক্ষীয় সহায়তা কমতে পারে ৩০ শতাংশ * চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে এলডিসি উত্তরণে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এলডিসি থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশের জন্য স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সংকট, উন্নয়ন সহায়তার বাজেট সংকোচন এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন (এমডিএফ) দ্রুত কমছে। ইতিমধ্যে ২০২৪ সালে এ ধরনের অর্থায়নে প্রায় ১৫ শতাংশ পতন হয়েছে। আর ২০২৭ সালের মধ্যে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির (ডিএসি) সদস্য দেশগুলোর বহুপক্ষীয় সহায়তা ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু অর্থায়ন, স্বল্পসুদে ঋণ, ঋণের স্থিতিশীলতা এবং এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী অর্থায়ন নিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে।
বুধবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ওইসিডি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ২০২৬ প্রতিবেদন (এমডিএফআর) : দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দাতা দেশগুলোর বাজেট সংকোচন, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং বাড়তি আর্থিক চাপের কারণে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রাপ্যতা, ব্যয় এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বল্পসুদে অর্থায়নই সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এটি শুধু উন্নয়ন সহায়তা কমার সতর্কবার্তা নয়; বরং আগামী দিনের উন্নয়ন অর্থায়নের কৌশল পুনর্গঠনের আহ্বান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জলবায়ু, খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বহুপক্ষীয় অর্থায়নের বড় সুবিধাভোগী। তবে বৈশ্বিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার এই প্রবণতা এলডিসি উত্তরণের সময় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
?ওইসিডির আর্কিটেকচার অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের প্রধান অঁরি-বার্নার্ড সলিনিয়াক- লেকোম্ত বলেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন অস্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। সাহসী সংস্কার ছাড়া এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ধরে রাখা কঠিন হবে। প্রতিবেদনের সহ-লেখক লিওনার্দো আলতিয়েরি বলেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন এখন সম্পদ সংকোচনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আরেক সহ-লেখক মারিয়ুস গ্যুরিন বলেন, ২০২৪ সালে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ ছাড় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়ছে। পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। সাউদার্ন ভয়েসের ড. প্রত্যুষ শর্মা বলেন, শুধু মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে অর্থায়নের যোগ্যতা নির্ধারণ করলে এলডিসি-উত্তরণকারী দেশগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি বিবেচনায় আসবে না। নেপালের সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (এসএডব্লিউটিইই) নির্বাহী পরিচালক ড. পারাস খারেল বলেন, টেকসই এলডিসি উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রীলঙ্কার ড. রোশান অ্যান পেরেরা বলেন, সময়ের আগে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ হারালে দেশগুলোকে ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। পাকিস্তানের সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (এসপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আসিফ ইকবাল বলেন, উন্নয়ন অর্থায়ন এখন ক্রমেই ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে। তাই মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকি, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য, ঋণের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও অর্থায়নের মানদণ্ডে যুক্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিকবিষয়ক উইংয়ের মহাপরিচালক শাহ আসিফ রহমান বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং এলডিসি উত্তরণের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের আরও শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। আলোচনায় বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের পরিবর্তিত বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একদিকে বহুপক্ষীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কারে সক্রিয় হতে হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও বিকল্প অর্থায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
