‘বাংলার বাণী’ ভবন দখলের অভিযোগ
গুপ্ত জামায়াত-শিবির প্রোপাগান্ডা করছে আমার বিরুদ্ধে: নুরুল হক নুর
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মতিঝিলে ঐতিহ্যবাহী ভবন ‘বাংলার বাণী’ দখলের অভিযোগ উঠেছে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। দলটির সভাপতি ও সরকারের প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের নির্দেশনায় ভবনটি দখল করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। তালা লাগানো হয়েছে ভবনের প্রবেশপথসহ দুটি রুমে। ভবনের পেছনে তৈরি করা হয় ‘ঢাকা পানসী রেস্টুরেন্ট’ নামের একটি খাবার হোটেল। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হক নুর। তার দাবি-এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গুপ্ত জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন সেল থেকে আমার বিরুদ্ধে এমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। আগেও এরকম প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচার হয়েছে। বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নুর বলেন, আমি সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী। এখানে সরকারের ইমেজের একটা বিষয় থাকে। আমার বিরুদ্ধে যে নিউজটা করা হয়েছে সেখানে আরও তথ্যনির্ভর এবং প্রমাণ সাপেক্ষে নিউজটা করা দরকার ছিল। কে ভবন দখল করল সেগুলো আমার বিষয় নয়। কয়বার দখল হয়েছে সেগুলোও আমার বিষয় নয়। কিন্তু আমাকে জড়ানো হয়েছে। অথচ ওই ভবনে আমি কোনোদিন যাইনি। সিসিটিভি ফুটেজ ও একটা ছবিও কেউ দেখাতে পারবে না। তাহলে কীভাবে এখানে আমার সংশ্লিষ্টতা থাকে?
এর আগে মতিঝিলে ‘বাংলার বাণী’ ভবন দখলের অভিযোগ ওঠে গণঅধিকার পরিষদের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এই দখলের নেপথ্যে উঠে আসে দলটির সভাপতি নুরুল হক নুরের নাম। ভবনটির দুটি ফ্লোর তালা মেরে রাখা হয়েছে। ভবনটির পেছনের অংশে একটি খাবারের হোটেল উদ্বোধন করা হয়। হোটেলের মালিকানায় গণঅধিকার পরিষদ পরিচয় দেওয়া এমন ব্যক্তিরাও আছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানতে বৃহস্পতিবার সরেজমিন ও আশপাশের ভবনের নিরাপত্তাকর্মী, চা দোকান, ব্যাংক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তারা জানান, গণঅধিকার পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এমন বেশ কয়েকজন মিলে ভবনটি দখল করেন। তারা ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে ব্যবহার করেন নুরুল হক নুরের নাম। তার নাম ভাঙিয়ে ভবনটি কবজায় নেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভবনটিতে থাকা প্রিমিয়ার ব্যাংকের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ভবন দখল হওয়ার পর থেকে তারা সব থেকে বেশি চাপে রয়েছেন। মূলত ব্যাংক তুলে দিয়ে পুরো ভবন দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মাঝে ভাড়া আদায় করতে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমন পরিবেশে সবাই একটা আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছে বলে দাবি তার।
দখল বিষয়ে এক নিরাপত্তাকর্মী যুগান্তরকে বলেন, পুরো ভবন দখলে নিয়েছেন বেশকিছু যুবক। তারা নিজেদের পরিচয় দেন ভিপি নুরুল হক নুরের লোক। তার দলের রাজনীতি করেন। অনেকে আত্মীয় বলে প্রভাব দেখান। দখল নিয়ে যেন আমরা কিছু না বলি এজন্য হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
বাংলার বাণী ভবনের মালিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের পরিবার। সেখানে তাপসের রাজনৈতিক কার্যালয় ও ল’ চেম্বার ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগেই তিনি বিদেশে চলে যান। আত্মগোপনে চলে যান ভবনের দায়িত্বশীল কর্মচারীরা। এরপর সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে কিছু কম বয়সি ছেলেরা ভবনটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালান। তারা ওই ভবনে কিছুদিন প্রভাব বিস্তার করেন। ভবনে থাকা ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ভাড়ার টাকা তাদের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে সর্বশেষ ভবনটি নিয়ন্ত্রণ করেন সারোয়ার হোসেন সানী নামের এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে নুরের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। তার সঙ্গে আছেন সুমন নামের আরেক নেতা। তিনি একটি দলের অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের আরও কিছু নেতার আনাগোনা রয়েছে এই ভবনে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন তাদের উপস্থিতি দেখা যায় বাংলার বাণী ভবনে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সটকে পড়েন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে নুরুল হক নুর বলেন, ‘ভবন দখল বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে যে রিপোর্ট হয়েছে সেখানে বলছে আমার দখলে। দুটো ফ্লোর তালা মেরে রাখা হয়েছে। এখানে কি আমি গিয়ে তালা মেরেছি। নাকি আমি কাউকে পাঠিয়েছি। যারা তালা মারছে তারা কি আমারই লোক? সেটার কি প্রমাণ আছে-সেগুলো কিন্তু লেখেনি। যে ছেলের কথা বলছে সে আমার কেমন আত্মীয়। আমার শালা, সম্বন্ধী, দুলাভাই নাকি খালাতো ভাই। রিপোর্টে কিন্তু তা লেখেনি। তো পুরো নিউজটা একেবারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার মানহানির উদ্দেশ্যে এমন নিউজ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব। এখানে মূল বিষয়টা আসলে কী এবং কারা আমার নাম ব্যবহার করছে। অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এজন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের আগে এই ভবনটি ছিল উর্দু দৈনিক পাসবান-এর কার্যালয় ও ছাপাখানা। স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসাবে ভবনটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯৭২ সালে নিয়ন্ত্রণ নেন শেখ ফজলুল হক মনি। এই ভবনেই শুরু হয় ‘বাংলার বাণী’র কার্যক্রম। প্রথমে সাপ্তাহিক, পরে দৈনিক। ১৯৭৩ সালে ফজলুল হক মনি জার্মানি থেকে নিয়ে আসেন সে সময়ের সবচেয়ে আধুনিক ‘গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন’। ‘মধুমতি মুদ্রণালয়’ নামের সেই ছাপাখানা থেকে তখন ছাপা হতো বাংলার বাণী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে নিহত হন শেখ ফজলুল হক মনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর শেখ মনির ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির দখল ফিরে পান। তিনি সেখানে খোলেন তার ‘ল’ চেম্বার। পরে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়ার পরও এটিই ছিল তার মূল রাজনৈতিক কার্যালয়।
