পরিসংখ্যান দিবস আজ
তথ্যের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারেনি বিবিএস
প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বাজেট প্রণয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন-সব ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারণের অন্যতম ভিত্তি নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান। কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তথ্যের পর্যাপ্ততা ও সময়োপযোগিতা নিয়েও অসন্তুষ্টি রয়েছে ব্যবহারকারীদের মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট এবং পরিসংখ্যান তৈরির প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে পরিসংখ্যান দিবস। নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরার দিনটিতে সরকারি পরিসংখ্যানের প্রধান প্রতিষ্ঠান বিবিএসের সামনে বড় প্রশ্ন-তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে ফিরবে?
বিবিএস জানিয়েছে, পূজার ছুটির কারণে এবার পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষ্যে সোমবার বিশেষ কোনো আয়োজন থাকছে না। পরে বড় পরিসরে দিবসটি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বিবিএস। জনসংখ্যা, জাতীয় আয়, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও কৃষি উৎপাদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি করে সংস্থাটি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি সম্পদ বণ্টন ও বিভিন্ন কর্মসূচির অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের অর্থনীতি মূল্যায়নে বিবিএসের তথ্য ব্যবহার করে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা শুধু একটি সরকারি সংস্থার সুনামের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নীতিনির্ধারণের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থ।
পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে শুধু তথ্য প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, নমুনা নির্বাচন, হিসাবের স্বচ্ছতা, সময়মতো উপাত্ত প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ-সব ক্ষেত্রেই মান বজায় রাখা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের প্রশ্ন রয়েছে। করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়েও সরকারি পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। তথ্যের উৎস, হিসাবের পদ্ধতি, প্রাক্কলন এবং পরবর্তী সময়ে উপাত্ত সংশোধনের কারণে এ ধরনের পার্থক্য হতে পারে। কিন্তু পার্থক্যের কারণ ও হিসাবের ভিত্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা না হলে সংশয় বাড়ে।
জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধি নিরূপণে কোন খাত থেকে কী পরিমাণ তথ্য নেওয়া হয়েছে, উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন কীভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং আগের বছরের তুলনায় কী পরিবর্তন এসেছে-এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। একইভাবে মূল্যস্ফীতির হিসাবের ক্ষেত্রে পণ্যের ঝুড়ি, ভোগের ধরন, নমুনা বাজার এবং বিভিন্ন পণ্যের ওজন নির্ধারণের পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হলে তার কারণ ও প্রভাবও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
অবশ্য কোনো হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই সেটিকে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায় না। একইভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করেছে বলেই কোনো পরিসংখ্যানকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার সুযোগ নেই; বরং উপাত্ত যাচাইয়ের সুযোগ, হিসাবের পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
বিবিএসের তথ্যের মান নিয়ে ব্যবহারকারীদের অসন্তুষ্টির চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন জরিপে। তথ্যের পর্যাপ্ততা, সময়োপযোগিতা, গুণগত মান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি, পুরোনো উপাত্ত এবং তথ্য উপস্থাপনার সীমাবদ্ধতা গবেষণা, নীতিবিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে বাধা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের ‘ইউজার স্যাটিসফ্যাকশন সার্ভে’ অনুযায়ী, বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা। তথ্যের সঠিকতা ও সময়োপযোগিতা নিয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবহারকারী অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। বিবিএসের নিজস্ব ২০২২ সালের ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপেও তথ্যের পর্যাপ্ততা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে অসন্তুষ্টির চিত্র ওঠে আসে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, কৃষি ও শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে বিস্তারিত ও হালনাগাদ তথ্যের প্রয়োজন বেশি। শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে কর্মসংস্থান, বেকারত্ব, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এবং কাজের ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত দরকার। কৃষির ক্ষেত্রে উৎপাদন, ফলন, উৎপাদন খরচ ও কৃষকের আয়সংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য পর্যাপ্ত না হলে সংশ্লিষ্ট খাতের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
বিবিএসের তথ্যের মান ও সময়োপযোগিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে জনবল সংকট বড় বাধা। প্রাপ্ত তথ্যে সংস্থাটির প্রায় ৪৫ শতাংশ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। দক্ষ পরিসংখ্যানবিদের অভাব, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি জরিপের মান নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিটি ধাপের ওপর। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকলে ভুল তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি বাড়ে। আবার সংগৃহীত উপাত্ত যাচাই ও বিশ্লেষণের জন্য দক্ষ জনবল না থাকলে ভুল শনাক্ত করা এবং নির্ভরযোগ্য ফলাফল তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিবিএসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির অনেক কর্মকর্তা বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। এতে দক্ষ জনবলের ঘাটতির পাশাপাশি অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধরে রাখতে না পারলে সেই বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া কঠিন।
বিবিএসের পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের মতো সূচক সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এসব তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বাড়ানো এবং পরিসংখ্যান তৈরির প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান কমিশন গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। তবে শুধু কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা, পেশাগত জবাবদিহি এবং স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
