সরেজমিন পুরান ঢাকা
হাত বাড়ালেই মাদক
বেপরোয়া কারবারিরা অভিযানেও দমছে না * গেন্ডারিয়া-ঘুণ্টিঘরে ১৫ জনের কারাদণ্ড
Advertisement
মো. মোস্তাকিম আহমেদ, পুরান ঢাকা
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্যবসা-বাণিজ্য আর জীবনের কোলাহলে ব্যস্ত ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ পুরান ঢাকা। গত কয়েক বছরে এখানে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি। গুলিস্তান, চকবাজার, সদরঘাটসহ পুরান ঢাকার অলিগলিতে সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারী চক্র। ফুটপাত, পরিবহণ ও বিভিন্ন মার্কেটে গণহারে চলে চাঁদাবাজি। সরেজমিন পরিদর্শন ও যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
গত শনিবার পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন চিহ্নিত মাদকের আস্তানায় পিস্তল হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালান সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অভিযানের দুটি ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগ অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর হাতে পিস্তল-বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সোমবার দুপুরে তিনি পদত্যাগ করেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, লালবাগ, ইসলামবাগ, নবাবপুর, গুলিস্তান, সুরিটোলা, গণকটুলি সিটি কলোনি, গেন্ডারিয়া, সদরঘাট, দয়াগঞ্জ মোড়, সূত্রাপুর, বাঘাবাড়ী, কদমতলী এবং মৌলভীবাজার-মিটফোর্ড এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ছোট-বড় শতাধিক স্পটে সক্রিয় রয়েছে মাদক কারবারিরা। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যম কিংবা ছাত্র সংগঠনের নাম ব্যবহার করে করা হয় মাদক ব্যবসা। এসব মাদক কারবারি নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা করছেন।
গুলিস্তান পার্ক স্পটের মাদক ব্যাবসায়ী মোহাম্মদ আলী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘চুরি-ডাকাতির থেকে মাদক ব্যবসাই ভালো। এই ব্যবসায় আগে শুধু প্রশাসনকে মাসোহারা দিতাম। এখন আরও আট-দশ রকম নেতাকে টাকা দিতে হয়। স্তরে স্তরে এত চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করি। তাই বেশি পুঁজি খাটিয়েও এখন লাভ কম।’ নবাবপুর মাদক সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াবা সম্রাট-খ্যাত হিরা। সুরিটোলা এলাকার মাদকের বড় ডিলার ইকবাল। তারা দুজন ওই এলাকার শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে মাদক পৌঁছে দেন। তাদের কাছ থেকে নবাবপুর ফাঁড়ি এবং বংশাল থানা বড় অঙ্কের টাকা নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গুলিস্তানের নাট্যমঞ্চ পার্ক মাদকের হটস্পট। এর নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্বে রয়েছেন যুবদল পরিচয়ধারী বিল্লাল এবং সিদ্দিক। নাট্যমঞ্চ পার্কের ভেতরে নারী ও শিশুদের দিয়ে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন এখানে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। মাদক স্পট নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য প্রতি রাতে বিল্লাল ও তার গ্রুপের সদস্যদের ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। সিদ্দিকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য।
গুলিস্তানের লালনের পার্ক মাদকের স্পটও বহুল আলোচিত। যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। রমরমা এ মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা লিটন এবং যুবদল নেতা মিজানুর রহমান টিপু। প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করেন তারা। গুলিস্তান ক্রীড়া পরিষদ ভবনের পাশে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে অটোরিকশা-ভ্যানের গ্যারেজ বানানো হয়েছে। সেখান থেকেও প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় গুলিস্তানের ভবনটিও এখন মাদকের স্পট হিসাবে পরিচিত। যার নেতৃত্বে রয়েছেন যুবদলের ছবি, ইমন এবং হাসান। ভবনে প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি হকারের মালামাল রাতে রাখা হয়। যা থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করা হয়। কোতোয়ালি থানার স্থায়ী বাসিন্দা রাসেল সরদার জানান, সদরঘাটের ইয়াবার ডিলার মোহাম্মদ রাসেল শরীফ। এ এলাকায় গাঁজার বড় ডিলার ক্যানভাসার মিরাজ। সিটি মামুনও ইয়াবার বড় ডিলার বলে অভিযোগ রয়েছে। মো. হানিফ গাঁজার ডিলার বলে পরিচিত। তারা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সদরঘাট ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় গাঁজা ও ইয়াবা সহজলভ্য করে তুলেছেন। সম্প্রতি মিরাজ প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রির সময় ধরা পড়েন স্থানীয় জনগণের হাতে। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে মিরাজকে স্পষ্ট বলতে শুনা যায়-সে সদরঘাটের বিভিন্ন স্পটে নারীদের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করে। সরাসরি মাদক বিক্রির প্রশ্রয়দাতা হিসাবে কাজ করছেন কোতোয়ালি থানার কৃষক দল নেতা ইব্রাহিম।
গত ৩০ আগস্ট গেন্ডারিয়ার করাতিটোলা ও মুন্সিটেক-সংলগ্ন এলাকায় মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনাও ঘটে। যেখানে এক নারীসহ তিনজন আহত হন। মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। হাজারীবাগ গণকটুলি সিটি কলোনি এলাকা মাদকের হটস্পট হিসাবে পরিচিত। যেখানে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার অভিযান চালালেও মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমেনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব মাদক ব্যবসায়ীদের পেছনে রয়েছেন স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশের সোর্স। এর মধ্যে নিখিল হাজারীবাগ এলাকায় পুলিশের সোর্স হিসাবে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তার মাধ্যমেই এখানে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বংশাল থানার ওসি আশিক ইকবাল বলেন, আমি নতুন এসেছি থানায়। আসার পর থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছি নিয়মিত। মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদার হিসাবে ইকবাল এবং হিরার নাম শুনেছি বহুবার। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সব মাদক ব্যসবসায়ীকেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। থানায় মাদক ব্যাবসায়ীদের কোনো ধরনের মাসোহারা প্রদান কিংবা সংশ্লিষ্টতা নেই। আর ফাঁড়ির কোনো পুলিশ যদি জড়িত থাকে তাহলে প্রমাণসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা দেওয়া হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মহসিন রেজা যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে মাদক সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লাখ লাখ টাকার এই অবৈধ ব্যবসায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ জড়াচ্ছেন। প্রথমেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু যারা প্রতিরোধের সামনের সারিতে, তারাই জড়িয়ে পড়লে সরকারের উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার বলেন, মাদকের স্পটগুলোর সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করছি। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি আমাদের পক্ষ থেকে অব্যাহত রয়েছে। পুরান ঢাকা এলাকায় মাদক ব্যবসার সাথে যারা জড়িত তাদের বেশির ভাগ ভাসমান ও ছিন্নমূল। তাই একেবারে শতভাগ মাদকমুক্ত করা কঠিন। মাদকের বিরুদ্ধে সমাজের সব স্থরের মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে ১৫ জনের কারাদণ্ড : রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন ও ঘুণ্টিঘর রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। সোমবার বিকেল পৌনে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১০ এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মাদক সেবনরত অবস্থায় এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামসহ পাওয়া যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন ও ঘুণ্টিঘর রেললাইনকেন্দ্রিক এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়। সোমবারের অভিযানও এর অংশ।
গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর-একপাশে অভিযান, অন্যপাশে চলছিল মাদক সেবন : রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় সোমবার রেললাইন ধরে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান চলছিল, তখন রেললাইন লাগোয়া দেয়ালের অপর পাশে মাদক সেবন করছিলেন এক ব্যক্তি। বিকাল ৩টায় সেখানে অভিযানের সময় দেয়াল টপকে কলাগাছের ঝোপঝাড় থেকে ওই ব্যক্তিকে ধরে আনেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়ে যেন তার ‘ভ্রুক্ষেপ ছিল না’। নিজেকে আশরাফ উদ্দীন পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তি বারবার বলছিলেন, ‘স্যার, আমি খাই স্যার’। তাকে আটক করতে যাওয়া ডিএনসিসির ঢাকা দক্ষিণের উপপরিদর্শক আসহাব উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এদের কোনো কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই। এগুলোকে তারা খুব স্বাভাবিক বিষয় মনে করে।’
