এফআইসিসিআই’র আলোচনায় অর্থমন্ত্রী
দুই বছরেই স্থিতিশীল হবে অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত
জ্বালানি সংকট কাটাতে ১৫০ কূপ খনন করবে সরকার * খুলনায় জ্বালানি হাব স্থাপনের পরিকল্পনা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এই সময়ে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর ব্যবস্থার সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। রাজধানীর একটি হোটেলে সোমবার ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি : ড্রাইভিং ইনভেস্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সভায় এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং খুলনার কাছে গভীর ড্রাফটের জ্বালানি হাব গড়ে তোলা হবে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে চায়। এরপর অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং পর্যায়ক্রমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাপেক্সকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫০টি কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তিন থেকে চারটি নতুন ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পে কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছে প্রায় ২০ মিটার ড্রাফটের একটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খালাসের সুবিধাসহ আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি জ্বালানি হাব প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
মন্ত্রী বলেন, গ্যাস সংকট এখনো বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। বিশেষ করে শিল্প খাত এ সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ চলছে। এ সময় এফআইসিসিআই সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার দুর্বলতা সামনে এনেছে। এতে শিল্পের ব্যয় বাড়ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানিবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক মো. শফিকুল আলম মূল প্রবন্ধে দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস, আমদানি নির্ভরতা ও বিশ্বে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তুলে ধরেন। তিনি বলেন গ্যাসের অপচয় কমানো, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, শিল্পের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। প্যানেল আলোচনায় শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতিমালা, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য মোহাম্মদ তামিম দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধানের আর্থিক ও কারিগরি ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর সরকারের বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক শিল্পের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
