মাঠের ঘাসে লেখা এক মুক্তিযোদ্ধার নাম তান্না
Advertisement
তানভীর মাজহার ইসলাম তান্না
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়; কিন্তু তাদের অবদান অমলিন। তানভীর মাজহার ইসলাম তান্না তাদেরই একজন। তিনি কখনো ছিলেন না মাঠ কাঁপানো তারকা, না ছিলেন ট্রফি উঁচিয়ে ধরা অধিনায়ক। তবুও তার নাম উচ্চারিত হয় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, আবাহনী এবং বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের সঙ্গে নিঃশব্দ গৌরবে।
একাত্তরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের আরেকটি রূপ তৈরি হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন শহরে। বন্দুক নয়, বুট পায়ে, পতাকা বুকে ধারণ করে একদল ফুটবলার নেমেছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণায়। সেই দলের সংগঠক ছিলেন তরুণ তান্না। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে কাজী সালাউদ্দিন, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, সুবাস সাহারা যখন মাঠে নেমেছেন, তখন দলের প্রতিটি ম্যাচ আয়োজন, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, অর্থ সংগ্রহ ও যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি।
ভারতের বিভিন্ন শহরে ১৬টিরও বেশি প্রদর্শনী ম্যাচে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে উঠে আসা অর্থ জমা হতো মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে, পৌঁছে যেত মুজিবনগর সরকারের কাছে। তান্না পরে বলেছিলেন, ‘ওটা শুধু ফুটবল ছিল না, ছিল আরেকটি রণক্ষেত্র।’
তান্নার জন্ম এক ব্যতিক্রমী পরিবারে। বাবা কিংবদন্তি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ তিনি। গড়ে তোলেন চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার প্ল্যানসহ বহু স্থাপনা। তার চিন্তায় ভবন ছিল কেবল কাঠামো নয়, জাতির পরিচয়ের প্রতীক। সেই মূল্যবোধই তান্নার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল।
তান্না পড়াশোনা করেন বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকায়। ১৯৬৭ সালে তার সহপাঠী ছিলেন শেখ কামাল। বন্ধুত্ব থেকে জন্ম নেয় বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়া সংগঠনের ইতিহাসে আবাহনীর পথচলা। শেখ কামালের স্বপ্নের আবাহনী ক্রীড়া চক্রের শুরু থেকে তান্না ছিলেন নিবিড়ভাবে যুক্ত, পরে হন ক্লাবের পরিচালক। আবাহনী হয়ে ওঠে শহুরে ক্রীড়ার আধুনিকতার প্রতীক। সেই ইতিহাসের নীরব কারিগরদের একজন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবনে তান্না ছিলেন একজন প্রতিভাবান লেগ-স্পিনার। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে তার বোলিং নিয়ে আলোচনা হতো। কিন্তু খেলোয়াড় হিসাবে পথচলা দীর্ঘ হয়নি। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সংগঠক। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক, সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। ১৯৯৮ সালের উইলস আন্তর্জাতিক কাপ এবং ১৯৯৯ বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তার সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন অবহেলিত এই দলটিকে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দিতে তিনি বছরের পর বছর সংগ্রাম করেন। অবশেষে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আসে। এটি তার জীবনের এক নীরব বিজয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এখনো ঢাকার ফুটবলের খবর পত্রিকার পাতায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। ঢাকার মাঠে আবাহনী-মোহামেডান খেলার সেই আমেজ উপভোগ করতে চাই।’

