এক ব্রোঞ্জ, ২৬০ জনের বহর
Advertisement
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাপানের আকাশে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। আলো ঝলমলে উদ্বোধনের পর একে একে মাঠে নেমেছিলেন ১৮৭ ক্রীড়াবিদ। কেউ লড়েছেন শেষ বিন্দু পর্যন্ত, কেউ ফিরেছেন স্বপ্নভঙ্গের ভার নিয়ে। আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের পর্দা নেমেছে রোববার। গ্যালারি ফাঁকা, প্রতিযোগিতার উত্তাপ থেমে গেছে। রয়ে গেছে শুধু ফলাফলের খাতা। আর সেই খাতায় বাংলাদেশের পাশে একটি মাত্র ব্রোঞ্জ।
কোনো ম্যাচ না জেতা জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে উশুর ৫২ কেজি বিভাগে এসেছে সেই পদক। ৪০ বছরের ব্যক্তিগত পদক-খরা ভেঙেছেন তিনি। এই পদক তাই শুধু একটি পদক নয়, দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে পাওয়া এক টুকরো আলো। ২২ ডিসিপ্লিনে ১৮৭ ক্রীড়াবিদ নিয়ে যাওয়া একটি দেশের প্রাপ্তি একটি ব্রোঞ্জে থেমে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রস্তুতির দূরত্বটা কোথায় ছিল? সেই প্রশ্নের পাশেই দাঁড়িয়ে আরেকটি সংখ্যা ২৬০। ১৮৭ ক্রীড়াবিদের সঙ্গে ৭৩ কোচ ও কর্মকর্তা। ৬১ পুরুষ, ১২ নারী। খেলোয়াড়দের পাশে এত বড় কর্মকর্তার বহর। কে কোন দায়িত্বে ছিলেন? কার দায়িত্ব কত দিনের? কে কোন দলের সঙ্গে ছিলেন? কখন গেছেন, কখন ফিরেছেন? সব মিলিয়ে এই বহরের পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থের কতটা ব্যয় হয়েছে? গেমস শুরুর আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) পদকের প্রধান আশার জায়গা হিসাবে ক্রিকেট, কাবাডি, শুটিং ও আর্চারির কথা বলেছিল। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটও পদক এনে দিতে পারেনি। পুরুষ ক্রিকেট দল ব্রোঞ্জের ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে হেরেছে ৬৩ রানে। যে জায়গাগুলোতে পদকের স্বপ্ন ছিল, সেখানেই শেষ পর্যন্ত হিসাব মেলেনি।
এশিয়ান গেমসের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তার পরও জাপানের পথে ২৬০ সদস্যের বহর এই বৈপরীত্যই ভাবায়। ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকার মধ্যে খেলোয়াড়ের প্রস্তুতিতে কত? কোচিংয়ে কত? সরঞ্জামে কত? বিদেশি প্রশিক্ষণে কত? আর ভ্রমণ, থাকা, খাবার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কত? গেমস চলাকালীন ব্যবস্থাপনার ছবিও খুব স্বস্তিদায়ক ছিল না। বাংলাদেশের আর্চারি দলের আবাসন নিয়ে সংকটের কথা সামনে এসেছিল। দলের শেফ দ্য মিশন ছিলেন বিওএর সহসভাপতি মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ। শেফ দ্য মিশনের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রশ্ন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; প্রশ্ন ব্যবস্থা নিয়ে। আন্তর্জাতিক সফরে কর্মকর্তা মনোনয়নের নীতি কী? কোন যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একজনকে শেফ দ্য মিশন করা হয়? একইভাবে ৭৩ জন কর্মকর্তা-কোচের দায়িত্ব নির্ধারণের মানদণ্ডই বা কী?
বিওএর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ বি এম শেফাউল কবীরকে ঘিরেও বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের শেফ দ্য মিশন সেমিনারে তিনি বিওএর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তার বিদেশ সফরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ হলে স্বচ্ছতাই বাড়বে। কবে গেছেন, কী দায়িত্বে গেছেন, কত দিন ছিলেন, ব্যয় কে বহন করেছে এবং কখন দেশে ফিরেছেন।
জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জ অবশ্য এই পুরো গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। তার পদক দেখিয়ে দিয়েছে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদও এশিয়ার মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে পারেন। তাই এখন শুধু ব্যর্থতার দায় খোঁজা নয়, সাফল্যের পথটাও খুঁজে দেখা দরকার। বিওএর উচিত ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা। প্রত্যেকের দায়িত্ব, জাপানে অবস্থানের সময়, বিমান ভাড়া, হোটেল, দৈনিক ভাতা, স্থানীয় পরিবহণসহ যাবতীয় ব্যয়ের হিসাব সামনে আনা। জাতীয় পতাকা নিয়ে বিদেশে যাওয়া শুধু সম্মানের বিষয় নয়, এটি জবাবদিহিরও বিষয়। জাপানের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঠেছে একবার। এবার দেশের ক্রীড়াঙ্গন দেখতে চায় আরেকটি স্বচ্ছতার পতাকা।

