Logo
Logo
×

সুস্থ থাকুন

কানের পর্দায় ছিদ্র

কেন কমে যায় শ্রবণশক্তি

Icon

ডা. তারেক মোহাম্মদ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কেন কমে যায় শ্রবণশক্তি

আমাদের প্রতিদিনের প্র্যাকটিসে অনেক রোগী আসেন, যারা কানের পর্দায় ছিদ্র নিয়ে দীর্ঘদিন ভুগছেন। তাদের অনেকেরই একটি সাধারণ প্রশ্ন থাকে, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার কানের পর্দায় তো খুব সামান্য একটি ছিদ্র, কিন্তু আমি কানে এত কম শুনি কেন’? অথবা ‘কথা শুনি কিন্তু স্পষ্ট বুঝি না কেন’?

বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে কানের গঠন ও শব্দ পরিবহণের একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে কেন শ্রবণশক্তি কমে যায়, তা সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য আমরা কানের পর্দাকে একটি বাদ্যযন্ত্র বা ‘ঢোল’-এর সঙ্গে তুলনা করতে পারি। একটি ঢোলের চামড়া যখন টানটান থাকে, তখন তাতে সামান্য টোকা দিলেই বেশ জোরে এবং স্পষ্ট শব্দ হয়। কারণ, টানটান চামড়া বাতাসের কম্পন বা শব্দ তরঙ্গকে চমৎকারভাবে গ্রহণ করতে পারে।

কিন্তু সে ঢোলের চামড়ায় যদি কোনো ছিদ্র বা ফাটা থাকে? তখন আপনি যতই জোরে আঘাত করুন না কেন, শব্দটি হবে ভোঁতা এবং অস্পষ্ট। আমাদের কানের পর্দা বা ‘টিমপ্যানিক মেমব্রেন’ ঠিক এ ঢোলের চামড়ার মতোই কাজ করে।

* শব্দ শোনার প্রক্রিয়া

আমাদের কানের গঠন এমনভাবে তৈরি যে, বাইরের বাতাস থেকে শব্দ তরঙ্গ এসে প্রথমে কানের পর্দায় আঘাত করে এবং পর্দাকে কাঁপায়। পর্দার এ কম্পন কানের ভেতরের তিনটি ক্ষুদ্র হাড়ের (ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস) মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, ফলে আমরা শুনতে পাই।

* পর্দায় ছিদ্র থাকলে তিনটি প্রধান সমস্যা

► শব্দ তরঙ্গ ধরতে না পারা : একটি অক্ষত পর্দা যেভাবে বাতাসের সবটুকু শব্দ তরঙ্গ ধরে ভেতরে পাঠাতে পারে, ছিদ্রযুক্ত পর্দা তা পারে না। পর্দার কার্যকর অংশ (Surface Area) কমে যাওয়ার ফলে এটি পর্যাপ্ত শব্দ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।

► কম্পন কমে যাওয়া : পর্দায় ছিদ্র থাকলে শব্দ তরঙ্গের বাতাসের চাপ সে ছিদ্র দিয়ে লিক করে বেরিয়ে যায়। ফলে পর্দাটি প্রয়োজনীয় মাত্রায় কাঁপতে পারে না। ফলস্বরূপ, শব্দ মস্তিষ্কে পৌঁছাতে বাধা পায় এবং রোগী কম শোনেন।

► ছিদ্রের অবস্থান ও আকার : ছিদ্রটি পর্দার কোন অবস্থানে আছে এবং সেটি কত বড়, তার ওপর শ্রবণশক্তি হ্রাসের মাত্রা নির্ভর করে। ছিদ্র বড় হলে স্বাভাবিকভাবেই শোনার ক্ষমতা বেশি কমে যায়।

* অবহেলায় স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে

অনেকে ভাবেন, কম শুনছি তাতে কী সমস্যা? জোরে কথা বললেই তো হয়! এটি ভুল ধারণা। কানের পর্দায় ছিদ্র থাকা মানে কানের সুরক্ষা দেওয়াল ভেঙে যাওয়া। এ ছিদ্রপথে গোসলের পানি বা বাইরের ধুলাবালি সরাসরি মধ্য কর্ণে প্রবেশ করে। এতে বারবার ইনফেকশন হয়, কান দিয়ে পুঁজ পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশনের ফলে কানের ভেতরের শ্রবণ সহায়ক ছোট হাড়গুলো পচে যেতে পারে। তখন শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া বা বধিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়।

* চিকিৎসা ও সমাধান

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় এর চমৎকার সমাধান রয়েছে। ‘টিমপ্যানোপ্লাস্টি’ নামক অপারেশনের মাধ্যমে কানের পর্দা জোড়া লাগানো সম্ভব। পর্দা জোড়া লেগে গেলে বা টানটান হলে, ঢোলের মতোই কান আবার আগের মতো শব্দ গ্রহণ করতে শুরু করে এবং রোগী স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি ফিরে পান।

তাই কানে কম শোনা বা কান দিয়ে পানি পড়ার সমস্যাকে অবহেলা করবেন না। কানের পর্দায় ছিদ্র সন্দেহ হলে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং শ্রবণশক্তি রক্ষা করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জন, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম