শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে যে ভুল বাধা সৃষ্টি করে
Advertisement
লিনা আকতার
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে জীবনের প্রথম কয়েক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, গল্প শোনা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ শিশুর চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও ভাষার দক্ষতা বাড়ায়। ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ ও নিয়মিত যত্ন শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে কম সময় কাটানো শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বাবা-মাকে কিছু বিষয়ে সচেতন হতে হবে। বিস্তারিত লিখেছেন লিনা আকতার
* শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের বেলায় শেখা ও জানা বিষয়গুলো মনে রাখতে সাহায্য করে। এ সময় মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী হয়। ফলে শিশুর শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ে। শিশু নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না পেলে সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। এতে মনোযোগ কমে যাওয়া, কোনো বিষয় মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া এবং নতুন কিছু শিখতে সমস্যা হতে পারে। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
* খাবারে পুষ্টির ঘাটতি
শিশু খুব কম খেলে, ক্ষুধামন্দায় ভুগলে অথবা প্রতিদিন একই ধরনের খাবার খেলে তার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন, আয়োডিন, জিঙ্ক, কোলিন, প্রোটিন, ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডি প্রয়োজন। এসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি শিশুর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারে মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, মাংস, শাকসবজি ও ফলমূল রাখা উচিত। পাশাপাশি শিশুর বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হবে।
* অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন ব্যবহার
মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট ও টেলিভিশন থেকে শিশুরা কিছু বিষয় শিখতে পারে। তবে দীর্ঘসময় এসব যন্ত্রের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে খেলাধুলা, বই পড়া, পড়াশোনা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যায়। এসব কাজ শিশুর ভাষা শেখা, চিন্তাভাবনা, সামাজিক দক্ষতা ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সীমিত রাখা উচিত। পাশাপাশি তাকে খেলাধুলা, বই পড়া ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে উৎসাহিত করতে হবে।
* শিশুর সঙ্গে কম কথা বলা ও গল্প না পড়া
কথা বলা, গল্প শোনা ও বই পড়ার মাধ্যমে শিশুর শব্দভান্ডার বাড়ে। একইসঙ্গে তার ভাষা শেখা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তা করার ক্ষমতার বিকাশ ঘটে। বাবা-মা যদি নিয়মিত শিশুর সঙ্গে কথা বলেন, গল্প শোনান এবং বই পড়ে শোনান, তাহলে শিশু নতুন শব্দ ও ধারণা শিখতে পারে। অন্যদিকে, মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও মেলামেশার সুযোগ কম হলে তার ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা চর্চার সুযোগও কমে যায়। তাই প্রতিদিন শিশুর সঙ্গে কথা বলা, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং বয়স উপযোগী গল্পের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
* বাইরে খেলাধুলার সুযোগ না দেওয়া
দৌড়ানো, লাফানো, সাইকেল চালানো ও বিভিন্ন খেলাধুলা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। শারীরিক কার্যকলাপ মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে এবং মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও অন্যদের সঙ্গে মেলামেশাও শিখতে পারে। বাইরে খেলাধুলা করলে শিশু সূর্যের আলো পায়, যা শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন ডি হাড়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত বাইরে খেলতে দেওয়া উচিত। তবে অতিরিক্ত রোদ ও গরমের সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে।
* শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা
শিশু নিয়মিত ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে তার মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ও শেখার সঙ্গে জড়িত কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই শিশুর আচরণ ও অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সে কোনো সমস্যায় পড়লে মন দিয়ে তার কথা শুনতে হবে। বকাঝকা না করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। পরিবারে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ শিশুর আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক বিকাশে সহায়তা করে।
* শিশুকে নিজে থেকে কিছু শেখার সুযোগ না দেওয়া
শিশুর সব কাজ বাবা-মা করে দিলে অথবা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলে সে নিজে চিন্তা করার সুযোগ কম পেতে পারে। অথচ প্রশ্ন করা, নতুন কিছু পর্যবেক্ষণ করা এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা শিশুর শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিশুকে বয়স অনুযায়ী নিজের কাজ করতে দিতে হবে। খেলনা দিয়ে কিছু তৈরি করা, ছবি আঁকা, ধাঁধার সমাধান করা কিংবা দৈনন্দিন ছোটখাটো সমস্যার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। শিশু ভুল করলে তাকে বকাঝকা না করে ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। এতে তার চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়তে সাহায্য করবে।
* শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বাবা-মায়ের করণীয়
শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্য শুধু ভালো খাবার দিলেই হবে না। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মানসিক নিরাপত্তা এবং নতুন কিছু শেখার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই এসব অভ্যাস গড়ে তুললে শিশুর শেখা, চিন্তা করা ও দৈনন্দিন কাজ করার দক্ষতা বিকাশে সহায়তা পাওয়া যায়।
লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
