অস্টিওপোরোসিস
হাড়ের নীরব ক্ষয়
Advertisement
ডা. শাহজাদা সেলিম
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হাড় আমাদের শরীরের কাঠামো, চলাফেরার ভিত্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের সক্রিয়তার অন্যতম অবলম্বন। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এ সমস্যার নাম অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ। রোগটি দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ সৃষ্টি না করায় একে ‘নীরব রোগ’ বলা হয়। অনেক সময় সামান্য পড়ে যাওয়া, হাঁচি-কাশি কিংবা হালকা আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার পর রোগটি ধরা পড়ে।
* অস্টিওপোরোসিস কেন হয়
আমাদের হাড় স্থির কোনো কাঠামো নয়। পুরোনো হাড় ভেঙে নতুন হাড় তৈরি হওয়ার মাধ্যমে হাড়ের পুনর্গঠন চলতে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে নতুন হাড় তৈরির তুলনায় ক্ষয় বেশি হলে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়। ফলে হাড়ে ছিদ্রযুক্ত, দুর্বল কাঠামো তৈরি হয় এবং ভাঙার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
নারীদের মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় হাড়ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। তবে অস্টিওপোরোসিস শুধু নারীদের রোগ নয়; বয়স্ক পুরুষরাও এতে আক্রান্ত হন। কম ওজন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি’র ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন এবং কিছু হরমোনজনিত রোগও ঝুঁকি বাড়ায়। হাইপারথাইরয়েডিজম, হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম ও হাইপোগোনাডিজমের মতো রোগের ক্ষেত্রেও হাড়ের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
* কীভাবে বুঝবেন
অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যথা বা অন্য কোনো লক্ষণ থাকে না। মেরুদণ্ডের হাড়ে চিড় বা ভাঙন হলে পিঠে ব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া কিংবা শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। নিতম্ব, মেরুদণ্ড ও কবজির হাড় ভাঙা এ রোগের গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তির নিতম্বের হাড় ভাঙলে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকা, চলাফেরার সক্ষমতা হারানো এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ঝুঁকি বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা বা ডুয়াল-এনার্জি এক্স-রে অ্যাবসর্পশিওমেট্রি (DXA) করা হয়। বয়স, পূর্ববর্তী হাড়ভাঙার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, ওষুধ সেবন এবং অন্যান্য ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, থাইরয়েডের কার্যকারিতা ও অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তর্নিহিত কারণ খোঁজা হয়।
* প্রতিরোধের উপায়
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে শৈশব ও তরুণ বয়স থেকেই হাড়ের সর্বোচ্চ শক্তি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ, দই, ছোট মাছ, কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন মাছ, শাকসবজি ও অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। ভিটামিন ডি হাড়ে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। সূর্যালোক, খাদ্য এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সম্পূরক গ্রহণের মাধ্যমে এর চাহিদা পূরণ করা যায়। সবার জন্য একই মাত্রার সম্পূরক প্রয়োজন হয় না।
নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। ধূমপান পরিহার, অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি। বয়স্কদের ঘরে পর্যাপ্ত আলো, বাথরুমে পিছলরোধী ব্যবস্থা এবং চলাচলের পথে বাধা দূর করে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
* চিকিৎসা আছে, অবহেলা নয়
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত হলে সবার চিকিৎসা এক রকম নয়। হাড়ভাঙার ঝুঁকি, বয়স, সহাবস্থানকারী রোগ এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক ক্যালসিয়াম-ভিটামিন ডি’র ঘাটতি সংশোধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে পারেন। বিসফসফোনেটসহ বিভিন্ন কার্যকর ওষুধ হাড়ভাঙার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়; চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ ও শনাক্তকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মেনোপজ-পরবর্তী নারী, বয়স্ক পুরুষ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড গ্রহণকারী এবং যাদের সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙেছে, তাদের বিশেষভাবে সচেতন হওয়া দরকার।
মনে রাখতে হবে, অস্টিওপোরোসিস বার্ধক্যের অনিবার্য পরিণতি নয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে হাড়ভাঙার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। হাড়ের যত্ন আজ থেকেই শুরু হোক-সুস্থ, স্বাধীন ও সক্রিয় জীবনের জন্য।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
