রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে ফলের ভূমিকা
Advertisement
ডা. শাহজাদা সেলিম
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই প্রথমে ফল খাওয়া বন্ধ করে দেন। তাদের ধারণা, ফল মিষ্টি-তাই রক্তের সুগার বাড়াবে। বাস্তবতা হলো, ডায়াবেটিস থাকলেও ফল সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক পরিমাণে, সঠিক ধরনের ফল এবং সঠিকভাবে খেলে তা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-কোনো একটি ফল একাই রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করে না। মোট খাদ্যাভ্যাস, পরিমাণ, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, ওষুধ এবং ডায়াবেটিসের ধরন-সবকিছু মিলেই রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
▶ ফল কেন খাবেন : আস্ত ফলে থাকে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান। খাদ্যআঁশ খাবার থেকে গ্লুকোজ শোষণের গতি কিছুটা ধীর করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তাই মিষ্টি বা মিষ্টান্নের পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে গোটা ফল খাওয়া ভালো বিকল্প হতে পারে।
▶ পেয়ারা : পেয়ারা আমাদের পরিচিত ও সহজলভ্য ফল। ডায়াবেটিসে পেয়ারাকে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। পেয়ারা খেলে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা মিষ্টি মসলা না মেশানোই ভালো।
▶ জাম : জাম বা কালোজামে বিভিন্ন পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে। জাম খেতে চাইলে গোটা ফল হিসাবে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো, কিন্তু ওষুধের পরিবর্তে জামবীজের গুঁড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।
▶ আপেল, কমলা ও মালটা : আপেল, কমলা ও মালটায় খাদ্যআঁশ রয়েছে এবং এগুলো গোটা ফল হিসাবে খেলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা অনেক মিষ্টি খাবার বা মিষ্টি পানীয়ের তুলনায় কম হতে পারে। বিশেষ করে কমলা বা মালটা জুস করে না খেয়ে গোটা ফল খাওয়া ভালো। কারণ জুস করার সময় ফলের আঁশের কাঠামো নষ্ট হয় এবং অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ ফলের চিনি গ্রহণ করা সহজ হয়ে যায়।
▶ বেরি জাতীয় ফল : স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি ও ব্ল্যাকবেরির মতো বেরি জাতীয় ফলে খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন পলিফেনল রয়েছে। এগুলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
▶ অ্যাভোকাডো : অ্যাভোকাডো অন্য অনেক ফলের তুলনায় আলাদা। এতে কার্বোহাইড্রেট কম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি ও খাদ্যআঁশ তুলনামূলক বেশি। তাই রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়ানোর আশঙ্কা কম। এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত।
▶ কলা : কলায় প্রাকৃতিক চিনি ও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে, তাই পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। খুব বেশি পাকা কলায় সহজে হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেটের অনুপাত বাড়তে পারে। অন্যদিকে কাঁচা বা কম পাকা কলায় resistant starch তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পাকা কলা ডায়াবেটিসে নিষিদ্ধ। পরিমাণ এবং ব্যক্তির রক্তের সুগারের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
▶ ফল খাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম : ডায়াবেটিসে ফল বেছে নেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটা এবং কীভাবে খাচ্ছেন। গোটা ফলকে অগ্রাধিকার দিন। ফলের জুস, স্মুদি বা চিনি মেশানো ফলের শরবত এড়িয়ে চলুন। একই সময়ে অনেকগুলো ফল না খেয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। ফলের সঙ্গে বাড়তি চিনি, মধু, সিরাপ বা মিষ্টি দই যোগ করার প্রয়োজন নেই। একজনের জন্য যে পরিমাণ ফল উপযুক্ত, অন্যজনের জন্য সেটি একই নাও হতে পারে। বিশেষ করে যাদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা ভালো।
▶ কোন ফল খাবেন : দেশি ও মৌসুমি গোটা ফল পরিমিত পরিমাণে খান। পেয়ারা, জাম, কমলা, মালটা, আপেল, পেঁপে, নাশপাতি, বেরি ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। কলা, আম, কাঁঠাল বা লিচুর মতো তুলনামূলক মিষ্টি ফলও একেবারে নিষিদ্ধ নয়; তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষ ফল’ খোঁজার পরিবর্তে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ঠিক করা।
▶ ফল নয়, জুসই বড় সমস্যা : এক গ্লাস জুস বানাতে সহজেই কয়েকটি ফল ব্যবহার হয়ে যায়। ফলে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ প্রাকৃতিক চিনি গ্রহণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে গোটা ফল চিবিয়ে খেলে খাদ্যআঁশ, পরিমাণ ও তৃপ্তির বিষয়টি বজায় থাকে। তাই সহজ নিয়মটি হতে পারে- ফল খাবেন, জুস নয়। পরিমাণ বুঝে খাবেন, ভয় পেয়ে বাদ দেবেন না। দেশি ফলকে অগ্রাধিকার দেবেন আর ডায়াবেটিসের ওষুধ নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করবেন না।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
