ওজন কমাতে গিয়ে স্বাস্থ্যহানি নয়
Advertisement
ইসরাত জাহান ইফাত
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওজন কমানোর ইচ্ছা এখন অনেকেরই। কেউ নিজের শরীরকে আরও ফিট ও সুস্থ রাখতে চান, কেউ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চরক্তচাপ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে চান। কিন্তু ওজন কমানোর তাড়াহুড়ায় আমরা অনেক সময় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ওজনের পাশাপাশি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকেও কমিয়ে দেয় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই দিনের পর দিন ভাত-রুটি বন্ধ করে দেন, কেউ ফল খাওয়া বাদ দেন, কেউ আবার দিনে এক-দুবার সামান্য খাবার খেয়ে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো ‘ফাস্ট ওয়েট লস ডায়েট’ বা পরিচিত কারও খাদ্যতালিকাও নিজের জন্য অনুসরণ করতে শুরু করেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার-ওজন কমানো আর শরীরকে না খাইয়ে রাখা এক বিষয় নয়। বিস্তারিত লিখেছেন ইসরাত জাহান ইফাত
* ডায়েট মানে কী
‘ডায়েট’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অনেকের মনে হয়-কম খেতে হবে, অনেক কিছু বাদ দিতে হবে এবং ক্ষুধা সহ্য করতে হবে। অথচ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মূল কথা হলো পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য, বৈচিত্র্য ও পরিমিতি। তাই ওজন কমাতে খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; খাবারকে শত্রু বানাতে হবে না। শরীরের জন্য শক্তি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবার ও পানি-সবই প্রয়োজন। তাই ওজন কমানোর সময় খাবারের মোট ক্যালোরি প্রয়োজন অনুযায়ী কমানো যেতে পারে, কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি বাদ দেওয়া উচিত নয়। ওজন কমানোর জন্য ব্যক্তিগত গাইডলাইন পেতে ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ নিন।
* ভুলভাবে ওজন কমালে কী হতে পারে
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ক্যালোরি কমিয়ে খেলে শরীর পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, কোষ্ঠকাঠিন্য, কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যাওয়া এবং প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন ডি ও বি১২-এর মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হয়ে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সামগ্রিক স্বাস্থ্যে পড়ে ও বিভিন্ন ক্রনিক রোগ তৈরি হতে পারে। দ্রুত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে পেশির ভরও কমে যেতে পারে। তাই শুধু দাঁড়িপাল্লায় কত কেজি কমেছে, সেটিই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। শরীরের চর্বি কমার পাশাপাশি পেশির ভর যতটা সম্ভব ধরে রাখা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
* ভাত-রুটি কি ওজন কমানোর শত্রু
আমাদের দেশে ওজন কমাতে গেলেই প্রথমে ভাত বা রুটিকে দায়ী করার প্রবণতা আছে। কেউ বলেন, ‘ভাত একদম খাব না, কেউ আবার ফলকেও বাদ দেন, কারণ ফলে প্রাকৃতিক চিনি রয়েছে। আসলে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কার্বোহাইড্রেট শরীরের গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। পূর্ণ শস্য, ডাল, শাকসবজি ও গোটা ফলের মতো কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসেরই অংশ। তাই ওজন কমানোর জন্য সবার ক্ষেত্রে ভাত বা রুটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কতটা খাবেন, কোন ধরনের খাবার খাবেন এবং পুরো দিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, সবজি ও অন্যান্য পুষ্টির ভারসাম্য কেমন-এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে গোটা ফলকে শুধু ‘চিনি আছে বলে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। গোটা ফলে ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেলসহ এন্টিঅক্সিডেন্টস বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদান থাকে।
* শুধু প্রোটিন খেলেই কি ওজন কমবে
বর্তমানে হাই প্রোটিন ডায়েট নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। ওজন নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত প্রোটিন সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। এটি পেশির ভর ধরে রাখতে এবং দীর্ঘসময় পেট ভরা অনুভূতি বজায় রাখতে সহায়তা করে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সারা দিন শুধু ডিম, মাংস বা অন্য প্রোটিনের খাবার খেয়ে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য খাবার বাদ দিতে হবে।
‘জিরো কার্ব’ বা অত্যন্ত কম ক্যালরির ডায়েট কি সবার জন্য? কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিস্থিতিতে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে low-energy বা carbohydrate-restricted diet ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন অত্যন্ত কম ক্যালোরির খাবার খাওয়া নিরাপদ বা সবার জন্য উপযোগী নয়। ওজন কমানোর লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ক্যালোরি কমানো নয়; বরং পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য, সঠিক এনার্জি ব্যালেন্স এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা। NICE-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ৮০০-১,২০০ কিলোক্যালোরির লো-এনার্জি ডায়েট এবং ৮০০ কিলোক্যালোরির নিচের ভেরি-লো-এনার্জি ডায়েট শুধু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যবহার করা উচিত। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজে থেকে করা যাবে না। তাই যত কম খাব, তত দ্রুত ওজন কমবে-এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
* তাহলে ওজন কমানোর খাবারে কী থাকবে
ওজন কমানোর খাদ্যতালিকা একেকজনের জন্য একেক রকম হতে পারে। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, বর্তমান ওজন, শরীরের গঠন, রোগব্যাধি, ওষুধ, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাস-সবকিছু বিবেচনা করেই ডায়েট প্ল্যান। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় প্রয়োজন অনুযায়ী লীন প্রোটিন, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, শাকসবজি, ফল ও পানি-সবকিছুই থাকা উচিত যেমন-মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল, ছোলা, দুধ বা দইয়ের মতো ভালো প্রোটিনের উৎস, বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, প্রয়োজন অনুযায়ী ভাত, রুটি, ডাল, ছোলা, ওটস বা অন্যান্য কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট। পরিমাণমতো গোটা ফল, বাদাম, বীজ ও উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেলের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। পর্যাপ্ত পানি। খুব সীমিত করবেন, অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও highly processed খাবার।
* শুধু খাবার কমালেই কি ওজন নিয়ন্ত্রণ হবে
ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু খাবারের বিষয় নয়। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব-এমন খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। যে ডায়েট আপনি এক মাস কষ্ট করে করতে পারবেন কিন্তু এরপর আর চালিয়ে যেতে পারবেন না, সেটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং এমন একটি খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন, যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে মানিয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব।
* ‘চিট খাবার’ খেলেই কি ডায়েট নষ্ট
ওজন কমানোর পথে অনেকেই একটি খাবার একটু বেশি খেয়ে ফেললে মনে করেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে, এখন আর ডায়েট করে লাভ নেই।’ এটিও একটি ভুল ধারণা। একটি বেলার খাবার দিয়ে পুরো প্রক্রিয়ার ফলাফল নির্ধারিত হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস। তবে ‘চিট মিল’ যেন অতিরিক্ত খাওয়ার অজুহাতে পরিণত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
* ওজন কমানোর সাফল্য শুধু কেজিতে মাপবেন না
ওজন কমানোর সময় শুধু ওজনের মেশিনের সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে শরীরের চর্বি কতটা কমছে, পেশির ভর কেমন আছে, কোমরের মাপ কমছে কি না, শক্তি ও কর্মক্ষমতা কেমন, ঘুম কেমন হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাসটি দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব হচ্ছে কি না-এসব ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, কিংবা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য খাদ্যতালিকা আরও ব্যক্তিভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।
* ওজন কমানোর পথে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শরীরকে শাস্তি দেওয়া
খাবার কমিয়ে, ক্ষুধা সহ্য করে বা একের পর এক পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে হয়তো দ্রুত কিছুটা ওজন কমানো যেতে পারে; কিন্তু সুস্থ শরীর ধরে রেখে দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, ব্যালান্সড ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
তাই পরেরবার ওজন কমানোর ডায়েট শুরু করার আগে শুধু এ প্রশ্নটি করবেন না-
‘কী খেলে দ্রুত ওজন কমবে?’ বরং প্রশ্ন করুন-
‘কীভাবে ওজন কমালে আমার শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পাবে এবং এ অভ্যাস আমি দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারব?’ কারণ ওজন কমবে-কিন্তু তার সঙ্গে যেন স্বাস্থ্য, শক্তি ও জীবনযাপনের স্বাভাবিক আনন্দ কমে না যায়। সুস্থভাবে ওজন কমানোর মূলমন্ত্র-খাবারকে ভয় নয়, খাবারকে বুঝে খাওয়া। তাই ব্যক্তিগত গাইডলাইন পেতে ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ নিন।
লেখক : পুষ্টিবিদ, সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্ট, ড. লিনাস স্কিন অ্যান্ড অ্যাসথেটিক ক্লিনিক, ধানমন্ডি।
